অনন্ত প্রতীক্ষার অর্ঘ্য
অনন্ত প্রতীক্ষার অর্ঘ্য
তোমাকে দেখিনি কখনো
তবু কেন মনে হয়
আমার সমস্ত জন্মের প্রভাত
তোমারই চোখের পাপড়িতে এসে
আলো হতে চেয়েছিল?
কেন মনে হয়, যে নদীটি সহস্র বছর ধরে
পাথরের বুকে তার নীল নাম লিখে চলেছে,
সে-ও বুঝি তোমারই দিকে গোপনে গোপনে
তার সমস্ত জলরাশি সমর্পণ করছে?
আমি জানি না।
শুধু জানি- কিছু অপেক্ষা আছে,
যাদের কোনো ক্যালেন্ডার নেই;
কিছু ভালোবাসা আছে,
যাদের কোনো উচ্চারণ নেই;
কিছু আকাঙ্ক্ষা আছে,
যারা ফুলের মতো ফোটে না-
বরং বৃক্ষের অন্তর্লীন রস হয়ে
শিকড় থেকে আকাশ পর্যন্ত
নিরবচ্ছিন্ন উঠে আসে।
তোমাকে ভাবলেই
সেই অদৃশ্য আরোহনের কথা মনে পড়ে।
তুমি যেন কোনো মুখশ্রী নও-
সৃষ্টিকর্তার অবসরে আঁকা একটি দীর্ঘ ধ্যান।
তোমার চোখ- দুটি কৃষ্ণসায়র,
যেখানে সন্ধ্যাতারা এসে
নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বিস্মিত হয়।
তোমার দৃষ্টি ধনুক নয়, তবু বিদ্ধ করে;
তলোয়ার নয়, তবু বিভাজিত করে
অন্ধকার আর আলোর সীমানা।
তোমার হাসি- অপরিণত বসন্তের প্রথম কোকিল,
যে ডাকলে অরণ্যের সমস্ত শুকনো ডাল
নতুন পাতার স্বপ্ন দেখতে শেখে।
তোমার কেশরাশি- রাত্রির দীর্ঘ উপাখ্যান,
যেখানে চাঁদ নিজেই অতিথি হয়ে আসে।
আর তোমার পদচারণা- মনে হয়,
পৃথিবী যেন নিজের হৃদস্পন্দন
নিজেই শুনতে পায়।
কিন্তু রূপেরও তো একটি সীমা আছে।
তোমার সৌন্দর্য সেখানে থেমে থাকে না।
তোমার চিন্তা বাতাসের মতো স্বাধীন-
তাকে কোনো জানালা আটকে রাখতে পারে না।
তোমার মেধা হিমবাহের মতো-
নিঃশব্দ, অথচ অনিবার্য;
অদৃশ্য, অথচ পর্বতের ভাগ্যও
যার ধৈর্যের কাছে নতজানু।
তোমার মনন একটি প্রাচীন অশ্বত্থ-
যেখানে যুগের পর যুগ
জ্ঞান এসে পাখির বাসা বেঁধেছে।
তোমার কাব্যিকতা শব্দ দিয়ে লেখা নয়-
মনে হয়, নক্ষত্রেরা তাদের অতিরিক্ত আলো
গোপনে তোমার হাতে রেখে গেছে।
তাই তোমাকে ভাবলে
ভালোবাসার আগে শ্রদ্ধা এসে দাঁড়ায়।
তারপর বিস্ময়।
তারপর এক অদ্ভুত নীরবতা।
তারপর…
তারপর সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা,
যার শুরু মনে আছে,
শেষের কোনো স্মৃতি নেই।
আমি সেই অপেক্ষারই মানুষ।
আমি সেই বৃক্ষ,
যে বসন্তের কাছে ফুল চায় না-
শুধু তার পদধ্বনি শুনতে চায়।
আমি সেই উপকূল,
যে সমুদ্রকে নিজের বলে দাবি করে না-
শুধু প্রত্যেক জোয়ারে
তার নোনাজল স্পর্শের স্মৃতি সঞ্চয় করে।
আমি সেই দীপশিখা, যে সূর্য হতে চায় না-
শুধু একবার তোমার বাতাসে দুলে উঠতে চায়।
কত সহস্র সন্ধ্যা আমার জানালায় এসে বসেছে!
