ঘুম নেই
ঘুম নেই
সেই কবে, কোনো এক বিস্মৃত ঋতুর গভীর প্রহরে, জাগতিকতার ভুলভাল ব্যারিকেডগুলো একে একে ভেঙে, সমস্ত হিসাব নিকাশ, দেনা পাওনা, সামাজিক ভদ্রতার কৃত্রিম মুখোশ, মানুষের বানানো অসংখ্য জরুরি কাজ আর অপ্রয়োজনীয় কর্তব্যের পাহাড় পেরিয়ে আমি একবার ঘুমের পথে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, পৃথিবী থেকে সাময়িক নির্বাসন নিয়ে এবার আমি নিজের ভেতরে ফিরব। চোখের পাতার নিচে যে অন্ধকার জমে থাকে, তারও তো একটি নিজস্ব মহাবিশ্ব আছে। সেখানে কোনো কর আদায়কারী নেই, কোনো শাসক নেই, কোনো প্রশ্নপত্র নেই, কোনো উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু নিঃশব্দ এক সাগর। তার জলে ডুবে গেলে মানুষ নিজের নাম, পরিচয়, পেশা, ব্যর্থতা, সাফল্য, অপমান, অহংকার, সবকিছুকে তীরে ফেলে রেখে কেবল একটি প্রাণ হয়ে থাকতে পারে।
নিবিড় তন্দ্রার সেই আদিম আলিঙ্গনে শরীর যখন ধীরে ধীরে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ভুলে যাচ্ছিল, যখন চেতনার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল নীল অন্ধকারের কোমল দূত, যখন মনে হচ্ছিল, আর একটু পরেই আমি সমস্ত শব্দের ওপারে চলে যাব, সমস্ত কোলাহলের নিচে নেমে যাব, নিজের আত্মার গোপন কূপ থেকে এক মুঠো নির্মল জল তুলে মুখে দেব, ঠিক তখনই তোমরা এলে।
তোমাদের অনাহুত হাত আমাকে টেনে তুলল ঘুমের গভীরতা থেকে। আমার স্বপ্নের পাখিটাকে তোমরা ডানা ধরে ছুড়ে দিলে বাস্তবের কাঁটাতারে। আমার চোখ খুলে গেল, কিন্তু ঘুম ভাঙল না। বরং আমাকে পাঠিয়ে দিলে এমন এক শহরের মধ্যে, যেখানে সবাই চোখ মেলে ঘুমায়, জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখতে দেখতে অন্যের স্বপ্ন ভেঙে দেয়, আর নিজেদের জাগ্রত বলে ঘোষণা করে ঘুমেরই রাজদরবারে।
এই শহরে রাজ্যের ঘুম মানুষের চোখে।
কেউ ফুটপাত ধরে হাঁটছে, ঘুমিয়ে। কেউ অফিসের কাচঘেরা ঘরে বসে, ঘুমিয়ে। কেউ সংসারের টেবিলে বসে ভাত খাচ্ছে, ঘুমিয়ে। কেউ প্রেম করছে, ঘুমিয়ে। কেউ ঘৃণা করছে, ঘুমিয়ে। কেউ ধর্মের নামে আগুন জ্বালাচ্ছে, ঘুমিয়ে। কেউ পতাকা হাতে স্বাধীনতার গান গাইছে, ঘুমিয়ে। কেউ বিপ্লবের স্লোগান দিচ্ছে, ঘুমিয়ে। কেউ ক্ষমতার চেয়ারে বসে ভবিষ্যতের ভাগ্য লিখছে। তার কলমের নিবে জমে আছে শতাব্দীর ঘুম।
মানুষ হাঁটতে হাঁটতে ঘুমায়, ঘুমোতে ঘুমোতে হাঁটে। কেউ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। তার পাশে নোংরা ডাস্টবিন, পচা খাবার, প্লাস্টিক, মানুষের ফেলে যাওয়া সভ্যতার দুর্গন্ধ। সেখানেও সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। যেন পৃথিবী তার জন্য একটি বিশাল শয্যা, আর মৃত্যু কেবল একটি দীর্ঘতর ঘুমের অন্য নাম।
