← Back to poetry
❧

উন্মেষের আগুন

Poetry

উন্মেষের আগুন

পৃথিবীর অসংখ্য প্রার্থনার ধোঁয়া
উঠে গেছে আকাশের দিকে,
অসংখ্য গম্বুজ, শিখর, মিনার, ঘণ্টাধ্বনি
আর প্রদীপের ভিতর দিয়ে
মানুষ অদৃশ্যের কাছে সমর্পণ করেছে
তার ভয়, তার আকাঙ্ক্ষা, তার অক্ষমতা;
অথচ এই দৃশ্যমান পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মুখ,
অন্ধকার ঘর, অসুস্থ শরীর,
অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা অপেক্ষা করে থেকেছে
মানুষেরই হাতে জ্বলে ওঠা একটি আলোর জন্য।
স্বর্গের দরজা কোথায়, কে খুলবে,
কোন প্রার্থনায় খুলবে, কোন মন্ত্রে খুলবে,
এই প্রশ্নে যুগের পর যুগ উত্তপ্ত হয়েছে মানুষের কণ্ঠ;
কিন্তু যে পৃথিবীতে সে জন্মেছে,
সেই পৃথিবীকে কীভাবে আরও বাসযোগ্য করা যায়,
সেই প্রশ্নের সামনে এসে তার কণ্ঠ
অনেক সময় আশ্চর্য রকম নীরব হয়ে গেছে।

অদৃশ্যের কাছে মানুষের বিশ্বাস থাকুক,
কিন্তু দৃশ্যমানের কাছে তার দায়িত্ব
যেন হারিয়ে না যায়।
প্রার্থনা থাকুক হৃদয়ে, কিন্তু হাত যেন থেমে না থাকে;
আকাশের দিকে চোখ উঠুক,
কিন্তু মাটির ওপর পড়ে থাকা মানুষের দিকে
চোখ নামাতেও যেন লজ্জা না হয়।

ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ
কোনো ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা নয়,
রোগীর শরীর কোনো অলৌকিকতার পরীক্ষা নয়,
অশিক্ষিত শিশুর ভবিষ্যৎ
কোনো পরকালের প্রতিশ্রুতি নয়;
এসব পৃথিবীর বাস্তবতা, আর বাস্তবতার সামনে
মানুষের সবচেয়ে পবিত্র কর্তব্য হলো
জ্ঞান, শ্রম, করুণা ও সৃষ্টির শক্তি নিয়ে দাঁড়ানো।

যে মস্তিষ্ক নক্ষত্রের দূরত্ব মাপতে পারে,
সে মস্তিষ্ক যদি একটি কুসংস্কারের
সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে,
তবে মহাবিশ্ব জয় করেও মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকার জয় করতে পারেনি।
যে চোখ অণুর ভেতরের গোপন ভাষা পড়ে,
সে চোখ যদি মিথ্যার মুখ চিনতে না পারে,
তবে তার জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ।
যে মানুষ মহাকাশযান পাঠায় অজানার দিকে,
কিন্তু নিজের বিশ্বাসের ভেতর
একটি প্রশ্ন পাঠাতে ভয় পায়,
তার অগ্রগতি এখনো বাহিরে, ভিতরে নয়।

প্রশ্নই মানুষের প্রথম সূর্যোদয়।
প্রশ্নের মুহূর্তেই অন্ধকারের ভিতর
একটি ক্ষুদ্র ফাটল তৈরি হয়,
সেই ফাটল দিয়ে প্রবেশ করে সংশয়,
সংশয় থেকে জন্ম নেয় অনুসন্ধান,
অনুসন্ধান ধীরে ধীরে জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়।
যে সমাজ প্রশ্নকে হত্যা করে,
সে আসলে তার ভবিষ্যৎকেই হত্যা করে;
যে শিশু জিজ্ঞেস করে পৃথিবী কেন ঘোরে,
তার মুখ বন্ধ করে দিলে
শুধু একটি শিশুকে থামানো হয় না,
একটি সম্ভাব্য বিজ্ঞানীর জন্ম থামিয়ে দেওয়া হয়।

অন্ধবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় শক্তি
তার উত্তর নয়, তার প্রশ্নহীনতা।
সে বলে, জানার দরকার নেই, বিশ্বাস করো।
বিজ্ঞান বলে, বিশ্বাসেরও আগে অনুসন্ধান করো।
কর্তৃত্ব বলে, আমার কথাই শেষ কথা।
সত্য বলে, আমাকে পরীক্ষা করো।
অন্ধকার বলে, চোখ বন্ধ রাখো।
জ্ঞান বলে, চোখ খোলো,
ভুল দেখতে পেলেও খোলো,
ভুল থেকে ফিরে আসার সাহসই
মানুষের বুদ্ধির প্রকৃত মর্যাদা।

