বিষবৃক্ষের বিরুদ্ধে একাত্তরের শপথ
বিষবৃক্ষের বিরুদ্ধে একাত্তরের শপথ
শোনো বাংলাদেশ, আবার শোনো! মাটির নিচে কান পাতলে আজও কি শুনতে পাও সেই পদধ্বনি, সেই অগ্নিমন্ত্র, সেই বজ্রকণ্ঠ, যে কণ্ঠ একদিন নিদ্রিত বাংলার শিরায় শিরায় স্বাধীনতার বিদ্যুৎ জ্বেলে দিয়েছিল? শুনতে পাও কি সেই অমোঘ উচ্চারণ, যার অভিঘাতে কৃষকের লাঙল থেমেছিল, শ্রমিকের হাত মুঠো হয়েছিল, ছাত্রের চোখে জ্বলে উঠেছিল অগ্নি, আর কোটি মানুষের বুকের ভেতর জন্ম নিয়েছিল একটি শব্দ, স্বাধীনতা? সেই শব্দ কোনো কাগজে লেখা ছিল না, কোনো সিংহাসনের দান ছিল না, কোনো বিদেশি ক্ষমতার অনুমোদন ছিল না; সে শব্দ জন্মেছিল মানুষের রক্তে, মানুষের অশ্রুতে, মানুষের অদম্য প্রত্যয়ে। সেই শব্দের নাম বাংলাদেশ।
কিন্তু স্বাধীনতার ভোরের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল অন্ধকারের একদল প্রহরী। তারা বাংলার মানুষকে মানুষ বলে মানেনি, বাংলার ভাষাকে ভালোবাসেনি, বাংলার মাটিকে আপন বলে গ্রহণ করেনি। তারা বিদেশি শাসকের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল, ঘরের দরজা দেখিয়ে দিয়েছিল ঘাতককে, প্রতিবেশীর নাম তুলে দিয়েছিল মৃত্যুর তালিকায়, আর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম রাতে তারা ভেবেছিল বন্দুক দিয়ে একটি জাতির আত্মাকে হত্যা করা যায়। তারা ভুল করেছিল। মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করা যায় না; ঘর পোড়ানো যায়, কিন্তু স্বপ্ন পোড়ানো যায় না; একটি প্রজন্মকে রক্তাক্ত করা যায়, কিন্তু একটি জাতির চৈতন্যকে চিরদিন বন্দী রাখা যায় না।
একাত্তর তাই শুধু একটি যুদ্ধের নাম নয়, একাত্তর একটি নৈতিক সীমারেখা। একদিকে মানুষ, অন্যদিকে মানুষের অমানবিকতা; একদিকে স্বাধীনতার সূর্য, অন্যদিকে পরাধীনতার অন্ধকার; একদিকে বাংলা, অন্যদিকে বাংলাকে অস্বীকার করার রাজনীতি। সেই সীমারেখা আমরা ভুলব না। যে জাতি নিজের ইতিহাসের রক্ত শুকিয়ে গেলে তার দাগ মুছে ফেলে, একদিন সে নিজের ভবিষ্যতের দরজাও হারিয়ে ফেলে। তাই ইতিহাস আমাদের কাছে পুরোনো কোনো কাহিনী নয়, ইতিহাস আমাদের মেরুদণ্ড।
আজও কোথাও যদি রাজাকারি মতাদর্শের বিষবীজ অঙ্কুরিত হয়, তাকে চিনতে হবে। আজও যদি কেউ সাম্প্রদায়িকতার নামে মানুষের পরিচয়কে খণ্ডিত করতে চায়, তাকে প্রতিরোধ করতে হবে। আজও যদি কেউ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে, ঘাতকের অপরাধকে আড়াল করে, শহীদের আত্মত্যাগকে তুচ্ছ করে, স্বাধীনতার মূল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে বাংলাদেশের আত্মপরিচয়কে রক্ষা করা।
উপড়ে ফেলো সেই বিষবৃক্ষের শিকড়, যে শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে একাত্তরের রক্তকে অস্বীকার করতে শেখায়। কেটে দাও সেই কাণ্ড, যার ছায়ায় সাম্প্রদায়িকতা আশ্রয় নেয়। ঝরিয়ে দাও সেই পাতা, যেখানে মিথ্যা ইতিহাসের সবুজ রং মেখে বিষাক্ত বাতাস তৈরি হয়। পুড়িয়ে দাও সেই ফল, যার ভেতরে ঘৃণার বীজ লুকিয়ে থাকে। আগুন লাগুক মিথ্যার অন্ধকারে। বজ্র নামুক অন্যায়ের প্রাসাদে। বিপ্লব হোক মানুষের মুক্তির পক্ষে।
