← Back to poetry
❧

এসো মানুষ, মানুষ হই!

Poetry

এসো মানুষ, মানুষ হই!

এই একবিংশ শতাব্দীতে,
যখন মানুষের চোখ
দূর নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকে,
যখন মহাকাশযান গ্রহের পর গ্রহ ছুঁয়ে যায়,
যখন দূরবর্তী গ্যালাক্সির অন্ধকারে
মানুষ প্রাণের সম্ভাবনা খোঁজে,
তখনও পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে
আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি-
মানুষ কি সত্যিই নিজেকে চিনেছে?

যে মানুষ কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তোলে,
যে মানুষ আলোর গতির রহস্য অনুসন্ধান করে,
যে মানুষ পরমাণুর ভেতরে
লুকিয়ে থাকা শক্তিকে উন্মোচন করে,
সেই মানুষই আবার কেন ঘৃণার ক্ষুদ্র খাঁচায়
নিজেকে বন্দী করে রাখে?

কেন এখনও পৃথিবীর আকাশে
যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যায়?
কেন এখনও শিশুদের মুখে ক্ষুধার ছায়া থাকে?
কেন এখনও ধর্মের নামে, জাতির নামে, বর্ণের নামে, ভাষার নামে মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়?
কেন এখনও একটি বিশ্বাস
আরেকটি বিশ্বাসকে ভয় পায়?
কেন এখনও একটি পতাকা
আরেকটি পতাকাকে শত্রু ভাবে?
কেন এখনও মানুষ বুঝতে পারে না
যে মহাকাশ থেকে দেখলে পৃথিবীর কোথাও
কোনো সীমাbe না দেখা যায় না?

মহাকাশচারীরা যখন পৃথিবীর দিকে তাকান,
তারা কোনো দেশ দেখেন না।
তারা দেখেন একটি নীল গোলক,
মেঘে ঢাকা এক বিস্ময়কর আশ্রয়।
সেখানে কোনো ধর্মের রেখা নেই,
কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই,
কোনো জাতিগত বিভাজন নেই।
শুধু আছে একটি গ্রহ।
একটি বাসস্থান।
একটি ভবিষ্যৎ।
একটি ভাগ্য।

তবু এই গ্রহের মানুষই কখনও
বন কেটে ফেলে,
নদীকে বিষাক্ত করে,
সাগরকে আবর্জনায় ভরে তোলে,
আকাশকে ধোঁয়ায় ঢেকে দেয়।
যেন পৃথিবী কোনো উত্তরাধিকার নয়,
কোনো প্রিয় মাতৃভূমি নয়-
বরং লুণ্ঠনের জন্য রেখে যাওয়া এক ভাণ্ডার।

আমি বুঝি না।

একটি মানুষ,
যে কয়েক দশকের বেশি বাঁচবে না,
সে কেন হাজার বছরের ক্ষতি করে যেতে চায়?
একটি প্রাণ, যে নিজেই ক্ষণস্থায়ী,
সে কেন চিরস্থায়ী প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে?
একটি হৃদয়, যে ভালোবাসার জন্য সৃষ্টি,
সে কেন ঘৃণার অস্ত্র ধারণ করে?

হয়তো মানুষের জ্ঞানের চেয়ে
তার ভয় অনেক পুরোনো।
হয়তো বিজ্ঞানের চেয়ে
কুসংস্কারের শিকড় অনেক গভীরে।
হয়তো আলো আবিষ্কার করা সহজ,
কিন্তু নিজের অন্ধকারকে পরাজিত করা কঠিন।

তবু আমি আশা হারাতে চাই না।

কারণ আমি দেখেছি- মানুষের মধ্যেই
সবচেয়ে বড় ধ্বংসের শক্তি যেমন আছে,
তেমনি সবচেয়ে বড় সৃষ্টির শক্তিও আছে।
আমি দেখেছি একজন বিজ্ঞানী
তার জীবন উৎসর্গ করছেন
মানবজাতির কল্যাণে।
আমি দেখেছি একজন শিক্ষক
একটি শিশুর হাতে বই তুলে দিচ্ছেন।
আমি দেখেছি একজন চিকিৎসক
অচেনা মানুষের প্রাণ বাঁচাতে রাত জেগে আছেন।
আমি দেখেছি কেউ একটি গাছ লাগাচ্ছেন
এমন মানুষের জন্য,
যাদের সঙ্গে তার কখনও দেখা হবে না।
আমি দেখেছি বিপর্যয়ের দিনে মানুষ ধর্ম ভুলে মানুষকে বাঁচিয়েছে।
আমি দেখেছি ভাষা, বর্ণ, জাতি, দেশের পার্থক্য পেরিয়ে মানুষের হাত মানুষের হাত ধরেছে।
সেই দৃশ্যগুলো আমাকে বিশ্বাস করতে শেখায়- পৃথিবী এখনও সুন্দর।

