← Back to poetry
❧

নিজের পথের পথিক

Poetry

নিজের পথের পথিক

তোমার প্রিয় যে পথ- সেই পথের ধুলোয় যদি তোমার পদচিহ্নের মতো কোনো পদচিহ্ন এসে মিশে যায়, তাকে সঙ্গী করো। যে পথিক তোমার আকাশের দিকে তাকিয়ে একই নক্ষত্রের ভাষা পড়ে, যে অন্ধকারের বুকেও আলোর জন্মের শব্দ শুনতে পায়, যে তোমার নীরবতার ভিতরেও একটি অদৃশ্য বাঁশির সুর চিনে ফেলে- তার হাত ধরো। কিন্তু যে তোমাকে তোমার পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায় তার পথের ধুলো কপালে মেখো না।

সব পথের গন্তব্য এক নয়, সব নদী সাগরে মেশে না একই মোহনার ভিতর দিয়ে, সব নক্ষত্রের আলো একই জানালায় এসে পড়ে না। কেউ পাহাড়ের সন্তান- তার পায়ে পথের বদলে পাথরের ভাষা; কেউ নদীর সন্তান- তার শিরায় শিরায় ভাসে স্রোতের উন্মাদনা; কেউ মরুভূমির যাত্রী- তার চোখে মরীচিকারও একটি নিজস্ব আকাশ। তুমি কেন তাকে তোমার মতো নদী বানাতে চাও? নদীকে নদী হতে দাও, পাহাড়কে পাহাড়, বৃক্ষকে বৃক্ষ, পাখিকে তার নিজস্ব আকাশ।

একটি বৃক্ষকে অন্য বৃক্ষের ছায়ায় দাঁড় করিয়ে তার নিজস্ব বন তৈরি করা যায় না। তোমার যে পথ, তোমার চিন্তার যে নদী, তোমার বিবেকের যে দীপশিখা, তোমার চেতনার যে গোপন সূর্যোদয়- যে তার উত্তাপ বোঝে না, তাকে কেন তোমার রক্তের উষ্ণতায় সূর্য বানাতে চাও?

যে তোমার সঙ্গে হাঁটতে চায়, তার জন্য দরজা খোলা রাখো। যে বিপরীত দিকে যেতে চায়, তার জন্যও পথ খোলা রাখো। কারণ পথেরও স্বাধীনতা আছে।

তুমি পথিক- তুমি কারো শিকল নও, কেউও তোমার শিকল নয়। তুমি আলো জ্বালো। শুধু আলো জ্বালো। দেখবে- দূর কোনো অন্ধকার উপত্যকা থেকে একদিন একজন পথিক বেরিয়ে আসছে। তার হাতে হয়তো কোনো প্রদীপ নেই, কিন্তু তোমার আলোর দিকে তার মুখ ফিরেছে। তাকে তখন সঙ্গী করো।

আলো কাউকে টেনে আনে না- আলো শুধু নিজেকে প্রকাশ করে। যে চোখের ভিতর সূর্যের জন্য একটুখানি জানালা খোলা থাকে, সে নিজেই সূর্যের কাছে আসে। আর যে চোখ নিজের অন্ধকারকে ঈশ্বর ভেবে বসে থাকে, তার সামনে সূর্য দাঁড়ালেও সে বলে- “এ তো আগুন!”

কিছু মানুষের মস্তিষ্কে অদৃশ্য ভাইরাসের মতো বাসা বাঁধে ক্রোধের কীট, হিংসার ছত্রাক, বিদ্বেষের কালো শ্যাওলা, অভিমানের বিষাক্ত লতা। তারা চিন্তার জানালায় লোহার শিক বসিয়ে দেয়, বিবেকের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেয়, যুক্তির আকাশে ধোঁয়ার পর্দা টাঙিয়ে দেয়। তারপর নিজেরাই চিৎকার করে- “পৃথিবী অন্ধকার!”

অথচ অন্ধকারটি পৃথিবীতে নয়, অন্ধকারটি তাদের চোখের ভিতর। তারা একটি কূপ খুঁড়ে নিজেরাই তার ভিতর নামে, তারপর কূপের অন্ধকারকে মহাবিশ্বের শেষ সত্য বলে ঘোষণা করে। তাদের ক্রোধ তাদেরই বুকের ভিতর ধীরে ধীরে আগ্নেয়গিরি হয়। তাদের হিংসা নিজেদেরই রক্তে বিষধর সাপ হয়ে সাঁতার কাটে। তাদের ভুল বোঝাবুঝি একটি ক্ষুদ্র বীজ থেকে বিষবৃক্ষে পরিণত হয়। তাদের কূপমণ্ডুকতা- একটি ছোট্ট কূপের জলকে সমুদ্র ভেবে বসে থাকা। তারা জানে না- আকাশের মাপ কূপের মুখ দিয়ে নেওয়া যায় না। তাই তাদের টেনে তুলতে যেও না যদি তারা উঠতে না চায়। তাদের কাঁধে আলো চাপিয়ে দিও না, যদি তারা নিজের হাতে অন্ধকার আঁকড়ে ধরে থাকে।