শুধু আমি ঘুমোতে পারি না। আমার চোখের ভেতর কেউ একটি জানালা খুলে রেখেছে। সেই জানালা দিয়ে রাত ঢোকে, নদী ঢোকে, মৃত মানুষের মুখ ঢোকে, অনাহারী শিশুর কান্না ঢোকে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষের নিঃসঙ্গতা ঢোকে, পরিত্যক্ত রেললাইনের দীর্ঘশ্বাস ঢোকে। পৃথিবীর সমস্ত অসমাপ্ত প্রশ্ন এসে আমার বালিশে মাথা রাখে। যে প্রশ্নের উত্তর কোনো অভিধানে নেই, যে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সভ্যতা বারবার নিজেরই গলা কেটেছে, সেই প্রশ্নগুলো রাতের পর রাত আমার কানের কাছে ফিসফিস করে। তাই আমার ঘুম আসে না।
পড়ন্ত বিকেলে যখন সূর্য পশ্চিমের রক্তাক্ত জানালায় শেষ স্বাক্ষর রেখে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে থাকে, যখন আকাশের গায়ে প্রথম চাঁদের আভাস জেগে ওঠে, মনে হয়, কেউ যেন মহাশূন্যের কালো ক্যানভাসে একটি সাদা ক্ষত এঁকে দিয়েছে। তখন আমার বুকের ভেতর আবার অস্থিরতার ঘোড়া ছুটতে শুরু করে।
বন্ধু ‘বাইসাইকেল’র প্যাডেলে পা রাখে আমি ছুটে যাই। পিছনে পড়ে থাকে শহর, বিজ্ঞাপনের নীল আলো, কৃত্রিম হাসির বিলবোর্ড, ব্যস্ত মানুষের মুখ, ট্রাফিকের কর্কশ হর্ন, দোকানের শাটার, বহুতলের অন্ধ জানালা। সামনে শুধু রাস্তা। রাস্তার ওপরে সন্ধ্যা। সন্ধ্যার ওপরে আকাশ। আর আকাশের ওপরে এক অস্তগামী সূর্য, যেন কোনো পালিয়ে যাওয়া দেবতা, যাকে আমি ধরতে চাই। আমি তাকে তাড়া করি। কেন করি, জানি না।
হয়তো মানুষ জীবনে যেসব জিনিস কোনোদিন ধরতে পারে না, তার পেছনেই সবচেয়ে বেশি ছুটে যায়। সময়, যৌবন, প্রেম, স্বাধীনতা, সত্য, ঈশ্বর, সবই আমাদের সামনে অস্তগামী সূর্যের মতো দৌড়ে পালায়। আমি সাইকেলের প্যাডেলে ঝড় তুলি, রক্তে আগুন জ্বালি, ফুসফুসে রাত ভরি, তবু তাদের কাছে পৌঁছাতে পারি না। তবু ছুটি। পৌঁছে যাওয়া নয়, ছুটে যাওয়াটাই হয়তো মানুষের শেষ স্বাধীনতা।
রেলসড়কের সমান্তরাল ইস্পাতের ফ্রেমগুলো তখন অন্ধকারে দীর্ঘ কোনো অদৃশ্য বাদ্যযন্ত্রের তারের মতো পড়ে থাকে। দূরে ট্রেনের আলো জ্বলে ওঠে, একটি চলমান নক্ষত্রের মতো। মনে হয়, এই লোহার রেখাগুলোর ওপর দিয়ে যদি পৃথিবীর সমস্ত সময়কে তুলে বসানো যেত, যদি সূর্যকে একটি কামরায়, চাঁদকে আরেকটি কামরায়, স্মৃতিকে তৃতীয়টিতে, আর আমার সমস্ত অসমাপ্ত স্বপ্নকে শেষ কামরায় তুলে দিয়ে চালিয়ে দেওয়া যেত অনন্তের দিকে!
