← Back to poetry
❧

দেহের ভিতর যে আকাশ

Poetry

দেহের ভিতর যে আকাশ

তোমাকে ছুঁতে গিয়ে
আমি প্রথম স্পর্শ করেছিলাম পৃথিবী,
তোমার কাঁধে মাথা রেখে শুনেছিলাম
মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা
কোনো অনন্ত নদীর শব্দ।
তখনও জানতাম না,
শরীরেরও একটি আকাশ আছে,
আর ভালোবাসা তার নক্ষত্রমালা।

তোমার চোখের গভীর অন্ধকারে
আমি যে আলো দেখেছি,
তার কোনো নাম নেই।
সে আলো কোনো মন্দিরের প্রদীপ নয়,
কোনো শাস্ত্রের পঙ্‌ক্তি নয়,
সে আলো জন্ম নেয়
দুটি নিঃসঙ্গ প্রাণ পরস্পরের কাছে
নির্ভয়ে নিজেদের সমর্পণ করলে।

তোমার কাছে আসার আকাঙ্ক্ষা
শুধু শরীরের ক্ষুধা ছিল না,
ছিল এক অদৃশ্য দরজায়
বারবার কড়া নাড়ার মতো।
তোমার উষ্ণতার দিকে এগিয়ে গিয়ে
আমি যেন নিজেরই অন্ধকারে প্রবেশ করেছি,
আর সেখানে দেখেছি
আমার সমস্ত অহংকার খুলে পড়ে আছে
নিরাবরণ এক শিশুর মতো।

কত জন্মের তৃষ্ণা এসে
তোমার ঠোঁটের কাছে থেমে যায়,
কত অপ্রকাশিত প্রার্থনা
তোমার নিঃশ্বাসে পায় উচ্চারণ।
তোমার শরীরের কাছে এসে
আমি শরীরকে ভুলিনি,
বরং শরীরের গভীরে শুনেছি
জীবনের প্রথম মন্ত্র,
জন্মের আদিম সঙ্গীত,
রক্তের ভিতর বয়ে যাওয়া সৃষ্টির গোপন বাঁশি।

তোমাকে চাই, কিন্তু তোমাকে গ্রাস করার জন্য নয়।
তোমাকে চাই যেন নদী সমুদ্রকে চায়,
যেন সন্ধ্যা চায় শেষ সূর্যের রক্তিম স্পর্শ,
যেন অন্ধকার চায় একটি মাত্র প্রদীপের জন্ম।
তোমাকে চাই তোমার স্বাধীনতাসহ,
তোমার বিস্ময়সহ, তোমার সমস্ত না বলা কথাসহ।

আমাদের আকাঙ্ক্ষা যদি শুধু ভোগে থেমে যায়,
তবে তা এক মুহূর্তের আগুন।
কিন্তু যদি তার ভিতর মমতার জল জন্ম নেয়,
যদি স্পর্শের সঙ্গে বিশ্বাস এসে বসে,
যদি শরীরের উন্মাদনার পাশে
দুটি হৃদয় একে অন্যের স্বাধীনতাকে
প্রণামের মতো গ্রহণ করে,
তবে সেই মিলন শুধু শরীরের থাকে না,
সে হয়ে ওঠে আত্মার একান্ত সংলাপ।

তোমার চুলে মুখ রাখলে
আমার মনে হয় রাত্রি তার সমস্ত নক্ষত্র
আমার বুকে নামিয়ে দিয়েছে।
তোমার বুকে কান রাখলে
শুনি পৃথিবীর গোপন স্পন্দন,
শুনি জন্মের আগে
কোনো অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তা যেন বলছেন,
“ভালোবাসা ছাড়া কোনো সৃষ্টি সম্পূর্ণ হয় না।”

তোমার শরীর আমার কাছে
কোনো নিষিদ্ধ উপত্যকা নয়,
কোনো লুণ্ঠনের ভূমিও নয়।
সে এক পবিত্র ভূগোল,
যেখানে প্রবেশের আগে আমাকে খুলে রাখতে হয়
আমার অহংকারের সমস্ত দরজা,
আমার অধিকারবোধের সমস্ত অস্ত্র,
আমার ভয়ের সমস্ত প্রাচীর।

