রাষ্ট্রের কাছে স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি
রাষ্ট্রের কাছে স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি
স্বাভাবিক জীবন দিতে যখন ব্যর্থ হচ্ছ, রাষ্ট্র,
অন্তত স্বাভাবিক মৃত্যুটুকু দাও!
বেঁচে থাকাটাই যদি প্রতিদিন
আতঙ্কের সঙ্গে করা এক অসম চুক্তি হয়,
যদি প্রতিটি সকাল বুকের ভেতর
মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে দরজা খোলে,
তবে বলো, রাষ্ট্র,
মানুষ আর কতবার মরলে তোমার ঘুম ভাঙবে?
আমরা প্রাসাদ চাই না,
চাই না তোমার আকাশছোঁয়া
প্রতিশ্রুতির ফাঁপা মিনার।
চাই না বক্তৃতার আগুন,
চাই না কাগজে আঁকা নিরাপত্তার নীলনকশা।
চাই শুধু রাস্তায় বেরিয়ে
জীবিত ফিরে আসার অধিকার,
চাই ঘুমের ভেতরও বুকের কাছে
ভোরের নিশ্চয়তাটুকু,
চাই সন্তানের হাত ধরে
বাড়ি ফেরার মতো একটুখানি সভ্য দেশ।
কিন্তু যদি সেইটুকুও দিতে না পারো,
তবে মৃত্যুর পথেও কেন তোমার এত প্রহরা?
কেন বন্দুকের নল মানুষের দিকে ঘোরে?
কেন বিস্ফোরণের শব্দ
ঘুমন্ত শহরের বুক চিরে যায়?
কেন আগুনের জিহ্বা
ঘর থেকে ঘরে ছুটে বেড়ায়?
কেন উন্মত্ততার রাজদণ্ডে
মানুষের জীবনকে বানানো হয়
একটি তুচ্ছ, ভঙ্গুর সংখ্যা?
রাষ্ট্র, শুনে রাখো,
মানুষ কোনো পরিসংখ্যান নয়।
একটি লাশ কোনো সংখ্যা নয়,
একটি মৃত্যু কোনো সংবাদ শিরোনাম নয়,
কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তির ঠান্ডা বাক্য নয়।
একটি লাশের সঙ্গে
একটি মায়ের পৃথিবী ভেঙে পড়ে,
একটি বাবার বুকের ভেতর
নীরব বিস্ফোরণ ঘটে,
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়।
তোমার ব্যর্থতার প্রতিটি গুলির শব্দ
কোনো না কোনো ঘরে
শোকের দরজা খুলে দেয়।
তোমার অবহেলার প্রতিটি ইট
কোনো না কোনো মানুষের কবরের ওপর
আরেকটি স্তর হয়ে জমে।
তোমার নীরবতার প্রতিটি মুহূর্ত
কোনো না কোনো পরিবারের
চিৎকারকে আরও গভীরে পুঁতে দেয়।
জীবনের নিরাপত্তা দিতে যদি না পারো,
অন্তত মৃত্যুর স্বাভাবিক অধিকারটুকু ফিরিয়ে দাও।
মানুষ যেন বার্ধক্যে মরে, রোগে মরে,
সময়ের অনিবার্য নিয়মে মরে।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় নয়,
ক্ষমতার উন্মত্ততায় নয়,
অন্যের ঘৃণার নিশানায় নয়,
বন্দুকের গর্জনে নয়,
আগুনের লেলিহান দাঁতে নয়।
কী অদ্ভুত রাষ্ট্র তুমি!
জীবনের নিশ্চয়তা নেই,
মৃত্যুরও নিশ্চয়তা নেই।
মানুষ জন্মায় অনিশ্চয়তায়,
বাঁচে আতঙ্কে, মরে অস্বাভাবিকতায়,
আর তোমার ফাইলের পাতায়
সবকিছুই নাকি “স্বাভাবিক”!
না, রাষ্ট্র, না!
এই স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা আমরা মানি না।
যে দেশে নিরাপদে বেঁচে থাকা
অধিকার নয়, সৌভাগ্য,
যে দেশে ঘরে ফেরাও একটি দৈব ঘটনা,
যে দেশে মৃত্যুর কারণ জানতে
লাশের পরিচয় অপেক্ষা করে,
সেই দেশের এই স্বাভাবিকতা
আসলে এক সুসজ্জিত অস্বাভাবিকতা।
তাই আজ আমাদের দাবি খুব বড় নয়,
কিন্তু তার চেয়ে মৌলিকও কিছু নেই।
ক্ষমতার মুকুট চাই না,
চাই না উন্নয়নের আতশবাজি,
চাই না শূন্য প্রতিশ্রুতির মহাকাব্য।
প্রাণময় জীবন দিতে না পারলে,
অন্তত মৃত্যুকে হত্যায় পরিণত করো না।
মানুষের শেষ নিঃশ্বাসটুকু
তোমাদের ব্যর্থতার সাক্ষ্য বানিয়ো না।
রাষ্ট্র, আমরা বাঁচতে চাই!
আর যদি কোনোদিন বাঁচা অসম্ভব হয়ে যায়,
তবে অন্তত মরতে দাও মানুষের মতো।
শেষ মুহূর্তে যেন বুকের ভেতর
বোমার শব্দ না বাজে, গুলির শব্দ না ওঠে,
পৈশাচিক ছুরি রক্তাক্ত না হয়,
আগুনের গন্ধ না থাকে।
মানুষ যেন শেষবার চোখ বন্ধ করে
ভয়ে নয়, ক্লান্তির শান্তিতে।
শেষ নিঃশ্বাসে যেন অভিশাপ নয়,
থাকে জীবনের প্রতি মমতা।
আর পৃথিবী ছাড়ার আগে
তার ঠোঁটে যেন এই কথাটুকু থাকে,
“আজ আর কোনো আতঙ্ক নেই।
কেউ আমাকে হত্যা করতে আসছে না।
কেউ আমার ঘর জ্বালাতে আসছে না।
রাষ্ট্র অন্তত আজ আমার মৃত্যুটুকু স্বাভাবিক রেখেছে।”
প্রদ্যোত