বাংলাদেশ কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বাংলাদেশ কোনো মানুষের বিরুদ্ধে নয়। বাংলাদেশ দাঁড়াক সেই মানবিকতার পক্ষে, যেখানে মানুষের পরিচয়ের আগে মানুষ, যেখানে ধর্ম ব্যক্তির বিশ্বাস, রাষ্ট্র সবার, সংস্কৃতি সবার, আকাশ সবার, নদী সবার। এই মাটিতে মসজিদের আজান যেমন আকাশ ছোঁবে, তেমনি মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিও বাতাসে বাজবে; বাউলের একতারা, ভাটিয়ালির সুর, রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম, নজরুলের বিদ্রোহ, লালনের অসীম মানুষ, জীবনানন্দের বাংলার মাঠ, সব মিলেই গড়ে উঠবে আমাদের চৈতন্যের ভূগোল। যে রাজনীতি এই বহুত্বকে ধ্বংস করতে চায়, সে বাংলাদেশের আত্মার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
আমরা ভুলব না বঙ্গবন্ধুকে। কারণ বঙ্গবন্ধু কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের বজ্রসংকেত; একটি জাতিকে নিজের নাম উচ্চারণ করতে শেখানো এক কণ্ঠ; পরাধীনতার দীর্ঘ অন্ধকারের ভেতর স্বাধীনতার দরজা খুলে দেওয়া এক অবিনাশী রাজনৈতিক স্বপ্ন। তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ কোনো ঘৃণার রাষ্ট্র নয়, কোনো প্রতিহিংসার ভূখণ্ড নয়, কোনো সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার কারাগার নয়। তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ মানুষের, শ্রমের, অধিকারের, মর্যাদার, সংস্কৃতির এবং স্বাধীন চিন্তার বাংলাদেশ।
তাই যারা ইতিহাসের পাতা থেকে একাত্তরকে মুছে ফেলতে চায়, তাদের বলো, ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। পদ্মার জল থেকে কি রক্তের স্মৃতি মুছে ফেলা যায়? শহীদের কবর থেকে কি স্বাধীনতার অর্থ মুছে ফেলা যায়? মায়ের চোখের জল থেকে কি সন্তানের আত্মত্যাগ মুছে ফেলা যায়? কোনো ক্ষমতার কলম কি সেই কোটি মানুষের স্বপ্নকে মুছে দিতে পারে, যারা বুকের রক্ত দিয়ে একটি পতাকার জন্ম দিয়েছিল? না, পারে না।
বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বাংলাদেশ একটি অর্জিত চৈতন্য। এই চৈতন্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধের পাঠ নিতে হবে। শুধু স্মৃতিসৌধে ফুল দিলেই হবে না, মানুষের প্রতি ন্যায় করতে হবে। শুধু জাতীয় পতাকা তুললেই হবে না, পতাকার মর্যাদা জীবনে ধারণ করতে হবে। শুধু একাত্তরের গান গাইলেই হবে না, অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করতে হবে। শুধু রাজাকার শব্দটি উচ্চারণ করলেই হবে না, রাজাকারি মানসিকতার প্রতিটি ছদ্মবেশ চিনতে শিখতে হবে।
রাজাকারি শুধু একটি পোশাক নয়, শুধু একটি পুরোনো পরিচয় নয়; রাজাকারি একটি মানসিকতা, যে মানসিকতা নিজের দেশের মানুষের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, যে মানসিকতা অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণকে বুদ্ধিমত্তা মনে করে, যে মানসিকতা সত্যের চেয়ে ক্ষমতাকে বড় করে, মানবতার চেয়ে ঘৃণাকে বড় করে, স্বাধীনতার চেয়ে প্রভুত্বকে বড় করে। সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে আমাদের কবিতা হোক মশাল, আমাদের কণ্ঠ হোক বজ্র, আমাদের শিক্ষা হোক প্রতিরোধ, আমাদের সংস্কৃতি হোক দুর্গ,
