ভাঙার আগে
ভাঙার আগে
ভাঙো-
যদি ভাঙতেই হয়, তবে আগে ভাঙো
নিজের বুকের ভেতর
অহংকারের কালো প্রাচীর।
ভাঙো সেই আয়না, যেখানে প্রতিদিন
নিজেকেই ঈশ্বর বলে মনে হয়।
ভাঙো, লোভের অন্ধ সিংহাসন,
ক্ষমতার বিষাক্ত মুকুট,
হিংসার গোপন কারাগার,
মিথ্যার অলঙ্কার, অন্যায়ের অভেদ্য দুর্গ।
কিন্তু শিশুর হাসি ভেঙো না,
মায়ের চোখের আলো ভেঙো না,
প্রার্থনার নীরবতা ভেঙো না,
কোনো কবির স্বপ্ন,
কোনো কৃষকের ধানের শীষ,
কোনো নদীর জোৎস্নামাখা স্রোত ভেঙো না।
আমি দেখেছি, মানুষের হাতে হাতুড়ি উঠলেই
প্রথমে ভাঙে না ইট, ভাঙে বিশ্বাস।
ভাঙে না শুধু জানালা,
ভাঙে ভবিষ্যতের আকাশ।
ভাঙে না শুধু একটি ঘর,
ভেঙে যায় একটি শিশুর নিরাপদ পৃথিবী।
যারা ভাঙাকে উৎসব বানায়,
তারা জানে না- একটি বৃক্ষ বড় হতে
যত বছর লাগে, একটি কুঠারের
ততক্ষণও লাগে না।
একটি গ্রন্থাগার
শত শত বছরের আলো জমিয়ে রাখে,
একটি আগুন কয়েক মুহূর্তেই
সেই সূর্যাস্তকে গ্রাস করে।
একটি ভাষা অসংখ্য মায়ের কণ্ঠে জন্ম নেয়,
অসংখ্য শিশুর উচ্চারণে বেড়ে ওঠে,
কিন্তু ঘৃণার একটিমাত্র আদেশ
তাকে নির্বাসনে পাঠাতে চায়।
হে ভাঙার উন্মত্ত সৈনিক,
কখনো কি শুনেছ ধ্বংসস্তূপের কান্না?
ভাঙা ইটও কথা বলে,
পোড়া বৃক্ষও ধোঁয়ার ভাষায় ইতিহাস লেখে।
ধুলোর নিচে চাপা পড়া প্রতিটি ইটের ভেতর
একজন রাজমিস্ত্রির ঘাম,
একজন মায়ের প্রার্থনা,
একজন শিশুর আগামীকাল
এখনও উষ্ণ হয়ে জেগে থাকে।
তোমরা বলো, শক্তিই সত্য।
আমি দেখি, একটি বীজ
সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
পাথর ভেদ করে আকাশের দিকে হাত বাড়ায়।
তোমরা বলো, অস্ত্রই শেষ কথা।
আমি দেখি, একটি ফুল
যুদ্ধফেরত সৈনিকের চোখে জল এনে দেয়।
তোমরা বলো, ধ্বংসেই বিজয়।
আমি দেখি, ছাইয়ের নিচে
সবুজের গোপন শ্বাস
ধীরে ধীরে আবার পৃথিবীকে ডাকছে।
প্রকৃতি কোনো বিচারক নয়,
তবু তার বিচারে কোনো আপিল নেই।
নদী যখন পথ বদলায়,
পাহাড় যখন নীরবে ভেঙে পড়ে,
সমুদ্র যখন গিলে ফেলে অহংকারের নগর,
বাতাস যখন বিষাক্ত সভ্যতার বিরুদ্ধে
ঝড় হয়ে ওঠে,
তখন বুঝি- প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না,
সে কেবল ভারসাম্যের হারানো গান
ফিরিয়ে আনে।
কত সাম্রাজ্য ধুলো হয়ে উড়ে গেছে!
কত সিংহাসন শেওলায় ঢাকা পড়েছে!
কত রাজমুকুট আজ প্রত্নতত্ত্বের কাঁচের বাক্সে
নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে!
কিন্তু একটি সত্য, একটি প্রেম, একটি করুণা,
একটি কবিতা- সহস্র বছর পেরিয়েও
মানুষের মুখে নতুন হয়ে জন্ম নেয়।
তাই বলি- যদি ভাঙতেই হয়,
তবে ভাঙো ঘৃণার ব্যাকরণ,
লোভের অভিধান, যুদ্ধের মানচিত্র,
বিভেদের সীমানা।
ভাঙো সেই ধর্ম,
যে মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করে।
ভাঙো সেই রাজনীতি,
যে রক্তকে পতাকার রঙ বানায়।
ভাঙো সেই ইতিহাস,
যে সত্যকে বন্দী করে রাখে
ক্ষমতার লোহার আলমারিতে।
তারপর একটি বীজ বুনো।
একটি বৃক্ষ রোপণ করো।
একটি শিশুর হাতে
একটি বই তুলে দাও।
একটি নদীর তীরে
একটি গান রেখে এসো।
একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর
একটি বিদ্যালয় গড়ে তোলো।
একটি অনাথ সন্ধ্যার বুকে
একটি প্রদীপ জ্বালাও।
ভাঙা খুব সহজ।
একটি মুহূর্ত একটি শতাব্দীকে হত্যা করতে পারে।
কিন্তু একটি সভ্যতা, একটি মানবতা,
একটি ভালোবাসা, একটি শান্তির পৃথিবী-
গড়ে ওঠে অসংখ্য মানুষের
অগণিত নিঃশ্বাস, অদৃশ্য ত্যাগ,
নিঃশব্দ প্রার্থনা আর অনন্ত ধৈর্যের ওপর।
মনে রেখো- সময় সবচেয়ে নিঃস্পৃহ ভাস্কর।
সে একদিন সব হাতুড়ি ভেঙে দেয়,
সব তরবারি মরিচা ধরায়,
সব দম্ভকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
শুধু থেকে যায়-
একটি বৃক্ষের ছায়া,
একটি শিশুর হাসি,
একটি নদীর গান,
একটি মায়ের আশীর্বাদ,
আর একজন নির্মাতার
নিঃশব্দ হাতের উষ্ণতা।
ইতিহাস শেষে মানুষকে এ প্রশ্নই করবে-
তুমি কত কিছু ভেঙেছিলে, তা নয়-
ধ্বংসের এই দীর্ঘ অন্ধকারে
তুমি কি একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলে?
নাকি অন্ধকারের হাতেই
আরও একটি হাতুড়ি তুলে দিয়েছিলে?
প্রদ্যোত / ১৩ জুলাই ২০২৬