অহং থেকে অনন্ত
অহং থেকে অনন্ত
আজ তোমাদের সকলের প্রতি
আমার অসীম কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি
তোমরা যদি আমাকে
শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে,
যদি আমার প্রতিটি উচ্চারণে
সম্মতির প্রদীপ জ্বেলে রাখতে,
তবে হয়তো আমি আজও বন্দি হয়ে থাকতাম
তোমাদের স্বীকৃতির কারাগারে।
আমার ভালোবাসা ছিল
জড়িয়ে থাকার ধর্মে বিশ্বাসী।
আমি মানুষকে ভালোবাসতাম,
কিন্তু সেই ভালোবাসার ভেতর
অদৃশ্য এক মালিকানাবোধ
শিকড় ছড়িয়ে বসেছিল।
আমি ভাবতাম- যাকে ভালোবাসি
সে থাকবে,
যাকে আপন বলি
সে কখনও দূরে যাবে না।
কিন্তু জীবন ভালোবাসার অভিধান পড়ে না।
সে পড়ে কেবল অনিত্যতার উপনিষদ।
তোমাদের অবিশ্বাস প্রথমে আমাকে ভেঙেছিল,
তারপর আমাকে খুলে দিয়েছিল।
তোমাদের প্রত্যাখ্যান
প্রথমে বিষের মতো জ্বালিয়েছিল,
তারপর সেই বিষই
আমার অহংকারের শিরায়
অমৃতের পথ খুলে দিয়েছিল।
যেদিন বুঝলাম- কারও বিশ্বাসের উপর
আমার অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না,
সেদিন প্রথম নিজের ভেতরের দরজায়
আলতো করে কড়া নাড়ল
এক অপরিচিত আমি।
তোমাদের অবিশ্বাসের ছুরি
কেটে দিয়েছিল আমার সমস্ত নির্ভরতার সুতো।
আমি তখন ছিঁড়ে যাওয়া ঘুড়ি নই,
বরং বুঝলাম-
ঘুড়ি কখনও আকাশের নয়,
সে কেবল সুতোয় বাঁধা।
সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার পরেই প্রথম জানলাম
আকাশের কোনও মালিক নেই।
আমি উড়েছি।
ঝড় আমাকে ফেলতে আসেনি,
ঝড় এসেছিল আমার ডানা পরীক্ষা করতে।
বজ্র আমাকে পোড়াতে আসেনি,
সে এসেছিল আমার অন্ধকারকে আলোকিত করতে।
প্রতিটি পতন আমাকে শিখিয়েছে,
মাটি কখনও শত্রু নয়।
প্রতিটি ভাঙন আমাকে বলেছে,
যা ভাঙে তা ছিল নির্মিত;
যা থাকে তা কখনও নির্মিত নয়।
আমি ধীরে ধীরে
নিজের ভেতরে প্রবেশ করেছি।
সেখানে কোনো আয়না ছিল না,
ছিল না কারও প্রশংসার প্রতিধ্বনি।
ছিল শুধু নিঃশব্দ এক সমুদ্র।
সেই সমুদ্রে আমার সমস্ত পরিচয়
এক এক করে ডুবে গেল।
কবি ডুবল, অভিমানী ডুবল,
প্রেমিক ডুবল, বিজয়ী ডুবল,
পরাজিতও ডুবল।
শেষ পর্যন্ত যে রইল,
তার কোনও নাম নেই।
সেই নামহীন সত্তাই
আমাকে শেখাল- অহং কখনও শক্তি নয়,
অহং কেবল ভয়ের অন্য নাম।
যার হারানোর ভয় আছে,
তারই অহং আছে।
যার পাওয়ার নেশা আছে,
তারই বন্ধন আছে।
যে নিজেকে রক্ষা করতে চায়,
সে এখনও নিজেকে চেনে না।
আমি ধীরে ধীরে
নিজেকে হারাতে শিখেছি।
আর আশ্চর্য!