এই কারণেই জ্ঞানের অসমতা
পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব সাম্রাজ্যবাদ।
এক জাতি আবিষ্কার করে, অন্য জাতি কেনে;
এক জাতি গবেষণা করে,
অন্য জাতি ফল ব্যবহার করে;
এক জাতি প্রযুক্তি তৈরি করে,
অন্য জাতি প্রযুক্তির বাজার হয়ে ওঠে।
পতাকা বদলে যায়, সাম্রাজ্য ভেঙে যায়,
উপনিবেশের নাম মুছে যায়,
কিন্তু জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে যায় মানুষের অর্থনীতি, রাজনীতি ও ভবিষ্যতের গভীরে।
যে জাতি নিজের প্রশ্নের উত্তর
নিজে তৈরি করতে পারে না,
তার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত
অন্যের গবেষণাগারে লেখা হয়।

আমরা অন্যের তৈরি যন্ত্র হাতে নিয়ে
আধুনিকতার অহংকার করি,
অন্যের আবিষ্কৃত ওষুধে জীবন বাঁচাই,
অন্যের প্রযুক্তিতে পৃথিবী দেখি,
অন্যের সফটওয়্যারে চিন্তার কাজ চালাই,
অন্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান ধার করি,
তারপর নিজেদের সভ্যতার উন্নতির গল্প বলি।
কিন্তু যে মাটিতে গবেষণাগার তৈরি হওয়ার কথা ছিল,
সেখানে যদি কেবল স্মৃতির স্তম্ভ ওঠে,
যে ঘরে গ্রন্থাগার হওয়ার কথা ছিল,
সেখানে যদি শুধু আনুষ্ঠানিকতার
প্রতিধ্বনি শোনা যায়,
তবে উন্নতির নামটি হয়তো আছে,
উন্নতির আত্মা নেই।

একটি গ্রন্থাগার কোনো নিঃশব্দ ঘর নয়,
সেখানে ভবিষ্যতের সঙ্গে
অতীতের কথোপকথন চলে।
একটি গবেষণাগার কোনো যন্ত্রের সমাবেশ নয়,
সেখানে অজানা সত্যের দরজায়
মানুষের কড়া নাড়া হয়।
একটি বিদ্যালয় কেবল চাকরির প্রস্তুতি নয়,
সেখানে একটি শিশুর ভিতর পৃথিবীকে নতুন করে দেখার চোখ তৈরি হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সনদের কারখানা নয়,
সেখানে প্রতিষ্ঠিত সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন সত্যের জন্ম হতে পারে।

তাই মুক্তির পথ ধ্বংসে নয়, পুনর্গঠনে।
উপাসনালয় ভাঙতে হবে না,
মানুষের চিন্তার দেয়াল ভাঙতে হবে।
বিশ্বাস কেড়ে নিতে হবে না,
বিশ্বাসের পাশে যুক্তির জানালা খুলে দিতে হবে।
প্রার্থনা বন্ধ করতে হবে না,
প্রার্থনার পাশে কর্মের আগুন জ্বালাতে হবে।
ধর্ম মুছে ফেলতে হবে না,
ধর্মের চেয়েও বড় করে তুলতে হবে মানুষের মর্যাদা,
যে কোনো বিশ্বাসের শেষ বিচার হওয়া উচিত
সে বিশ্বাস মানুষকে কতখানি মানুষ করে তুলেছে।

শিশুকে উত্তর শেখানোর আগে প্রশ্ন শেখাও।
তাকে বলো না, পৃথিবী এমনই
সবাই তাই বলেছে বলে;
তাকে বলো, পৃথিবীকে দেখে নাও,
পরীক্ষা করো, ভুল হলে আবার শুরু করো।
তাকে নম্বরের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি
ব্যর্থতার মধ্যেও সত্য খুঁজে নেওয়ার সাহস দাও।
তাকে তথ্য দাও, কিন্তু তথ্যের উৎস
যাচাই করার বুদ্ধিও দাও।
তাকে প্রযুক্তি দাও, কিন্তু প্রযুক্তির ভিতরের
বিজ্ঞান বুঝতে শেখাও।
মুখস্থ বিদ্যা মানুষকে পরীক্ষায় জেতায়,
কিন্তু মুক্ত চিন্তা তাকে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে শেখায়।

একটি জাতির সম্পদ তার সোনার ভাণ্ডারে যতটা নয়,
তার মানুষের মস্তিষ্কে তার চেয়েও বেশি।
যে দেশে প্রশ্ন করতে জানে এমন মানুষ বাড়ে,
সে দেশে গবেষণাগার জন্ম নেয়।
যে দেশে গবেষণাগার জন্ম নেয়,
সেখানে নতুন প্রযুক্তি জন্ম নেয়।
প্রযুক্তি থেকে শিল্প, শিল্প থেকে উৎপাদন,
উৎপাদন থেকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা,
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থেকে রাজনৈতিক আত্মমর্যাদা।
এই ধারাটিই সভ্যতার অন্তর্গত নদী,
যে নদীর উৎস কোনো অলৌকিকতা নয়,
মানুষের কৌতূহল। আর কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখাই
হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্ব।