কোনো স্টেশন নেই। কোনো শেষ গন্তব্য নেই। কোনো টিকিট পরীক্ষক নেই। শুধু অনন্ত। আমি সেই ট্রেনের চালক হতে চাই। আমি চাই সূর্যাস্তের আগুন আর চাঁদের শীতলতা একই জানালায় পাশাপাশি বসুক। আমি চাই দিন ও রাতের মধ্যে যে কৃত্রিম বিভাজন মানুষ বানিয়েছে, তা ভেঙে যাক। আমি চাই সময়ের ঘড়ি থেমে যাক এক মুহূর্তের জন্য, যাতে আমরা বুঝতে পারি, জীবন আসলে ঘড়ির কাঁটায় নয়, অনুভবের গভীরতায় মাপা হয়।
তারও পরে, মধ্যরাত যখন নগরের সমস্ত শব্দকে ধীরে ধীরে গিলে ফেলে, যখন বহুতলের জানালাগুলো একে একে অন্ধ হয়ে আসে, যখন মানুষের মুখগুলো ঘুমের ভাঁজে নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলে, তখন আমি শহরের অলিগলি পেরিয়ে বাইপাস হয়ে দূরের রেলস্টেশনের দিকে চলে যাই।
সেখানে শহর একটু কম মিথ্যুক। সেখানে আলো কম, আকাশ বেশি। সেখানে বিজ্ঞাপনের চিৎকার নেই। আছে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস। সেখানে মানুষের তৈরি সীমারেখাগুলো দূরে সরে যায়, আর আকাশ তার বিশাল নীল কালো দেহ নিয়ে মাথার ওপর নেমে আসে।
স্টেশনের বিস্তৃত লনে দাঁড়িয়ে দ্বাদশীর চাঁদ দেখি। কী অদ্ভুত! চাঁদ তখন পূর্ণ নয়। তবু অসম্পূর্ণতার মধ্যেই তার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি। মানুষও কি তাই নয়? আমরা কেউই পূর্ণ নই। প্রত্যেকের শরীরে একটি অদৃশ্য ঘাটতি, প্রত্যেকের আত্মায় একটি অমীমাংসিত ক্ষত, প্রত্যেকের ভালোবাসায় একটি না বলা বাক্য, প্রত্যেকের জীবনে একটি অনুপস্থিত মানুষ। তবু সেই অসম্পূর্ণতাই আমাদের মানুষ করে। আমি চাঁদের দিকে তাকিয়ে একা একা আগমনী গাই। কে শুনছে জানি না। হয়তো বাতাস। হয়তো ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির। হয়তো কোনো অদৃশ্য দেবী, যিনি মানুষের সমস্ত কান্না শুনেও কোনোদিন নিজের নাম প্রকাশ করেননি। হয়তো কেউই না। তবু গাই।
গান কখনো কখনো শ্রোতার জন্য নয়, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। যে গান কেউ শোনে না, সেটিও আকাশে জমা থাকে। যে কান্না কেউ বোঝে না, সেটিও মহাবিশ্বের কোনো অদৃশ্য নক্ষত্রে আলো হয়ে জ্বলে। যে মানুষকে কেউ মনে রাখে না, তার পদচিহ্নও একদিন মাটির গভীরে ইতিহাসের শিকড় হয়ে থাকে। তারপর আবার প্যাডেলে ঝড় তুলি। ফিরে আসি সেই ঘুম ঘুম নাগরিক জনজঙ্গলের মধ্যে। মানুষ তখনও ঘুমিয়ে। শহর ঘুমিয়ে। বিলবোর্ড ঘুমিয়ে। নিয়ন আলো ঘুমিয়ে। রাজনীতি ঘুমিয়ে। নৈতিকতা ঘুমিয়ে। বিবেক ঘুমিয়ে।
কখনো কখনো মনে হয়, এমনকি ঈশ্বরও ঘুমিয়ে আছেন। মানুষের তৈরি মন্দির, মসজিদ, গির্জা, উপাসনালয়ের ঘণ্টা, আজান, প্রার্থনার শব্দের নিচে তিনি হয়তো ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজে আছেন। তখন আমি একা দাঁড়িয়ে থাকি। আমার চারপাশে ঘুমন্ত পৃথিবী। আমার ভেতরে জেগে থাকা একটি আগুন।