এখনও আশা শেষ হয়ে যায়নি।

আমি এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি,
যেখানে শিশুকে প্রথমে মানুষ হতে শেখানো হবে, পরে অন্য সব পরিচয়।
আমি এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি,
যেখানে মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা
সব কিছুর আগে থাকবে মানবতা।
আমি এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি,
যেখানে নদীকে সম্পদ নয়,
জীবন্ত সঙ্গী হিসেবে দেখা হবে।
যেখানে বন হবে সভ্যতার শ্বাসপ্রশ্বাস।
যেখানে প্রাণীরা মানুষের করুণার অংশ হবে, নিষ্ঠুরতার নয়।
যেখানে বিজ্ঞান মানুষের হাতকে শক্তিশালী করবে, আর ভালোবাসা মানুষের হৃদয়কে।
যেখানে কোনো শিশুকে শেখানো হবে না কাকে ঘৃণা করতে হবে; শেখানো হবে কাকে ভালোবাসতে হবে।
যেখানে ইতিহাস হবে শিক্ষা, প্রতিশোধ নয়।
যেখানে ভিন্নতা হবে সৌন্দর্য, বিভেদ নয়।
যেখানে বিশ্বাস হবে ব্যক্তিগত,
কিন্তু মানবতা হবে সর্বজনীন।

আমি এমন একটি পৃথিবী চাই,
যেখানে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে
নতুন গ্রহ খুঁজবে,
কিন্তু নিজের গ্রহকে ভুলে যাবে না।
যেখানে আমরা নক্ষত্রের পথে যাত্রা করব,
কিন্তু পৃথিবীর হাত ছেড়ে নয়।
যেখানে প্রযুক্তি আর সহমর্মিতা পাশাপাশি হাঁটবে।
যেখানে জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হবে প্রজ্ঞা।
যেখানে অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত হবে দায়িত্ব।

এসো, আমরা ঘৃণার দেয়ালের বদলে
ভালোবাসার সেতু নির্মাণ করি।
এসো, আমরা বিভেদের ভাষার বদলে
সহমর্মিতার ভাষা শিখি।
এসো, আমরা পৃথিবীকে শুধু বসবাসের স্থান নয়, একটি যৌথ স্বপ্ন হিসেবে দেখি।
কারণ এই মহাবিশ্বে এখন পর্যন্ত
আমরা যত দূর জানি,
কোটি কোটি নক্ষত্রের ভিড়ে
এই পৃথিবীই আমাদের একমাত্র ঘর।
এই নীল গ্রহের বাতাসই আমাদের প্রথম গান।
এর জলই আমাদের প্রথম আয়না।
এর মাটিই আমাদের শেষ আশ্রয়।

তাই এসো-
মানুষ হই।
আরও একটু মানুষ হই।
আরও একটু ভালোবাসি।
আরও একটু রক্ষা করি।
আরও একটু হাত বাড়াই।

যেন একদিন ভবিষ্যতের কোনো শিশু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে পারে-
“আমাদের পূর্বপুরুষরা শুধু প্রযুক্তি নির্মাণ করেনি, তারা ভালোবাসাও নির্মাণ করেছিল।
তাই পৃথিবী এখনও বেঁচে আছে।
তাই পৃথিবী এখনও সুন্দর।”

আমরা কেউ নক্ষত্র নই,
তবু আলো বহন করতে পারি।
আমরা কেউ অনন্ত নই,
তবু অনন্তের স্বপ্ন দেখতে পারি।
আমরা কেউ সমগ্র পৃথিবী নই,
তবু পৃথিবীকে ভালোবাসতে পারি।
আর ভালোবাসার মধ্যেই
হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় লুকিয়ে আছে।

প্রদ্যোত/ ০২ জুন ২০২৬

✦