আমাদের বিবেক হোক সীমান্তের প্রহরী।
যে শিশুটি আজ বাংলা বর্ণমালা শিখছে, তার হাতে আমরা বন্দুক দেব না, দেব বই। তাকে ঘৃণার ইতিহাস দেব না, দেব সত্যের ইতিহাস। তাকে বলব না, তোমার প্রতিবেশী তোমার শত্রু; তাকে শেখাব, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে। তাকে বলব না, ভিন্ন বিশ্বাস মানেই ভিন্ন মানুষ; তাকে শেখাব, বৈচিত্র্যই বাংলার সৌন্দর্য। কারণ আগামী বাংলাদেশের যুদ্ধক্ষেত্র হবে তার বিদ্যালয়, তার চিন্তা, তার বিবেক, তার সংস্কৃতি। সেখানে যে জয়ী হবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তারই হবে।
এসো, একাত্তরকে কেবল স্মরণ নয়, ধারণ করি।
বঙ্গবন্ধুকে কেবল উচ্চারণ নয়, তাঁর মানবিক স্বপ্নকে ধারণ করি। শহীদের কেবল ফুল নয়, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ উপহার দিই। বাংলাকে কেবল ভালোবাসি না, বাংলার মানুষকেও ভালোবাসি। স্বাধীনতাকে কেবল উৎসব করি না, স্বাধীনতার দায়ও বহন করি।
আজ শপথ হোক, এই মাটিতে পরাধীনতার বীজ বোনা যাবে না। এই বাংলায় সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষবৃক্ষ বেড়ে উঠতে দেওয়া হবে না। এই প্রজন্মের চোখের সামনে একাত্তরের সত্যকে বিকৃত করা হবে না। শহীদের রক্তকে কোনো ক্ষমতার দরবারে বিক্রি করা হবে না। বাংলার সংস্কৃতিকে কোনো সংকীর্ণতার বেড়াজালে বন্দী করা হবে না। মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে কোনো অন্ধ মতাদর্শের কাছে সমর্পণ করা হবে না।
আর যদি অন্ধকার ফিরে আসে, আমরা আলো নিয়ে দাঁড়াব। যদি মিথ্যা ফিরে আসে, আমরা ইতিহাস নিয়ে দাঁড়াব। যদি ঘৃণা ফিরে আসে, আমরা মানবতা নিয়ে দাঁড়াব। যদি পরাধীনতার ছায়া ফিরে আসে, আমরা একাত্তরের সূর্য হাতে দাঁড়াব।
আমরা সেই জাতি, যে মৃত্যুর মুখ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে, যে রক্তের নদী পেরিয়ে পতাকা তুলেছে। যে একদিন বলেছিল, এই মাটি আমাদের, এই ভাষা আমাদের, এই আকাশ আমাদের, এই স্বাধীনতা আমাদের।
শিকড় উপড়ে ফেলো, কিন্তু মানুষের নয়, অন্যায়ের। বীজ ধ্বংস করো, কিন্তু জীবনের নয়, ঘৃণার। দুর্গ ভেঙে দাও, কিন্তু মানুষের নয়, পরাধীনতার। আগুন জ্বালাও, কিন্তু ঘরে নয়, মিথ্যার অন্ধকারে। তারপর দেখবে, বাংলার মাটির গভীর থেকে একদিন আবার উঠে আসবে সবুজের অঙ্কুর, পদ্মার জলে জেগে উঠবে নতুন সূর্য, ধানের শীষে দুলবে মানুষের স্বপ্ন, শিশুর কণ্ঠে ফিরবে স্বাধীনতার গান, আর লাল সবুজ পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে একটি নতুন প্রজন্ম উচ্চারণ করবে, এই বাংলা কোনো ঘাতকের উত্তরাধিকার নয়, এই বাংলা কোনো দোসরের সম্পত্তি নয়, এই বাংলা কোনো পরাধীনতার শিবির নয়।
এই বাংলা মানুষের। এই বাংলা মুক্তির। এই বাংলা একাত্তরের। এই বাংলা মুজিবের স্বপ্নের। এই বাংলা বাঙালির। এই বাংলা আমাদের।
আর যতদিন এই পতাকা আকাশে থাকবে, ততদিন আমাদের কণ্ঠে জ্বলবে সেই অমোঘ শপথ, “বাংলাদেশের মাটিতে রাজাকারি অন্ধকারের কোনো পুনর্জন্ম নয়, বরং প্রতিটি প্রজন্মের হাতে একটি করে সূর্য জন্ম নেবে।”
প্রদ্যোত / ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