ক্রোধের উত্তরাধিকার
ক্রোধের উত্তরাধিকার
একটা অপরাধ দিয়ে
আরেকটা অপরাধকে ঢেকে রেখো না-
রক্তের ওপর রক্ত ঢাললে
মাটি কি কখনো শুদ্ধ হয়?
একটা অন্যায়কে প্রতিহত করতে
আরেকটা অন্যায়ের জন্ম দিও না;
কারণ অন্যায়ের কোনো সন্তান
ন্যায়ের নাম নিয়ে জন্মালেও
তার শিরায় শিরায়
পিতৃঋণের মতো বয়ে যায় হিংসা।
তুমি যে আগুন হাতে নিয়ে
অন্যের ঘর পোড়াতে বেরিয়েছ,
একবার ফিরে তাকাও-
তোমার নিজের চোখের মণিতে
কতখানি আগুন জমে আছে!
তুমি বলছ- ‘সে অপরাধ করেছে,
তাই তাকে শাস্তি দেব।’
কিন্তু শাস্তির আগে
একবার নিজের হৃদয়ের দরজায় কড়া নেড়ো-
সেখানে কি আরেকজন অপরাধী
চুপ করে বসে নেই?
ক্রোধ দিয়ে ক্রোধকে পরাভূত করা যায় না।
যেমন একটি অন্ধকারকে
আরেকটি অন্ধকার দিয়ে
আলোকিত করা যায় না।
তুমি যদি ঘৃণাকে ঘৃণা দিয়ে হত্যা করো,
তবে ঘৃণার মৃতদেহ থেকে
আরও দশটি ঘৃণা জন্ম নেবে।
একটি হত্যার প্রতিশোধে আরেকটি হত্যা-
তারপর সেই হত্যার প্রতিশোধে
আরও একটি হত্যা-
এইভাবে একদিন মানুষ ভুলে যাবে
প্রথম হত্যাকারীর নাম,
কিন্তু মনে রাখবে হত্যার উত্তরাধিকার।
তখন আর কেউ জানবে না
কে প্রথম ছুরি তুলেছিল,
কে প্রথম পাথর ছুড়েছিল,
কে প্রথম আগুন জ্বেলেছিল-
শুধু জানবে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা
একদিন একে অপরকে ঘৃণা করত,
আর সেই ঘৃণার বংশপরম্পরায়
আমরাও আজ একে অপরকে হত্যা করছি।
তোমরা কি কখনো ভেবেছ-
অপরাধী জন্মায় কোথায়?
শুধু কারাগারে নয়,
শুধু অন্ধকার গলিতে নয়,
শুধু কোনো অস্ত্রের ছায়ায় নয়।
কখনো সে জন্মায় অপমানের ভিতরে,
কখনো অবহেলার ভিতরে,
কখনো প্রতিহিংসার বিষ খেয়ে,
কখনো শৈশবের কোনো
অমীমাংসিত কান্নার ভিতরে।
কখনো একটি শিশু
তার বাবার চোখে দেখে ক্রোধের শিক্ষা,
মায়ের মুখে শোনে ভয়ের ভাষা,
সমাজের কাছ থেকে শেখে-
‘শক্তি মানেই প্রতিশোধ।’
তারপর একদিন সে বড় হয়।
তার হাতে অস্ত্র ওঠে।
আর আমরা বিস্মিত হয়ে বলি-
‘এই মানুষটি এমন হলো কী করে?’
কেউ জিজ্ঞেস করি না-
তার ভিতরে যে দানবটি জন্মেছিল,
তার ধাত্রী কে ছিল?