কত পূর্ণিমা আমার নিঃসঙ্গতার কপালে
রূপোর টিপ এঁকে চলে গেছে!
কত বর্ষা আমার অপ্রকাশিত বাক্যগুলো
বৃষ্টির জলে ধুয়ে দিয়েছে!
তবু আশ্চর্য- প্রতীক্ষা ক্লান্ত হয়নি।
কারণ সে জানে,
কিছু আগমন বজ্রপাতের মতো নয়-
তারা হিমালয়ের তুষারের মতো,
ধীরে ধীরে, অবিরাম, অবধারিত।
অনেক সময় মনে হয়,
নিয়তি বুঝি আমাদের দু’জনকে
দুটি সমান্তরাল নদীর মতো বয়ে নিয়ে চলেছে।
দূর থেকে দূরান্তে,
অসংখ্য অরণ্য, জনপদ, সভ্যতা পেরিয়ে।
হয়তো একদিন অদৃশ্য কোনো সঙ্গমস্থলে
জল নিজের পরিচয় ভুলে যাবে।
তখন নদী আর নদী থাকবে না-
থাকবে শুধু সমুদ্র।
আমার আকাঙ্ক্ষাও তেমনই।
সে স্পর্শের জন্য ব্যাকুল,
তবু স্পর্শের ভাষা জানে না।
সে নৈকট্যের জন্য তৃষ্ণার্ত,
তবু অধিকার চায় না।
সে চায়- যেমন ভোরের আলো
অন্ধকারকে জয় করে না,
শুধু তাকে আলোকিত করে।
সে চায়- যেমন সুগন্ধ
ফুলকে ছেড়ে যায় না,
তবু সমগ্র বাতাসকে আপন করে নেয়।
সে চায়- যেমন বীণার তারে
অদৃশ্য আঙুলের প্রথম কম্পন
একটি অনন্ত রাগিণীর জন্ম দেয়।
তোমার জন্য আমার সমস্ত বাসনা এমনই-
অধিকারের নয়, অন্তর্লয়ের।
স্পর্শের নয়, সত্তার।
প্রাপ্তির নয়, পূর্ণতার।
যদি কোনোদিন
কৈলাসের শুভ্র তুষার
সূর্যাস্তের রক্তিম আলোয়
অমৃতের মতো জ্বলে ওঠে,
যদি কোনোদিন
দুই নক্ষত্রের মধ্যবর্তী নীরবতা
হঠাৎ এক নতুন নক্ষত্রের জন্ম দেয়,
যদি কোনোদিন
কোনো কবিতার শেষ পঙ্ক্তি
কবির চোখে জল হয়ে ফিরে আসে-
তবে জেনো,
কোথাও একজন মানুষ
তার সমস্ত জীবনকে
একটি দীর্ঘ প্রার্থনার মতো বহন করেছে।
তার সমস্ত উচ্চারণ
শেষ পর্যন্ত নীরবতায় গিয়ে মিশেছে।
আর সেই নীরবতারও ছিল একটি নাম-
যা কখনও ঠোঁটে আসেনি,
তবু প্রতিটি হৃদস্পন্দনে
অবিরাম, অবিচ্ছিন্ন, অনিবার্যভাবে
ফুটে থেকেছে
অমল শেফালিকার সুগন্ধের মতো,
ভোরের আগে আকাশে জেগে থাকা
শেষ তারাটির মতো,
অথবা- অসংখ্য জন্ম পেরিয়েও
একটি অসমাপ্ত প্রেমের
অবিনশ্বর প্রথম পঙ্ক্তির মতো।
একটি অনন্ত ক্যানভাসে
আলোকিত তুলির যাদুস্পর্শের মতো॥
প্রদ্যোত / ২৩ জুলাই ২০২৬