← Back to poetry
❧

চৈতন্যের অনন্ত আলোকশিখা

Poetry

চৈতন্যের অনন্ত আলোকশিখা

যখন পৃথিবীর ক্লান্ত বিকেলে
মানুষ নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে ফেলে,
যখন সভ্যতার কোলাহলে
নিঃশব্দে মরে যায় পাখির গান,
নদীর জল হয়ে ওঠে বিষণ্ণতা,
আর হৃদয় ভুলে যায় ভালোবাসার উচ্চারণ-
ঠিক তখনই
দূর আকাশের কোনো নীল নক্ষত্রের মতো
তুমি এসে দাঁড়াও, রবীন্দ্রনাথ।

তোমার কণ্ঠে জেগে ওঠে-
“আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও…”
আর আমরা অনুভব করি,
মানুষ হওয়াই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাধনা।

তুমি কেবল একজন কবি নও,
তুমি বাঙালির অন্তর্জাগরণের শঙ্খধ্বনি,
তুমি আত্মার দরজায় অবিরাম কড়া নাড়া
এক চিরন্তন চৈতন্য।
তোমার শব্দের ভেতরে
শিশিরের মতো নেমে আসে শান্তি,
বটবৃক্ষের মতো ছায়া দেয় প্রেম,
আর প্রার্থনার মতো
দীপ্ত হয়ে জেগে থাকে মানবতা।

তুমি আমাদের শিখিয়েছ-
ঈশ্বর কোনো দূর নক্ষত্রের নিঃসঙ্গ সিংহাসনে নন,
তিনি আছেন কৃষকের ঘামে,
মায়ের মুখের করুণায়,
শিশুর হাসিতে,
নদীর কলতানে,
পল্লীবধূর শাঁখার শব্দে,
শ্যামল বাংলার ধানের গন্ধে।

তুমি বলেছ-
প্রকৃতির সাথে একাত্ম না হলে
মানুষ কখনো নিজের আত্মাকে চিনতে পারে না।
তাই তো তোমার গানে
বর্ষা নামে প্রেম হয়ে,
শরৎ আসে শুভ্রতার দীপ জ্বেলে,
ফাল্গুন দোলে রঙিন বিদ্রোহে,
আর বসন্তের প্রতিটি পলাশ যেন বলে-
জীবন মানেই পুনর্জন্ম।

তোমার কবিতায়
আমরা শুনি মাটির হৃদস্পন্দন।
তোমার গল্পে
মানুষ হয়ে ওঠে ধর্মের চেয়েও বড়ো।
তোমার সঙ্গীতে
সমস্ত বিভেদের দেয়াল ভেঙে
মানুষ এসে দাঁড়ায় মানুষের পাশে।

তুমি যেন অনন্ত প্রেমের এক মহাসমুদ্র-
যেখানে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান
সব পরিচয় মিলিয়ে যায়
একটি মাত্র উচ্চারণে-
“মানুষ”।

আজকের এই বিদীর্ণ পৃথিবীতে,
যেখানে ঘৃণা প্রতিদিন নতুন নতুন মুখোশ পরে,
যেখানে যুদ্ধের শব্দে কেঁপে ওঠে শিশুর ঘুম,
যেখানে মানুষ প্রযুক্তির কাছে গিয়ে
হারিয়ে ফেলছে নিজের হৃদয়-
সেখানে তোমার গান
একটি প্রদীপের মতো জ্বলে ওঠে।

তুমি শেখাও-
ক্ষমা মানেই দুর্বলতা নয়,
ভালোবাসাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি।
তুমি শেখাও-
শান্তি কোনো ভীরুতার নাম নয়,
বরং তা এক মহাজাগতিক সাহস,
যেখানে মানুষ অস্ত্র ফেলে
আলিঙ্গন করতে শেখে মানুষকে।

তুমি আছ বলেই
বাঙালির ভোর এখনো কোকিলের গানে জেগে ওঠে।
তুমি আছ বলেই
আমাদের চোখে এখনো স্বপ্ন বেঁচে থাকে।
তুমি আছ বলেই
চৈত্রের খর রোদেও
আমরা কল্পনা করি বৃষ্টির সম্ভাবনা।

তোমার “গীতাঞ্জলি” শুধু কাব্য নয়,
এ যেন আত্মার সাথে আত্মার সংলাপ।
তোমার প্রতিটি শব্দ
মানুষকে ভেতর থেকে বিশুদ্ধ হতে শেখায়।
তোমার প্রতিটি সুর
মনে করিয়ে দেয়-
জীবন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয় কেবল,
এ এক বিস্ময়ের যাত্রা।
তুমি যেন মহাকালের প্রার্থনাগৃহে জ্বলতে থাকা
এক অবিনশ্বর প্রদীপ-
যার আলো নিভে যায় না কখনো।

তোমার চেতনা
আমাদের মনের অন্ধকারে জ্বালিয়ে দেয় দীপশিখা,
তোমার দর্শন
আমাদের অহংকার ভেঙে শেখায় বিনয়,
তোমার প্রেম
আমাদের হৃদয়কে নদীর মতো প্রবহমান হতে শেখায়।

আজ তোমার জন্মদিনে
আমরা নতশিরে স্মরণ করি-
তুমি কেবল বাংলা ভাষার কবি নও,
তুমি মানবতার মহাগান।

তুমি সেই বৃক্ষ,
যার ছায়ায় দাঁড়িয়ে
আমরা খুঁজে পাই আত্মার ঠিকানা।

তুমি সেই নদী,
যার জলে ধুয়ে যায়
সভ্যতার সমস্ত ক্লান্তি।

তুমি সেই আকাশ,
যেখানে মানুষ ডানা মেলে
অসীমের দিকে উড়ে যেতে শেখে।

আর তাই-
যতদিন বাংলার আকাশে ভোর হবে,
যতদিন কোনো শিশু প্রথম কবিতা শিখবে,
যতদিন প্রেমিকের চোখে জন্ম নেবে স্বপ্ন,
যতদিন মানুষ শান্তির জন্য প্রার্থনা করবে-
ততদিন তুমি বেঁচে থাকবে।

বেঁচে থাকবে
বকুলের গন্ধে,
বর্ষার রিমঝিমে,
বাউলের একতারায়,
নদীর জলে,
মানুষের ভালোবাসায়।

হে চিরন্তন রবীন্দ্রনাথ,
তোমার আলোয়
আমাদের অন্তর হোক আরও নির্মল,
আমাদের পৃথিবী হোক আরও মানবিক,
আমাদের আত্মা হোক আরও উদার।

তোমার গানেই জেগে উঠুক-
মানুষের ভেতরের মানুষ।

প্রদ্যোত / ২৫ বৈশাখ ১৪৩৩

✦