তুমি শুধু তোমার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রেখো। কারণ প্রদীপের কাজ অন্ধকারকে গালাগাল করা নয়- প্রদীপের কাজ নিজে জ্বলা। সূর্য কি কখনো রাতকে বোঝাতে বসে- “তুমি অন্ধকার কেন?” না। সে শুধু ওঠে। আর তার ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের সমস্ত যুক্তি নিজেরাই ভেঙে পড়ে।

সে তোমার পিতা হতে পারে, তোমার মাতা, তোমার সন্তান, তোমার ভ্রাতা, তোমার ভগিনী, তোমার সবচেয়ে আপনজন- তবু মনে রেখো, রক্তের সম্পর্ক আত্মার পথনির্দেশ নয়। একই বৃক্ষের দুটি ডাল দুই দিকে বেড়ে উঠতে পারে। একই ঘরের দুটি জানালা দুটি ভিন্ন আকাশ দেখতে পারে। একই মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া দুটি মানুষও দুটি ভিন্ন মহাবিশ্বের নাগরিক হতে পারে। তাই ভালোবাসো- কিন্তু নিজের বিবেক বন্ধক রেখে নয়। স্নেহ দাও- কিন্তু নিজের সত্য বিক্রি করে নয়। হাত বাড়াও- কিন্তু নিজের পথ হারিয়ে নয়। যে নিজেই ডুবে যাচ্ছে,
সে অন্যকে সাঁতার শেখাতে পারে না।

তোমার পথ তোমার। এই বাক্যটি একদিন নিজের হৃদয়ের দরজায় লিখে রেখো। কারণ পৃথিবী তোমাকে বারবার অন্যের পথের মানচিত্র দেবে। কেউ বলবে- “এদিকে এসো।” কেউ বলবে- “ওদিকে যেও না।” কেউ তোমার চোখে নিজের চশমা পরিয়ে দেবে। কেউ তোমার কানে নিজের ভয় ঢেলে দেবে। কেউ তোমার বিবেকের আয়নায় নিজের মুখ আঁকতে চাইবে। তুমি তখন নির্মোহ আকাশের মতো দাঁড়িয়ে থেকো।

নিজেকে জিজ্ঞেস করো- “এই পথ কি আমার?” যদি উত্তর আসে- হ্যাঁ, তবে হাঁটো। ঝড় এলে হাঁটো। বৃষ্টি এলে হাঁটো। কাঁটা এলে হাঁটো। পৃথিবী হাসলে হাঁটো। পৃথিবী পাথর ছুড়লেও হাঁটো। কারণ সত্যের পথ কখনো ফুলের বিছানা হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কখনো কখনো সত্যের পথ মানে পায়ের নিচে রক্ত, চোখের ভিতর জল, কাঁধে একাকিত্ব, তবু বুকের মধ্যে একটি অমর সূর্য।

তুমি কাউকে তোমার মতো করো না। একটি পাখিকে বলো না- “তুমি আমার মতো উড়ো।” একটি নদীকে বলো না- “তুমি আমার মতো বয়ে চলো।” একটি বাতাসকে বলো না- “তুমি আমার মতো শ্বাস নাও।” বরং বলো- “তুমি তুমি হও।”

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুলটি গোলাপ হতে চায় না সবসময়। কোনো কোনো ফুল নামহীন হয়েও ভোরের সমস্ত সৌন্দর্য বহন করে। কোনো কোনো পথিক তোমার সঙ্গে হাঁটবে না, তবু তার নিজস্ব পথে একদিন সে-ও হয়তো একটি প্রদীপ জ্বালাবে। তখন দূর থেকে তার আলোকে প্রণাম করো।

মনে রেখো- সঙ্গী মানে যে তোমার ছায়া, তা নয়; সঙ্গী মানে যে তোমার আলোর দিকে হাঁটে। সারথী মানে যে তোমার রথ টানে, তা নয়; সারথী মানে যে জানে কোন দিকে সূর্য ওঠে। বন্ধু মানে যে তোমার সঙ্গে সব বিষয়ে একমত, তা নয়; বন্ধু মানে যে তোমার পতনের সময় তোমাকে সত্য কথা বলতে পারে।আর ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের প্রতিচ্ছবি বানানো নয়- ভালোবাসা মানে তার নিজস্ব মুখটি আলোয় দেখতে দেওয়া।