যে শিশু জানতে চায়, সে এখনো পরাজিত হয়নি।
যে মানুষ নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে পারে,
সে এখনো বন্দী নয়।
যে জাতি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে,
তার ভবিষ্যৎ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
যে সমাজ অজ্ঞতার ওপর গর্ব না করে
জ্ঞান অর্জনের লজ্জাহীন ক্ষুধা তৈরি করতে পারে,
তার সামনে পৃথিবীর কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়।

স্বর্গের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না,
পরকালের দরজার চাবি কার হাতে
তাও কেউ নিশ্চিত জানে না;
কিন্তু এই পৃথিবীর ক্ষুধা সত্য,
কান্না সত্য, রোগ সত্য, অশিক্ষা সত্য,
এই পৃথিবীর অপমান সত্য।
মানুষের নৈতিকতার প্রথম পরীক্ষা
অদৃশ্যের প্রতি তার আনুগত্যে নয়,
দৃশ্যমানের প্রতি তার দায়িত্বে।

একটি ক্ষুধার্ত শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া
একটি প্রার্থনার বাস্তব রূপ হতে পারে।
একজন অসুস্থ মানুষের জন্য গবেষণা করা
একটি উপাসনার গভীরতর অর্থ হতে পারে।
একটি কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া
একটি নীরব প্রার্থনার মতোই পবিত্র হতে পারে।
একজন বেকার তরুণকে দক্ষ করে তোলা,
একটি গ্রামে বিদ্যালয় তৈরি করা,
একটি রোগের ওষুধ আবিষ্কার করা,
একটি অন্ধকার মস্তিষ্কে
প্রশ্নের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া
মানুষের হাতে মানুষের জন্য নির্মিত
সবচেয়ে মহৎ তীর্থ হতে পারে।

উন্মেষ তাই কোনো স্লোগান নয়,
কোনো মতবাদের পতাকা নয়,
কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে আরেক ধর্মের যুদ্ধ নয়।
উন্মেষ হলো নিজের অজ্ঞতাকে চিনে নেওয়া,
নিজের ভুলকে স্বীকার করা,
নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষার সামনে দাঁড় করানো,
নিজের ভয়ের ভেতর দিয়ে
সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া,
নিজের দুই হাতকে
ভাগ্যের অপেক্ষা থেকে ফিরিয়ে এনে
সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত করা।

একদিন মানুষ বুঝবে,
তার মুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী দরজা
আকাশের ওপারে নয়,
তার নিজের মস্তিষ্কের ভেতর।

সেই দরজা খুলবে প্রশ্নে,
তার ভেতর দিয়ে আলো আসবে জ্ঞানে,
জ্ঞান হাত ধরবে সৃষ্টির,
সৃষ্টি জন্ম দেবে আত্মনির্ভরতার,
আর আত্মনির্ভর মানুষ দাঁড়াবে
এমন এক পৃথিবীর সামনে
যেখানে তাকে আর কেউ
অজ্ঞতার নামে ভয় দেখিয়ে,
বিশ্বাসের নামে বিভক্ত করে,
অলৌকিকতার নামে বোকা বানিয়ে
তার শ্রম ও ভবিষ্যৎ কিনে নিতে পারবে না।

তখন উপাসনার শব্দ থাকবে,
কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে গবেষণার শব্দ।
প্রার্থনার আলো থাকবে,
কিন্তু তার পাশে জ্বলবে পরীক্ষাগারের আলো।
মন্দির থাকবে, মসজিদ থাকবে, গির্জা থাকবে,
কিন্তু তাদের ছায়ায় হারিয়ে যাবে না বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার ও মানুষের অধিকার।

তখন মানুষ আকাশের দিকে তাকাবে,
কিন্তু পৃথিবী থেকে চোখ সরাবে না।
তখন সে স্বর্গের কথা ভাববে,
কিন্তু পৃথিবীকে নরক বানানোর অধিকার
নিজের হাতে রাখবে না।

তখন তার সবচেয়ে বড় প্রার্থনা হবে
একটি জাগ্রত মস্তিষ্ক, একটি স্বাধীন বিবেক,
একটি অনুসন্ধিৎসু হৃদয় এবং এমন দুই হাত
যারা অপেক্ষা করে না অলৌকিকতার,
বরং নিজেরাই আলো তৈরি করে।

প্রদ‍্যোত

✦