বন্দিশালার বাইরে যে আকাশ
বন্দিশালার বাইরে যে আকাশ
যেদিন প্রথম কোনো নারী বুঝেছিল- তার জানালার ওপাশে যে আকাশটি নীল হয়ে আছে, সেটি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, সেদিনই ইতিহাসের প্রথম কারাগারে একটি অদৃশ্য ফাটল ধরেছিল। সেই ফাটলের শব্দ কেউ শোনেনি; কারণ পৃথিবী তখনও পুরুষের উচ্চারণে এতটাই মুখর ছিল যে নারীর নীরবতার ভাঙনকেও তারা নীরবতাই ভেবেছিল। অথচ প্রতিটি ইটের নিচে, প্রতিটি অলিখিত নিষেধের গভীরে, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের গোপন কুঠুরিতে একটি নদী জন্ম নিচ্ছিল। নদীরা কখনও অনুমতি নিয়ে সাগরে যায় না।
তোমাকে ছোট করে রাখার জন্য তারা কত রকম ভাষা আবিষ্কার করেছে! কখনও ধর্মের ভাষা, কখনও সংস্কারের, কখনও লজ্জার, কখনও ভালোবাসার ছদ্মবেশ। তারা তোমার চারপাশে প্রাচীর গড়েছে, অথচ প্রাচীরের নাম দিয়েছে নিরাপত্তা। তারা তোমার ডানাগুলো কেটে বলেছে, এটাই সৌন্দর্য। তারা তোমার পদক্ষেপ আটকে বলেছে, এটাই মর্যাদা। তারা তোমার স্বপ্নকে গৃহস্থালির হাঁড়িতে ঢেলে বলেছে, এই আগুনেই পৃথিবী টিকে থাকে। কিন্তু পৃথিবী কি কখনও একটিমাত্র আগুনে জ্বলে? পৃথিবী তো জ্বলে লক্ষ সূর্যের উত্তরাধিকার নিয়ে।
তুমি জন্মের পর থেকেই শুনে এসেছ- কারও কন্যা, কারও বোন, কারও স্ত্রী, কারও মা। অথচ খুব কম মানুষই তোমাকে শুধুই তোমার নামে ডেকেছে। যেন তোমার পরিচয় সর্বদা কারও ছায়ার সঙ্গে বাঁধা। যেন তুমি নিজে একটি পূর্ণ মহাদেশ নও, কেবল অন্য কোনো মানচিত্রের উপকূল।
না, তুমি উপকূল নও। তুমি সমুদ্র।
তোমার চোখের ভেতরে যে দীপ্তি আছে, তা কোনো প্রদীপের ধার করা আলো নয়। তুমি যখন প্রথম প্রশ্ন করতে শেখো, তখনই সভ্যতার পুরোনো সিংহাসন একটু কেঁপে ওঠে। তুমি যখন প্রথম ‘না’ বলতে শেখো, তখন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লেখা অনুগত্যের অভিধানে একটি নতুন শব্দ ঢুকে পড়ে। তুমি যখন নিজের পায়ে দাঁড়াও, তখন কেবল একজন মানুষ উঠে দাঁড়ায় না- উঠে দাঁড়ায় বহু প্রজন্মের অসমাপ্ত সাহস।
তুমি পথে নামো। পথ প্রথমে তোমাকে চিনতে পারে না। কারণ এতদিন সে পুরুষের পদচিহ্নই মুখস্থ করেছে। তারপর ধীরে ধীরে পথের ধুলো তোমার পায়ের ভাষা শিখে নেয়। বাতাস তোমার কণ্ঠস্বর বহন করতে শেখে। গাছেরা তোমার ছায়াকে আশ্রয় দিতে শেখে। শহর তার ফুটপাত নতুন করে মাপে। ইতিহাস তার পুরোনো অধ্যায়ে সংশোধনের দাগ টানে।
যে হাত এতদিন দোলনা দুলিয়েছে, সেই হাতই প্রয়োজনে বিপ্লবের পতাকা তুলতে পারে। যে কণ্ঠ এতদিন লোরি গেয়েছে, সেই কণ্ঠই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রধ্বনি হতে পারে। কারণ কোমলতা দুর্বলতা নয়; কোমলতারও একটি গোপন ইস্পাত আছে, যা কেবল অপমানের আগুনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
তুমি এগিয়ে যাও। বিজয়ের জন্য নয়, মানুষের জন্য। প্রতিশোধের জন্য নয়, ন্যায়ের জন্য। এমন একটি পৃথিবীর জন্য, যেখানে কোনো কন্যাশিশুকে তার স্বপ্নের আগে তার লিঙ্গের পরিচয় দিতে হবে না; যেখানে ভালোবাসা মানে মালিকানা নয়, সহযাত্রা; যেখানে সংসার মানে বন্দিত্ব নয়, সমান মর্যাদার দুটি স্বাধীন মানুষের যৌথ নির্মাণ।
মনে রেখো, কোনো বিপ্লব একদিনে পৃথিবী বদলায় না। কিন্তু একটি সাহসী পদক্ষেপ শত শত ভবিষ্যতের জন্ম দেয়। আজ তোমার যে পদচিহ্ন ভিজে মাটিতে পড়ছে, আগামীকাল সেই পথেই অসংখ্য কিশোরী সূর্যের দিকে হাঁটবে। তারা তোমার নাম জানুক বা না জানুক, তোমার সাহস তাদের রক্তে আলো হয়ে থাকবে।
আর তখন পৃথিবী একদিন বুঝবে- নারীকে মুক্তি দেওয়া হয় না। নারী মুক্ত হয়। এবং সেই মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে পুরুষও মুক্ত হয় তার নিজের অহংকারের কারাগার থেকে। কারণ স্বাধীনতা কখনও একক কোনো লিঙ্গের সম্পত্তি নয়; স্বাধীনতা সর্বদা মানবতার সবচেয়ে সুন্দর উচ্চারণ।
প্রদ্যোত / ০২ জুলাই ২০২৬