আমি বুঝতে পারি, ঘুম না আসাটাও কখনো কখনো এক ধরনের দায়িত্ব। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন কাউকে না কাউকে পাহারা দিতেই হয়। কেউ না কেউ জেগে থাকবে, যাতে অন্ধকার এসে পৃথিবীর শেষ প্রদীপটি নিভিয়ে দিতে না পারে। কেউ না কেউ জেগে থাকবে, যাতে শিশুর স্বপ্নের ওপর দিয়ে যুদ্ধের বুট চলে যেতে না পারে। কেউ না কেউ জেগে থাকবে, যাতে মানুষের মুখ থেকে মানুষের ভাষা পুরোপুরি হারিয়ে না যায়। কেউ না কেউ জেগে থাকবে, যাতে সত্যকে কবর দেওয়ার পর তার কবরের ওপর মিথ্যার প্রাসাদ গড়ে উঠতে না পারে। কেউ না কেউ জেগে থাকবে। হয়তো সেই একজন আমি। তাই আমার ঘুম নেই।
আমার চোখের নিচে যে কালো দাগ, তা ক্লান্তির নয়, সময়ের ছায়া। আমার রক্তে যে অস্থিরতা, তা অসুখ নয়, অস্তিত্বের ডাক। আমার নিঃসঙ্গতা কোনো অভিশাপ নয়, এটি আমার সাক্ষ্য। আমি দেখেছি মানুষ কীভাবে নিজের হাতে নিজের চোখ বেঁধে সূর্যের দিকে তাকায়। আমি দেখেছি মানুষ কীভাবে নিজের তৈরি খাঁচাকে স্বাধীনতা বলে ভালোবাসে। আমি দেখেছি মানুষ কীভাবে ভিড়ের মধ্যে থেকেও একা হয়ে যায়, আর একা হয়ে থেকেও ভিড়ের মতো চিন্তা করে। আমি দেখেছি, সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধকার রাতের নয়। মানুষের চেতনায় যখন আলো থাকার পরও আলো জ্বলে না, তখন যে অন্ধকার জন্ম নেয়, সেটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। তাই আমি ঘুমাতে চাই না। অন্তত যতক্ষণ না পৃথিবী তার স্বপ্নকে চিনতে শেখে।যতক্ষণ না মানুষ বুঝতে শেখে, জেগে থাকা মানে শুধু চোখ খোলা নয়।
জেগে থাকা মানে প্রশ্ন করা। জেগে থাকা মানে অন্যায়ের সামনে নিজের নীরবতাকে অপরাধ বলে চিনতে পারা। জেগে থাকা মানে নিজের ভিতরের পশুটিকে প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষে রূপান্তর করা। জেগে থাকা মানে নিজের ভয়ের চোখে চোখ রেখে বলা, আমি তোমাকে চিনি, কিন্তু তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করব না। জেগে থাকা মানে ভালোবাসার জন্য নিজের অহংকারকে হত্যা করা। জেগে থাকা মানে নিজের ভুল স্বীকার করার মতো সাহস অর্জন করা। জেগে থাকা মানে অন্যের কান্নাকে নিজের ঘুমের চেয়ে বেশি জরুরি মনে করা। আর যদি এই জেগে থাকা আমাকে একদিন মানুষের ভিড় থেকে নির্বাসিত করে, যদি আমাকে পাগল বলে, একাকী বলে, অস্বাভাবিক বলে, যদি আমার চোখের নিচের অন্ধকার নিয়ে হাসাহাসি করে, তবুও আমি জেগে থাকব।