একজন অপরাধীকে
তার অপরাধ থেকে উদ্ধার করতে চাইলে
শুধু শাস্তি নিয়ে যেও না।
নিয়ে যেও একটি আয়না।
বলবে- ‘দেখো, তুমি কী হয়ে উঠেছ।’
তারপর নিয়ে যেও একটু নীরবতা।
যাতে সে প্রথমবার
নিজের ভিতরের শব্দ শুনতে পায়।
তারপর নিয়ে যেও বিবেক।
যাতে সে বুঝতে পারে-
অন্যের রক্ত তার নিজের হাতেও
দাগ রেখে যায়।
আর যদি পারো, নিয়ে যেও ভালোবাসা।
কারণ ভালোবাসা
অপরাধকে ক্ষমা করে দেওয়ার নাম নয়;
ভালোবাসা হলো অপরাধীর ভিতরে
এখনও যে মানুষটি বেঁচে আছে,
তাকে খুঁজে বের করা।
ন্যায় মানে অন্যায়কে ছেড়ে দেওয়া নয়।
ন্যায় মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
নিজেকেও অন্যায়ের
ভাষায় কথা বলতে না দেওয়া।
মনে রেখো- একটি খুনের বিচার করতে
আরেকটি খুন বিচার হয়ে যায় না।
একটি ধর্ষণের বিরুদ্ধে
আরেকটি মানুষের জীবন ধ্বংস করা
ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না।
একটি অত্যাচারের প্রতিশোধে
আরেকটি অত্যাচার অত্যাচারীর পরাজয় নয়-
অত্যাচারেরই বিজয়।
কারণ তখন তোমার হাতে থাকে তার অস্ত্র,
তোমার মুখে থাকে তার ভাষা,
তোমার চোখে থাকে তারই ঘৃণা।
তুমি শুধু তার জায়গাটি দখল করেছ-
মানুষটিকে নয়।
প্রকৃতিরও একটি নীরব আদালত আছে।
সেখানে কোনো সাক্ষীকে কেনা যায় না,
কোনো দলিল পোড়ানো যায় না,
কোনো ক্ষমতার ছায়ায় রায় বদলানো যায় না।
তুমি যে বীজ বপন করো কোনো এক ঋতুতে
তারই বৃক্ষ তোমার সামনে দাঁড়ায়।
আজ তুমি যদি রক্ত বপন করো,
আগামীকাল শান্তির ফুলের বাগান
কোথা থেকে পাবে?
আজ তুমি যদি শিশুর হাতে
ঘৃণার বর্ণমালা তুলে দাও,
আগামীকাল সে তোমারই নাম লিখবে
একটি পাথরের ওপর।
তখন তুমি বলবে- ‘আমি তো তাকে
এ শিক্ষা দিইনি।’
প্রকৃতি মৃদু হেসে বলবে-
‘তুমি দিয়েছিলে। শুধু শব্দে নয়-
তোমার আচরণে।’
তাই, ক্রোধের সামনে ক্রোধ হয়ে দাঁড়িও না।
একটু মানুষ হয়ে দাঁড়াও।
যে তোমাকে আঘাত করেছে
তার আঘাতকে সমর্থন করো না,
কিন্তু তার ভিতরের অন্ধকারকে
আরও অন্ধকার দিয়ে পূর্ণ করো না।
যে তোমাকে ঘৃণা করেছে
তাকে ভালোবাসতেই হবে-
এমন কোনো আইন নেই।
কিন্তু তার ঘৃণাকে
নিজের হৃদয়ের ধর্ম বানিয়ে নিও না।
যে তোমার বিরুদ্ধে অন্যায় করেছে,
তার বিরুদ্ধে দাঁড়াও- দৃঢ়ভাবে।
কিন্তু এমনভাবে দাঁড়াও
যাতে তোমার ছায়াটিও অন্যায়ের দিকে না যায়।
কারণ মানুষকে হত্যা করা সহজ,
মানুষের ভিতরের হত্যাকে হত্যা করা কঠিন।
শত্রুকে পরাজিত করা সহজ,
নিজের ভিতরের শত্রুকে পরাজিত করা কঠিন।
একজন অপরাধীকে কারাগারে পাঠানো সহজ,
তার অপরাধের শিকড়
নিজের সমাজের মাটিতে খুঁজে বের করা কঠিন।
আর সবচেয়ে কঠিন- নিজে আহত হয়েও
অন্যকে আহত না করা।
নিজে অপমানিত হয়েও
অন্যকে অপমান না করা।
নিজে ঘৃণিত হয়েও
ঘৃণাকে নিজের ধর্ম না বানানো।
নিজে অন্ধকারে থেকেও
অন্যের হাতে একটি প্রদীপ তুলে দেওয়া।
হয়তো এটাই মানুষ হওয়ার শেষ পরীক্ষা।
তোমার হাতে যখন ক্ষমতা থাকবে,
তখন তুমি কী করবে?
