মানুষ নামের যুদ্ধবাজ জানোয়ার
মানুষ নামের যুদ্ধবাজ জানোয়ার
তোমরা নিজেদের মানুষ বলো,
আমি আর বিশ্বাস করি না।
মানুষের সংজ্ঞা তোমরা বহু আগেই
মিসাইলের মাথায় লিখে ফেলেছ।
যে হাত শিশুর মাথায় রাখার কথা ছিল,
সে হাত আজ ট্রিগারের ওপর স্থির।
যে চোখে নীল আকাশের বিস্ময় থাকার কথা ছিল,
সে চোখ আজ স্যাটেলাইটে খোঁজে
কোন শহরটাকে আরও নিখুঁতভাবে ধ্বংস করা যায়।
তোমরা সভ্যতা গড়োনি, ধ্বংসের কারখানা গড়েছ।
তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান শেখায়,
আর তোমাদের রাষ্ট্র সেই বিজ্ঞানকে শেখায়
কীভাবে আরও দ্রুত মানুষ হত্যা করতে হয়।
তোমাদের গবেষণাগারে ক্যানসারের ওষুধের চেয়ে
বেশি জন্ম নেয় নতুন প্রজন্মের বোমা।
মানুষের ঘামের কর,
ক্ষুধার্ত কৃষকের রক্ত,
শ্রমিকের ফাটা হাত,
শিশুর অপুষ্ট ভবিষ্যৎ-
সবকিছু মিশে
তোমাদের যুদ্ধবাজ বাজেটে পরিণত হয়।
তারপর তোমরা বলো- “জাতীয় নিরাপত্তা।”
কী আশ্চর্য!
ক্ষুধার নিরাপত্তা নেই,
চিকিৎসার নিরাপত্তা নেই,
শিক্ষার নিরাপত্তা নেই,
নদীর নিরাপত্তা নেই,
বনের নিরাপত্তা নেই,
পৃথিবীর নিরাপত্তা নেই-
কিন্তু মৃত্যুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে
তোমাদের কোনো কার্পণ্য নেই।
তোমরা পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের
ডেকে বলো, “এসো, মানুষ বাঁচাতে নয়,
মানুষ মারতে শেখো।”
তাদের হাতে বই নয়, রাইফেল দাও।
তাদের কাঁধে বেহালা নয়,
রকেট লঞ্চার চাপিয়ে দাও।
তাদের হৃদয় থেকে প্রেম কেড়ে নিয়ে
জাতীয়তাবাদের আগুন ঢেলে দাও।
তারপর বলো, “তুমি বীর।”
কোন বীর?
যে অপরিচিত আরেকজন মানুষের বুকে
গুলি চালায়, সে কি বীর?
না কি রাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত হত্যাকারী?
ফিলিস্তিনের শিশুর কান্না
আজও ধ্বনিত হয় ধ্বংসস্তূপের নিচে।
লেবাননের আকাশ
বারুদের ধোঁয়ায় নিজের নীল রং ভুলে গেছে।
ইসরায়েলের মানুষও ভয়ে ঘুমায়,
কারণ যুদ্ধ কখনো একপক্ষের ঘরে থাকে না।
ইউক্রেনের মাঠে গমের বদলে
আজ বিস্ফোরণের আগাছা জন্মায়।
রাশিয়ার মাটিতেও মায়েরা কাঁদেন,
কারণ কফিন কোনো পতাকার ভাষা বোঝে না।
ইরানের আকাশে প্রতিশোধের বজ্রধ্বনি,
সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ, মরুভূমিতে আগুন,
কূটনীতির টেবিলে অহংকারের নখ।
আমেরিকা, তুমি স্বাধীনতার ভাষণ দাও,
আবার অস্ত্রের বাজারও সাজাও।
রাশিয়া, তুমি ইতিহাসের গৌরব গাও,
আবার ধ্বংসের মানচিত্রও আঁকো।
চীন, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য,
ক্ষমতার প্রতিটি প্রাসাদে একই ভাষা- “লাভ!”
অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছে
শিশুর রক্তেরও বাজারদর আছে।
যুদ্ধ তাদের কাছে শোক নয়-
শেয়ারবাজারের গ্রাফ।
একটি শহর ভস্মীভূত হলে
কারও শেয়ারের দাম বাড়ে।
একটি হাসপাতাল ধসে পড়লে
কারও মুনাফা ফুলে ওঠে।
একটি শিশুর মৃত্যু কারও নতুন চুক্তি।
এই পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যুও ব্যবসার পণ্য।
তোমরা সীমান্ত এঁকেছ।
তারপর সেই সীমান্তের জন্য
অসংখ্য কবর এঁকেছ।
তোমরা পতাকা বানিয়েছ।
তারপর পতাকার কাপড় দিয়ে লাশ ঢেকেছ।
তোমরা ধর্মের নামে, জাতির নামে,
ভূখণ্ডের নামে, প্রতিশোধের নামে,
নিরাপত্তার নামে, সভ্যতার নামে,
স্বাধীনতার নামে, ঈশ্বরের নামেও
মানুষ হত্যা করেছ।
ঈশ্বর নিশ্চয়ই এত রক্তের গন্ধে
নিজের নাম শুনতে চান না।
তোমরা বলো- যুদ্ধ অনিবার্য।
না।
অনিবার্য তোমাদের লোভ।
অনিবার্য ক্ষমতার নেশা।
অনিবার্য অস্ত্র ব্যবসার ক্ষুধা।
অনিবার্য সাম্রাজ্যের স্বপ্ন।
যুদ্ধ তোমাদের সিদ্ধান্ত।
প্রকৃতি চুপচাপ সব দেখছে।
নদী তোমাদের ভাষা শেখেনি।
পাহাড় তোমাদের পতাকা মানে না।
সূর্য কোনো ভিসা নিয়ে ওঠে না।
বাতাস কোনো সীমান্তে থামে না।
তবু তোমরা মাটি ভাগ করো,
আকাশ ভাগ করো, সমুদ্র ভাগ করো,
মানুষ ভাগ করো, ভালোবাসা ভাগ করো।
শেষ পর্যন্ত নিজেদেরও ভাগ করে ফেলো
কবর আর কবরস্থানে।
শোনো, যদি যুদ্ধই তোমাদের ধর্ম হয়,
তবে যুদ্ধ করো।
যদি হত্যাই তোমাদের উৎসব হয়,
তবে উৎসব করো।
যদি ধ্বংসই তোমাদের সভ্যতা হয়,
তবে নিজেদেরই গ্রাস করো।
মিসাইল ছুড়ো,
পারমাণবিক অহংকারে আকাশ পোড়াও,
সমুদ্র কালো করো, অরণ্য ছাই করো,
নিজেদের শেষ দুর্গটুকুও ভেঙে ফেলো।
তোমরা যুদ্ধবাজ গুন্ডারা,
হানাহানি করে নিঃশেষ হয়ে যাও!
এই পৃথিবী কোনো যুদ্ধবাজের
ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
এই নীল গ্রহ
বারুদের উত্তরাধিকার বহন করার জন্য জন্মায়নি।
যেদিন শেষ কামানটি নীরব হবে,
শেষ ক্ষেপণাস্ত্রটি মরিচা ধরবে,
শেষ ট্যাঙ্কটি ঘাসে ঢেকে যাবে,
শেষ যুদ্ধবাজের নাম
ধুলোর অভিধানে হারিয়ে যাবে-
সেদিন একটি শিশুর হাসি
আবার পৃথিবীর জাতীয় সংগীত হবে।
একটি বীজ
সমস্ত সাম্রাজ্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে।
এক ফোঁটা বৃষ্টি
সমস্ত যুদ্ধঘোষণাকে ধুয়ে নিয়ে যাবে।
আর প্রকৃতি অত্যন্ত ধীর, অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ,
অত্যন্ত নিশ্চুপ কণ্ঠে বলবে-
“এবার পৃথিবী ফিরুক
তার সত্যিকারের সন্তানদের কাছে।
যারা অস্ত্র নয়, অঙ্কুর বোনে।
যারা সীমান্ত নয়, নদী আঁকে।
যারা পতাকা নয়, আকাশকে ভালোবাসে।
যারা মানুষ হওয়ার ভান করে না-
সত্যিই মানুষ হয়ে বাঁচে।”
প্রদ্যোত / ১৪ জুলাই ২০২৬