← Back to poetry
❧

স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দাও, রাষ্ট্র!

Poetry

স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দাও, রাষ্ট্র!

স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা দিতে যখন ব্যর্থ রাষ্ট্র,
তখন অন্তত স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দাও।
এটুকু অধিকার ফিরিয়ে দাও আমাদের-
যাতে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হলে
ফিরে আসার সম্ভাবনাটুকু
ভাগ্যের কাছে ভিক্ষা চাইতে না হয়।

আমরা আর বড় কোনো প্রতিশ্রুতি চাই না,
চাই না উন্নয়নের রঙিন বিলবোর্ড,
চাই না বক্তৃতার আকাশছোঁয়া শব্দ,
চাই শুধু একটি শিশু
স্কুল থেকে ফিরে মায়ের কোলে উঠুক,
একজন নারী রাস্তায় হাঁটুক
তার শরীরকে কারও যুদ্ধক্ষেত্র না বানিয়ে,
একজন শ্রমিক দিনের শেষে
তার দরজায় ফিরে এসে
নিজের সন্তানকে বলতে পারুক,
“ভয় পাস না, আমি এসেছি।”

কিন্তু এই দেশে
শিশুর কান্না এখন সংবাদ,
ধর্ষণ এখন পরিসংখ্যান,
খুন এখন শিরোনাম,
মবের হাতে মৃত্যু এখন জনতার বিচার,
আর মানুষের নিরাপত্তা
একটি ক্ষয়ে যাওয়া শব্দের মতো
অভিধানের পাতায় পড়ে আছে।

একটি মোবাইল ফোনের জন্য
একটি জীবন নিভে যায়,
একটি গলার অলংকারের জন্য
একটি ঘর শূন্য হয়ে যায়,
একটি মোটরসাইকেল, একটি ব্যাগ,
কয়েকটি সামান্য টাকার জন্য
কেউ আর কোনোদিন
তার মায়ের মুখ দেখে না।

কী আশ্চর্য সভ্যতা!
এখানে মানুষের জীবনের দাম
কখনও একটি ফোনের চেয়ে কম,
কখনও একটি অলংকারের চেয়ে কম,
কখনও একটি বাইকের চেয়েও কম।
আর আমরা সভ্যতার নামে
দেয়ালে দেয়ালে লিখে যাই—
“মানুষের জীবন অমূল্য।”

কোন জীবন?

যে শিশুটির শরীর
নিরাপদ থাকার কথা ছিল
সে যদি নির্যাতনের অন্ধকারে
নিজের শৈশব হারায়,
যে কিশোরীর হাতে
বই থাকার কথা ছিল
তার হাতে যদি কাঁপতে থাকে
ভয়ের অদৃশ্য শেকল,
যে মায়ের ঘুম
সন্তানের ভবিষ্যৎ পাহারা দেওয়ার কথা
সে যদি রাতভর দরজার শব্দ গোনে,
তবে রাষ্ট্রের প্রাচীর যত উঁচুই হোক
তার ভিতরে নিরাপত্তা কোথায়?

শত শত শিশুর মৃত্যু আমাদের চোখের সামনে
একটি আয়না তুলে ধরেছে;
সেই আয়নায় কোনো শত্রুর মুখ নেই,
আছে আমাদের ব্যর্থতার মুখ।
নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার
হাজার হাজার নথিভুক্ত ঘটনা
আমাদের সভ্যতার কপালে
কালো অক্ষরে লিখে দিয়েছে-
আইন আছে, কিন্তু আইনের ভয় কোথায়?

মব যখন আদালত হয়ে যায়,
উন্মত্ত জনতা যখন বিচারকের আসনে বসে,
গুজব যখন সাক্ষ্য হয়ে ওঠে,
আর রক্ত যখন রায়ের কালি হয়,
তখন শুধু একজন মানুষ মরে না-
মরে রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ,
মরে সংবিধানের প্রতি আস্থা,
মরে মানুষের ভিতরের মানুষটি।

আমরা কোনো অলৌকিক মুক্তি চাই না,
কোনো দেবতার অবতরণ চাই না,
কোনো নতুন ত্রাণকর্তার অপেক্ষাও নয়।
চাই আইন তার নিজের মেরুদণ্ড ফিরে পাক,
বিচার তার নিজের চোখ ফিরে পাক,
পুলিশ মানুষের পাশে দাঁড়াক,
আদালত ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠুক,
প্রশাসন ক্ষমতার নয়
মানুষের কাছে জবাবদিহি করুক।

চাই অপরাধীর পরিচয় তার পরিচয়ই থাকুক,
তার ক্ষমতা যেন তার ঢাল না হয়,
তার দল যেন তার বর্ম না হয়,
তার অর্থ যেন বিচারকে কিনতে না পারে।

রাষ্ট্র যদি অপরাধীর সামনে নত হয়,
তবে নাগরিকের মাথা নত হওয়া
শুধু সময়ের ব্যাপার।

না, আর নয়।

আমরা এমন বিপ্লব চাই
যার হাতে আগুন নয়, আইনের মশাল;
যার অস্ত্র প্রতিশোধ নয়, জবাবদিহি;
যার স্লোগান রক্ত নয়, ন্যায়;
যার লক্ষ্য ক্ষমতা দখল নয়,
মানুষের জীবন ফিরিয়ে দেওয়া।

এই বিপ্লব শুরু হোক
ভীত মানুষের বুক থেকে,
শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ থেকে,
শ্রমিকের ঘাম থেকে,
মায়ের প্রার্থনা থেকে,
সন্তানের প্রশ্ন থেকে,
কবির কলম থেকে,
বিচারের কাঠগড়া থেকে।

রাষ্ট্র, তোমার কাছে আজ
শেষবারের মতো মানুষের ভাষায় বলছি-
“স্বাভাবিক জীবন দিতে না পারো,
অন্তত স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দাও।”

তা নাহলে নিশ্চিত জেনো-
একদিন আমরাও আততায়ী হবো!

প্রদ্যোত / ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

✦