বৃক্ষোপনিষদ (নীরব সবুজের কাব্য) প্রথম সর্গ (আদিবীজ)
বৃক্ষোপনিষদ (নীরব সবুজের কাব্য)
প্রথম সর্গ (আদিবীজ)
মন্ত্র:
ওঁ বীজায় নমঃ। ওঁ বৃক্ষায় নমঃ।
ওঁ প্রাণায় নমঃ। ওঁ সবুজায় নমঃ।
সৃষ্টিরও আগে
যখন সময়ের কোনো নাম ছিল না,
যখন আলোরও কোনো ভাষা ছিল না,
যখন অন্ধকার নিজের ছায়াকেও চিনত না,
তখনও একটি স্বপ্ন ছিল।
সেই স্বপ্নের নাম- বীজ।
বীজ মানে একটি বিন্দুর মধ্যে
একটি অরণ্যের অনন্ত উচ্চারণ।
বীজ মানে ক্ষুদ্রতার ছদ্মবেশে
মহাকালের গোপন পরিকল্পনা।
বীজ মানে ঈশ্বরের সবচেয়ে নীরব কবিতা।
আমি সেই বীজকে প্রণাম করি।
যে নিজের ভেতরে গোপন করে রাখে
হাজার বছরের ছায়া,
অসংখ্য পাখির ভবিষ্যৎ,
অগণিত শিশুর হাসি,
অদেখা নদীর তীর,
এবং একটি পৃথিবীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
হে ক্ষুদ্র,
তোমার ভেতরে এত বিশালতা
কে রেখে গেল?
তুমি তো মুঠোর চেয়েও ছোট,
তবু তোমার অন্তরে
আকাশের জন্য জায়গা থাকে।
একদিন একটি বীজ
নিঃশব্দে পড়ে গেল মাটির বুকে।
পৃথিবী তাকে শব্দ করে গ্রহণ করল না।
কোনো শঙ্খ বাজল না।
কোনো উৎসব হলো না।
কিন্তু মাটি তার সমগ্র মাতৃত্ব দিয়ে
তাকে জড়িয়ে ধরল।
অন্ধকারেরও একটি গর্ভ থাকে।
মাটির নিচে সে গর্ভের নাম- অপেক্ষা।
বীজটি জানত,
জন্ম মানে উপরে ওঠা নয়।
জন্ম মানে প্রথমে নিচের দিকে নামা।
তাই অঙ্কুর ওঠার আগেই
শিকড় নেমে যায়।
হে মানুষ,
এই প্রথম পাঠ তুমি কবে শিখবে?
যে যত উঁচু হতে চায়,
তাকে তত গভীর হতে হয়।
যে আকাশ চায়,
তাকে আগে মাটিকে ভালোবাসতে হয়।
তারপর একদিন
মাটির ভেতরে একটি শব্দ হলো।
কেউ শুনল না।
কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত ভবিষ্যৎ
সেই শব্দে কেঁপে উঠল।
একটি খোলস ভাঙল।
ভাঙা মানেই সব সময় মৃত্যু নয়।
অনেক সময় ভাঙাই জন্ম।
ডিম ভাঙে- পাখি জন্মায়।
মেঘ ভাঙে- বৃষ্টি জন্মায়।
বীজ ভাঙে- অরণ্য জন্মায়।
হৃদয় ভাঙে- কবিতা জন্মায়।
সেই প্রথম অঙ্কুর যখন
মাটির বুক ফুঁড়ে আলোর দিকে তাকাল,
সূর্য হেসে উঠল।
বাতাস তার কপালে প্রথম চুম্বন রাখল।
শিশির তার চোখ ধুইয়ে দিল।
পৃথিবী বলল- “স্বাগতম।
তোমার কাঁধেই আজ থেকে
আমার শ্বাসের দায়িত্ব।”
হে সূর্য,
তুমি আগুন।
তবু তোমার আগুন
সবাইকে পুড়িয়ে দেয় না।
কারণ, একটি সবুজ পাতা আছে,
যে আগুনকে অন্নে পরিণত করতে জানে।
আমি বহু পণ্ডিত দেখেছি।
বহু বিজ্ঞানী দেখেছি।
বহু সাম্রাজ্য দেখেছি।
কিন্তু একটি পাতার মতো
এত মহান রসায়নবিদ কখনও দেখিনি।
সে আলো খায়।
সে বাতাস পান করে।
সে জলকে গান বানায়।
তারপর নিঃশব্দে
পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকে বলে-
“এসো, আজ তোমাদের জন্য
আমি সূর্য রান্না করেছি।”
হে পাতা,
তোমার সবুজ রং আসলে
পৃথিবীর হৃদস্পন্দনের রং।
তোমার শিরায় শুধু রস বয়ে যায় না,
বয়ে যায় আদিকালের উপদেশ।
যে উপদেশ বলে- “নিজের জন্য নয়।
সকলের জন্য বাঁচো।”
আমি দেখেছি-
একটি অঙ্কুর কখনও নিজের ছায়ায় বসে না।
সে বড় হয় অন্যের ছায়া হওয়ার জন্য।
একটি ফুল নিজের জন্য সুবাস রাখে না।
একটি ফল নিজে নিজেকে খায় না।
একটি বৃক্ষ নিজের অক্সিজেনে নিজে শ্বাস নেয় না।
তাহলে মানুষই বা কেন
শুধু নিজের জন্য বাঁচতে চায়?