নিজেকে হারিয়েই প্রথম নিজেকে পেয়েছি।
তোমাদের প্রতিটি আঘাত
আমার শত্রু ছিল না।
তোমাদের প্রতিটি বিদ্রূপ
ছিল আমার অনুশীলনের ক্ষেত্র।
তোমাদের ঈর্ষা
ছিল আমার সহনশীলতার শিক্ষক।
তোমাদের রিপুগত ভাইরাস
ক্রমাগত সংক্রমিত করেছে
আমার ক্ষণস্থায়ী সত্তাকে।
আর আমার ভেতরে
এক অদৃশ্য প্রতিরোধশক্তি
নিঃশব্দে জন্ম নিয়েছে।
আজ আর ক্রোধ আমাকে
অধিকার করতে পারে না।
লোভ আমার দরজায় এসে
নিজেই ক্লান্ত হয়ে ফিরে যায়।
অপমান আমার গায়ে এসে পড়ে,
কিন্তু আমার ভেতরে
প্রবেশের পথ খুঁজে পায় না।
কারণ আমি জানি, যার আঘাত লাগে,
সে এখনও নিজেকে একটি পৃথক সত্তা মনে করে।
আর আমি ধীরে ধীরে
সেই পৃথকতার ভ্রম থেকে জেগে উঠছি।
আজ আমি কোনও মানুষের বিরুদ্ধে নই।
আমি যুদ্ধ করি নিজের অজ্ঞতার সঙ্গে।
আমি বিদ্রোহ করি
নিজের অন্ধকারের বিরুদ্ধে।
আমি জয় করতে চাই না কোনো রাজ্য।
আমি জয় করতে চাই
একটি মাত্র সাম্রাজ্য- নিজের মন।
আজ আমি বুঝি, ক্ষমা মানে
কাউকে ছেড়ে দেওয়া নয়,
নিজেকে মুক্ত করা।
ভালোবাসা মানে
কাউকে ধরে রাখা নয়,
তার অস্তিত্বকে আশীর্বাদ করা।
জ্ঞান মানে অনেক কিছু জানা নয়,
যা জানা ছিল, তার অধিকাংশই ভুল ছিল-
এই সত্যটি উপলব্ধি করা।
আমি এখনও উড়ি।
কিন্তু এখন কোনো গন্তব্যের জন্য নয়।
উড়ি, কারণ আকাশের ধর্ম উন্মুক্ত।
উড়ি, কারণ চৈতন্যের কোনো শেষ প্রান্ত নেই।
উড়ি, একটি স্বপ্ন থেকে অযুত স্বপ্নে,
একটি প্রশ্ন থেকে সহস্র উপলব্ধিতে,
একটি জীবন থেকে অনন্ত জীবনের বোধে।
যারা আমাকে ভাঙতে চেয়েছিল,
তাদের সকলকে আজ নীরবে প্রণাম জানাই।
কারণ তারা জানত না,
তারা আমাকে ধ্বংস করেনি।
তারা কেবল আমার নির্মিত সত্তাকে ভেঙে দিয়েছে।
আর সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই
আমি খুঁজে পেয়েছি অবিনশ্বর আমাকে।
এখন আর পার্থিব কোনো আবেগ,
কোনো রিপু, কোনো প্রশংসা, কোনও নিন্দা,
কোনো লাভ, কোনো ক্ষতি
আমাকে স্পর্শ করতে পারে না।
আমি জানি, যে অসংখ্যবার মরে,
সেই একদিন মৃত্যুকেও অতিক্রম করে।
আজ আমি অহং নই। আমি সেই নীরবতা,
যেখানে সমস্ত শব্দ নিজেকে বিলীন করে।
আমি সেই আলো, যেখানে অন্ধকারেরও
অভিমান থাকে না।
আমি সেই চৈতন্য, যেখানে ‘আমি’ শব্দটিও
শেষ পর্যন্ত নিজের ভার নামিয়ে রেখে
অসীমের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়।
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি..
প্রদ্যোত / ১১ জুলাই ২০২৬