রক্তের ওপারে যে আলো
রক্তের ওপারে যে আলো
মানুষ,
তুমি কি এখনও
সেই অন্ধ গুহার সন্তান,
যেখানে দেবতার ক্ষুধা মেটাতে
আগুনে পোড়ানো হতো
নবজাতকের কান্না,
আর রক্তমাখা ছুরির ঝিলিককে
বলা হতো পবিত্রতা?
তুমি কি এখনও বিশ্বাস করো-
স্বর্গের দরজায় পৌঁছাতে হলে
কারও গলা কেটে দিতে হয়?
দেখো, এই যে কাঁপতে থাকা ছাগলটি,
তার চোখেও তো ছিল
বেঁচে থাকার এক টুকরো নীল স্বপ্ন।
এই যে গরুর ভয়ার্ত চাহনি,
সে-ও তো মৃত্যুর আগে
শেষবারের মতো পৃথিবীর ঘাসের গন্ধ নিতে চেয়েছিল।
তবু তুমি, নিজেকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা মানুষ,
তার আর্তনাদকে
ধর্মের ঢাকঢোলের নিচে চাপা দিয়ে
উৎসবের নাম দিয়েছো।
কী ভয়ংকর!
শিশুর হাতে ফুল নয়,
তুমি তুলে দিয়েছো ধারালো ছুরি।
করুণার ভাষা নয়,
শিখিয়েছো, রক্ত ঝরানোও নাকি ভক্তি হতে পারে।
তারপর বিস্মিত হও,
কেন পৃথিবী এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে।
মানুষ,
প্রার্থনা কখনও হত্যার ভাষায় জন্মায় না।
সত্যিকারের ঈশ্বর
কোনও রক্তের গন্ধে মহান হন না।
তিনি লুকিয়ে থাকেন-
ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে তুলে দেওয়া একমুঠো ভাতে,
তৃষ্ণার্ত পথিককে এগিয়ে দেওয়া এক পেয়ালা জলে,
আহত পাখির ডানায় বেঁধে দেওয়া
নরম স্নেহের কাপড়ে।
তুমি মসজিদ গড়েছো,
মন্দির গড়েছো,
গির্জার চূড়ায় স্বর্ণ বসিয়েছো,
কিন্তু নিজের হৃদয়ের ভিতর
একফোঁটা করুণা জন্মাতে পারোনি।
তাই আজও
মানুষের ভেতরে পশু বেঁচে আছে,
আর পশুর চোখে
মানুষকে দেখে আতঙ্ক জন্মায়।
সভ্যতা মানে শুধু মহাকাশযান নয়,
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়,
লোহা আর প্রযুক্তির অহংকার নয়।
সভ্যতা মানে সামগ্রিক বোধের শুদ্ধি।
একদিন ইতিহাস
এই রক্তাক্ত উৎসবগুলোর দিকে তাকিয়ে
ঠিক তেমনি বিস্মিত হবে,
যেমন আজ আমরা বিস্মিত হই
মানুষ বলির কাহিনি শুনে।
কারণ সময়ের নদী
অবশেষে সব বর্বরতার কবর রচনা করে।
সেদিন,
ধর্ম মানে হবে না ভয়,
না আনুগত্যের নামে হত্যা।
ধর্ম মানে হবে-
একটি আহত প্রাণীর পাশে বসে থাকা,
একজন গৃহহীনকে ঘর দেওয়া,
একটি ক্ষুধার্ত পৃথিবীর মুখে
ভালোবাসার অন্ন তুলে দেওয়া।
আর মানুষ,
নিজের ভেতরের অন্ধকার জবাই করে
প্রথমবারের মতো
আত্মার সত্যিকার আলো দেখবে।
সেদিন কোনও রক্ত লাগবে না।
কোনও কাঁপতে থাকা প্রাণীর আর্তনাদ লাগবে না।
মানুষ বুঝবে-
পরমাত্মার পথে পৌঁছাতে হলে
কাউকে হত্যা নয়,
নিজের অহংকারকেই কোরবানি দিতে হয়।
আর সেই দিন,
পৃথিবীর আকাশে
প্রথমবারের মতো
সমস্ত প্রাণের জন্য
একসঙ্গে জ্বলে উঠবে
করুণার সূর্য।
প্রদ্যোত / ২৮ মে ২০২৬