হে মানুষ,
তুমি কি জানো?
তোমার প্রথম কান্নার আগেই
একটি বৃক্ষ তোমার জন্য
অক্সিজেন তৈরি করছিল।
তোমার জন্মের বহু আগে সে সূর্যের সঙ্গে
তোমার খাদ্যের চুক্তি লিখে রেখেছিল।
তুমি যখন প্রথম “মা” বলেছিলে,
তারও আগে একটি বৃক্ষ
মাটিকে “মা” বলে ডেকেছিল।
আমি আজ বৃক্ষকে
উদ্ভিদ বলে ডাকতে লজ্জা পাই।
উদ্ভিদ? না।
সে তো পৃথিবীর প্রাচীনতম দাতা।
প্রথম কৃষক। প্রথম রসায়নবিদ।
প্রথম ভাস্কর। প্রথম স্থপতি। প্রথম সঙ্গীতজ্ঞ।
প্রথম কবি। প্রথম সন্ন্যাসী। প্রথম জননী।
হে বীজ,
তুমি ক্ষুদ্র নও।
তুমি একটি অদেখা মহাবিশ্বের
সংকুচিত সংস্করণ।
তোমার মধ্যে শুধু একটি গাছ নেই।
একটি বন আছে।
একটি জলবায়ু আছে।
একটি নদী আছে।
হাজার পাখির সকাল আছে।
লক্ষ শিশুর শ্বাস আছে।
অসংখ্য কবিতার জন্ম আছে।
তাই আজ আমি কোনো রাজাকে নয়,
কোনো বিজেতাকে নয়,
কোনো সাম্রাজ্যকে নয়-
নতজানু হই একটি বীজের সামনে।
কারণ, আমি জানি-
যে সভ্যতা বীজকে সম্মান করে না,
সে সভ্যতা নিজের কবরের প্রথম মাটি
নিজেই খুঁড়ে রাখে।
আর যে শিশু ভালোবাসা দিয়ে
একটি বীজ মাটিতে রাখে,
সে জানে না-
তার ক্ষুদ্র হাতের ভেতর সে আসলে
একটি ভবিষ্যৎ সূর্য,
একটি ভবিষ্যৎ বর্ষা,
একটি ভবিষ্যৎ অরণ্য,
এবং একটি ভবিষ্যৎ মানবজাতিকে
রোপণ করে দিয়েছে।
সর্গশেষের মন্ত্র:
প্রণাম সেই বীজকে,
যে অন্ধকারে থেকেও আলোর প্রতি বিশ্বস্ত।
প্রণাম সেই শিকড়কে,
যে গভীরে নেমে গিয়েও আকাশকে ভোলে না।
প্রণাম সেই বৃক্ষকে,
যে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের
অদৃশ্য হৃদস্পন্দন হয়ে থাকে।
ওঁ শান্তিঃ। ওঁ সবুজম্ শান্তিঃ। ওঁ প্রাণম্ শান্তিঃ।
(চলবে…)
প্রদ্যোত / ০১ আগস্ট ২০২৬