তোমার হাতে যখন
প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকবে,
তখন তুমি কী করবে?
তোমার সামনে যখন অপরাধীর মুখ,
তখন তুমি কি শুধু অপরাধটিই দেখবে-
নাকি দেখবে অপরাধের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি ভাঙা মানুষকে?
ন্যায়ের নামে তুমি কি প্রতিশোধ নেবে?
নাকি ন্যায়কে প্রতিশোধের হাত থেকে
রক্ষা করবে?
এই প্রশ্নের উত্তরেই তোমার সভ্যতা।
এই প্রশ্নের উত্তরেই তোমার মানবতা।
এই প্রশ্নের উত্তরেই তোমার ভবিষ্যৎ।
কারণ, ক্রোধ ক্রোধকে জন্ম দেয়,
রক্ত রক্তকে ডাকে,
ঘৃণা ঘৃণাকে উত্তরাধিকার দেয়।
কিন্তু- একটি বিবেক
আরেকটি বিবেক জাগাতে পারে।
একটি ক্ষমা আরেকটি হৃদয়ের
দরজা খুলতে পারে।
একটি সত্য হাজারটি মিথ্যার
বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে।
আর একটি ভালোবাসা-
একটি সম্পূর্ণ বংশের ঘৃণার ইতিহাস
থামিয়ে দিতে পারে।
তাই আজ যে ছুরিটি তুমি তুলেছ,
একবার থামো।
যে পাথরটি হাতে নিয়েছ,
একবার নামিয়ে রাখো।
যে আগুনটি জ্বালাতে যাচ্ছ,
তার আগে নিজের চোখের ভিতর তাকাও।
দেখো, সেখানে কি তোমার শত্রু দাঁড়িয়ে আছে?
নাকি তোমারই আরেকটি মুখ?
মনে রেখো- অপরাধের উত্তর
আরেকটি অপরাধ নয়।
অন্যায়ের উত্তর আরেকটি অন্যায় নয়।
ক্রোধের উত্তর আরও ক্রোধ নয়।
কারণ আগুন দিয়ে আগুন নেভালে
শুধু ঘর বদলায়- আগুন বদলায় না।
তুমি যদি সত্যিই এই পৃথিবীটাকে বদলাতে চাও,
তবে প্রথমে বদলাও প্রতিশোধের ভাষা।
বিবেককে ডাকো।
ভালোবাসাকে ডাকো। ন্যায়কে ডাকো।
তারপর দাঁড়াও অপরাধের বিরুদ্ধে-
কিন্তু অপরাধীর মতো হয়ে নয়।
কারণ, একদিন ইতিহাস
তোমার হাতে ধরা অস্ত্রটি মাপবে না-
মাপবে তুমি অস্ত্রটি
কখন নামিয়ে রাখতে পেরেছিলে।
আর প্রকৃতির সেই নীরব আদালতে
শেষ প্রশ্নটি হবে না-
‘তুমি কতজনকে পরাজিত করেছিলে?’
শেষ প্রশ্নটি হবে-
‘তোমার হাতে ক্ষমতা ছিল,
তবু তুমি কতখানি মানুষ হয়ে থাকতে পেরেছিলে?’
প্রদ্যোত