কখনো কখনো সভ্যতার সবচেয়ে জরুরি মানুষটি সেই মানুষ, যে সভ্যতার উৎসবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চিৎকার করে বলে, আগুন লেগেছে! আর সবাই তাকে পাগল ভেবে ঘুমিয়ে থাকে। আমি সেই পাগল হতে রাজি। আমি সেই একাকী পথিক হতে রাজি, যে রাতের বুক চিরে সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখে, কারণ তার সামনে কোনো গন্তব্য নেই। আছে শুধু একটি অদৃশ্য ভোর। আমি সেই মানুষ হতে চাই, যে অস্তগামী সূর্যকে তাড়া করে, কারণ সে জানে, সূর্যকে ধরা যাবে না। তবু তাকে তাড়া করার মধ্যেই জীবনের সমস্ত কবিতা।
আমি সেই মানুষ হতে চাই, যে দ্বাদশীর অসম্পূর্ণ চাঁদের দিকে তাকিয়ে আগমনী গায়, কারণ সে জানে, পূর্ণতার চেয়ে অসম্পূর্ণতার মধ্যেই জন্ম নেয় আকাঙ্ক্ষা। আমি সেই মানুষ হতে চাই, যে ঘুমন্ত নগরের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের বুকের ভেতর একটি অদৃশ্য ঘণ্টা বাজিয়ে রাখে। যতক্ষণ সেই ঘণ্টা বাজে, পৃথিবী পুরোপুরি মৃত নয়। যতক্ষণ একটি চোখ জেগে থাকে, রাত পুরোপুরি জয়ী নয়। যতক্ষণ একটি কণ্ঠ প্রশ্ন করে, মিথ্যা পুরোপুরি ঈশ্বর হয়ে ওঠেনি। যতক্ষণ একটি হৃদয় ভালোবাসতে পারে, মানুষ পুরোপুরি পাথর হয়ে যায়নি। তাই ঘুম নেই।
ঘুম নেই আমার। ঘুম নেই এই আকাশের। ঘুম নেই দূরের রেললাইনের, যে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে অনন্তের দিকে চলে গেছে। ঘুম নেই সেই চাঁদের, যে প্রতিরাতে পৃথিবীর সমস্ত নিঃসঙ্গ মানুষের জানালায় এসে দাঁড়ায়। ঘুম নেই সেই সূর্যের, যে প্রতিদিন ডুবে গিয়েও পরদিন আবার উঠে আসে। ঘুম নেই নদীর। সে অন্ধকারেও নিজের পথ খুঁজে নেয়। ঘুম নেই বৃক্ষের। তার শিকড় মাটির নিচে থেকেও ভবিষ্যতের দিকে বাড়তে থাকে। ঘুম নেই কবিতার। কারণ কবিতা মানুষের ঘুমন্ত আত্মার দরজায় বারবার কড়া নাড়ে। ঘুম নেই আমার।
আমি এখন জানি, এই পৃথিবীতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে একজন মানুষকে ঈশ্বর হতে হয় না। একজন মানুষকে শুধু জেগে থাকতে হয়। ঈশ্বর হওয়া নয়, মানুষ হয়ে জেগে থাকাই সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে অনন্ত সাধনা। তাই রাত যত গভীর হয়, আমি তত দূরে যাই। সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখি। পিছনে ফেলে আসি ঘুমন্ত নগর। সামনে অন্ধকার। অন্ধকারের ওপারে একটি অদৃশ্য ভোর। আর সেই ভোরের দিকে ছুটতে ছুটতে আমি একা একা, নির্ঘুম, নির্বাসিত, নির্ভীক, একটি ক্ষুদ্র মানুষের শরীরে একটি বিশাল জাগরণের আগুন নিয়ে অনন্তের দিকে চলে যাই।
ঘুম নেই। কোনোদিন হয়তো থাকবে না। আমার চোখে এখন শুধু রাত নয়, একটি অসমাপ্ত পৃথিবীর ভোর জেগে আছে।
প্রদ্যোত