তুমি যখন কাছে আসো,
আমার ভিতরের বহু মৃত পাখি
আবার ডানা মেলে।
আমার দীর্ঘ নির্বাসনের শেষে
শরীর হয়ে ওঠে ঘরে ফেরার পথ।
তোমার স্পর্শে আমি তোমাকে যতটা পাই,
তার চেয়েও বেশি নিজেকে ফিরে পাই।

এই কি তবে সেই রহস্য,
যার জন্য মানুষ যুগ যুগ ধরে
আকাশের দিকে তাকিয়েছে?
যে রহস্যের জন্য যোগী চোখ বন্ধ করেছেন,
বাউল দেহের ভেতর মানুষ খুঁজেছেন,
মরমি প্রেমিক অদৃশ্য প্রিয়তমের জন্য
নিজেকে পুড়িয়ে ছাই করেছেন?

হয়তো পরমকে ছোঁয়া
কোনো দূর নক্ষত্রে পৌঁছানো নয়,
বরং একজন মানুষের কাছে
এত গভীরভাবে সত্য হওয়া
যে সেখানে নিজের সমস্ত মিথ্যা ঝরে পড়ে।
হয়তো ঈশ্বরের দরজা
কোনো আকাশের ওপারে নয়,
খুলে যায় সেই মুহূর্তে
যখন দুটি মানুষ পরস্পরের শরীরের কাছে এসে
একজন আরেকজনকে শুধু শরীর বলে দেখে না।

তখন তোমার চোখে
আমি আমার অহংকারের মৃত্যু দেখি,
তোমার নিঃশ্বাসে আমার একাকিত্বের অবসান,
তোমার বুকে আমার সমস্ত পথের ক্লান্তি,
আর তোমার ভালোবাসায়
একটি অদৃশ্য আলোর জন্ম।

তোমাকে আলিঙ্গন করলে
আমার মনে হয় পৃথিবী তার দুই প্রান্ত
এক মুহূর্তের জন্য পরস্পরের কাছে এনেছে।
আকাশ নেমে এসেছে মাটিতে,
মাটি উঠে গেছে আকাশে,
আর আমাদের মধ্যখানে
নীরবে ফুটে উঠেছে একটি অনন্ত পদ্ম।

সেখানে কোনো পাপ নেই,
কোনো পুণ্যের হিসাবও নেই,
আছে শুধু দুটি প্রাণের স্বচ্ছ সম্মতি,
দুটি হৃদয়ের নির্ভেজাল আস্থা,
দুটি শরীরের উষ্ণ জ্যোৎস্না,
আর ভালোবাসার এমন এক দীপ্তি, যেখানে মানুষ
নিজের সীমা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যেতে পারে।

তুমি আমার কাছে কোনো প্রার্থনার উত্তর নও,
তুমি সেই প্রশ্ন যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে
আমি নিজেকেই আবিষ্কার করি।
তুমি কোনো দেবী নও, আমি কোনো ভক্তও নই,
আমরা দুজন দুটি অসম্পূর্ণ মানুষ,
তবু ভালোবাসার মুহূর্তে
আমাদের অসম্পূর্ণতার মধ্যেই
একটি পূর্ণতার আভাস জ্বলে ওঠে।

তোমার ঠোঁটের কাছে এসে
আমি কোনো স্বর্গ খুঁজি না,
আমি খুঁজি এই পৃথিবীর সত্য।
তোমার শরীরের উষ্ণতায়
আমি কোনো অলৌকিকতা দাবি করি না,
আমি শুধু অনুভব করি
জীবন এখনো তার সমস্ত রহস্য নিয়ে
আমাদের ভিতর জেগে আছে।

যদি কামনা হয় নদী,
তবে ভালোবাসা তার স্রোত,
যদি শরীর হয় মাটি,
তবে চেতনা তার বীজ,
যদি স্পর্শ হয় প্রথম অক্ষর,
তবে আত্মসমর্পণ তার কবিতা,
আর যদি প্রেম সত্যিই পূর্ণ হয়,
তবে তার নীরবতার মধ্যেই
জ্বলে ওঠে অদৃশ্য আলোর প্রথম প্রদীপ।