তাই, হে পথিক, তুমি তোমার পথেই হাঁটো। পেছনে তাকিও, কিন্তু ফিরে যেও না শুধু কেউ তোমাকে ডাকছে বলে। কারণ সব ডাক ফিরে যাওয়ার ডাক নয়। কোনো কোনো ডাক অতীতের। কোনো কোনো ডাক ভয়ের। কোনো কোনো ডাক অভ্যাসের। আর কোনো কোনো ডাক তোমাকে নিয়ে যেতে চায় সেই পুরোনো অন্ধকূপে যেখান থেকে তুমি বহু কষ্টে আকাশের দেখা পেয়েছিলে।

তাই শুনবে- কিন্তু বিচার করবে। ভালোবাসবে- কিন্তু নিজেকে হারাবে না। ক্ষমা করবে- কিন্তু একই বিষ বারবার পান করবে না। হাত বাড়াবে- কিন্তু নিজের হাত কাউকে শিকল বানাতে দেবে না।

একদিন যখন তোমার পথের শেষে অথবা পথেরই কোনো বাঁকে তুমি ফিরে তাকাবে, দেখবে- যারা সত্যিই তোমার ছিল তারা তোমার পাশে হাঁটেনি শুধু, তারা তোমার সঙ্গে আলোর দিকে হেঁটেছে। আর যারা তোমাকে বারবার অন্ধকারের দিকে টেনেছিল, তারা হয়তো অনেক দূরে। তাদের জন্য কোনো অভিশাপ রেখো না। অন্ধকারকে অভিশাপ দিলে অন্ধকার আলো হয় না। শুধু তোমার প্রদীপটি আরও উঁচু করে ধরো।

কারণ শেষ পর্যন্ত কেউ কারো হয়ে জন্মায় না। কেউ কারো পথ হয়ে জন্মায় না। কেউ কারো বিবেকের স্থায়ী অভিভাবক নয়। প্রত্যেক মানুষ নিজের ভিতরে একটি মহাদেশ নিয়ে জন্মায়, নিজের বুকের ভিতর একটি অনাবিষ্কৃত সমুদ্র, নিজের মস্তিষ্কে একটি অসমাপ্ত নক্ষত্রপুঞ্জ, নিজের আত্মায় একটি অদেখা ভোর। কেউ তাকে পথ দেখাতে পারে- কিন্তু তার হয়ে হাঁটতে পারে না। কেউ প্রদীপ ধরিয়ে দিতে পারে- কিন্তু তার চোখ খুলে দিতে পারে না। কেউ দরজা খুলে দিতে পারে- কিন্তু তাকে বেরিয়ে আসতে হবে নিজেকেই।

হে পথিক, তোমার পথে তুমি হাঁটো। যে আসতে চায়- তার জন্য তোমার পাশে একটি আসন রেখো। যে আসতে চায় না- তার জন্য পথের দুয়ার বন্ধ কোরো না। সে তার আকাশে যাক, তুমি তোমার আকাশে। সে তার নদী বয়ে নিক, তুমি তোমার স্রোত বহাও। সে তার অন্ধকারে থাকুক- তুমি আলো জ্বালো। তোমার কাজ সব অন্ধকারকে আলো করা নয়। তোমার কাজ- নিজে অন্ধকার না হওয়া। তোমার কাজ- সব পথিককে তোমার পথে আনা নয়। তোমার কাজ- তোমার পথকে সত্য রাখা। তোমার কাজ সব মানুষকে তোমার মতো করা নয়। তোমার কাজ- নিজেকে প্রতিদিন আরও সত্য, আরও স্বচ্ছ, আরও মানবিক করে তোলা।

আর যদি কোনোদিন দূর অন্ধকারের বুক চিরে কেউ তোমার আলোর দিকে এগিয়ে আসে, তার চোখে যদি তুমি দেখো একটি নতুন সূর্যোদয়ের আভা, তখন তার হাত ধরো। কোনো প্রশ্ন কোরো না- “তুমি আমার মতো হলে কি?” শুধু বলো- “এসো, পথ দীর্ঘ। আলো সামনে। চলো- যতদূর সত্য যায়, ততদূর।”

পথের শেষ নেই। আলোরও শেষ নেই। সত্যেরও শেষ নেই। আদি থেকে অনন্তের দিকে একটি অদৃশ্য সেতু বিস্তৃত- আর তুমি, হে পথিক, সেই সেতুর উপর নিজের পদচিহ্ন রেখে হেঁটে যাও।

তোমার পথ তোমারই থাক। তোমার আলো তোমারই থাক। যে আলোর পথিক- সে নিজেই তোমাকে খুঁজে নেবে। আর যে খুঁজবে না- তাকে তার অন্ধকারসহ তার নিজের আকাশের নিচে শান্তিতে রেখে দাও।

তুমি শুধু হাঁটো। সামনে। আলোর দিকে। সত্যের দিকে। আদি থেকে অনন্তের দিকে।

প্রদ্যোত

✦