তাই তোমাকে চাই, শুধু রাতের জন্য নয়,
শুধু শরীরের জন্য নয়,
শুধু উন্মাদনার ক্ষণিক জোয়ারের জন্য নয়।
তোমাকে চাই সেই দীর্ঘ ভোরের জন্য
যেখানে শরীরের উত্তাপ পেরিয়ে
দুটি মানুষ বসে থাকে পাশাপাশি,
কথা না বলেও একে অন্যকে বুঝতে পারে।

তোমার পাশে জেগে থাকা
আমার কাছে কখনো কখনো প্রার্থনার চেয়েও গভীর।
তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে
আমি বুঝি, ভালোবাসা আসলে অধিকার নয়,
ভালোবাসা পাহারা নয়,
ভালোবাসা এমন এক মুক্তি
যেখানে দুজন মানুষ একে অন্যকে বেঁধে না রেখে
আরও গভীরভাবে কাছে আসে।

আর সেই মুহূর্তে তোমার হাত যখন
আমার হাতে এসে থামে, আমি জানি,
ঈশ্বরকে হয়তো ছোঁয়া যায় না কোনো হাত দিয়ে।
তবু ভালোবাসার এমন কিছু মুহূর্ত আছে
যেখানে মানুষ ঈশ্বরকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষাটিকে
নিজের মধ্যেই স্পর্শ করতে পারে।

তখন বুঝি, পরম কোনো দূরের নক্ষত্র নয়,
সে হয়তো আমাদের সত্য হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।
সে হয়তো সেই আলো, যেখানে তুমি আমাকে
আমার সমস্ত অন্ধকারসহ গ্রহণ করো,
আর আমি তোমাকে
তোমার সমস্ত অসম্পূর্ণতাসহ ভালোবাসি।

এইভাবে তোমার শরীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে
আমি একদিন আবিষ্কার করি
আমার নিজের আত্মার দরজা।
তোমাকে ভালোবাসতে গিয়ে
আমি শিখি নিজেকে অতিক্রম করার অর্থ।
তোমার মধ্যে হারিয়ে গিয়ে আমি বুঝি,
হারিয়ে যাওয়া সবসময় বিলীন হওয়া নয়,
কখনো কখনো হারিয়ে যাওয়াই
নিজের গভীরতম সত্তায় ফিরে আসা।

তাই এসো, আমরা শরীরকে লজ্জা দেব না,
আকাঙ্ক্ষাকে দেবতা বানাব না,
ভালোবাসাকে ভোগে নামাব না।
আমরা শুধু দুটি সত্য মানুষ হয়ে
পরস্পরের কাছে দাঁড়াব,
যেখানে স্পর্শ হবে বিশ্বাস, চুম্বন হবে কবিতা,
আলিঙ্গন হবে আশ্রয়, মিলন হবে আত্মউন্মোচন,
আর ভালোবাসা হয়ে উঠবে সেই নিঃশব্দ সেতু
যার ওপারে দাঁড়িয়ে
মানুষ প্রথমবার নিজের ভিতরকার অসীমকে
চোখ মেলে দেখতে পায়।

তুমি তখন আর শুধু তুমি নও,
আমিও আর শুধু আমি নই।
আমাদের মাঝখানে যে আলো জ্বলে ওঠে
তার কোনো নাম নেই।
শুধু এতটুকু জানি,
সেই আলোয় শরীর পবিত্র হয়ে ওঠে না,
বরং পবিত্র হয়ে ওঠে আমাদের দেখার চোখ।

আর সেই চোখ দিয়েই আমি তোমাকে দেখি,
তোমার ভিতর দিয়ে জীবনকে দেখি,
জীবনের ভিতর দিয়ে অসীমকে দেখি।
তারপর নীরবে বলি, তোমাকে ছুঁতে চাই
যেন আলোকে ছোঁয়া যায় না জেনেও
একটি প্রদীপের কাছে হাত বাড়ানো।

তোমাকে ভালোবাসতে চাই, যেন তোমার মধ্যে
কোনো ঈশ্বরকে বন্দী করতে নয়,
বরং তোমার পাশে দাঁড়িয়ে
আমার নিজের ভিতরের অসীম আকাশটিকে
একবার সত্যি করে দেখতে পারি।

প্রদ্যোত

✦