সাইকো ক্যানভাসে শিল্পী যখন শিল্প
ছোটবেলায় ভাবতাম, মানুষ দুই রকম- ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষ। বড় হইয়া বুঝলাম, না রে বাবা! মানুষ আসলে দুই রকম না; দুই হাজার রকম। আর এই দুই হাজার রকমের মধ্যে এমন এমন সব নমুনা আছে, ভগোম্যান যদি আগে থেইকা ট্রেইলার দেখাইয়া দিতেন, তাইলে পৃথিবীতে আইবার আবেদনপত্রই হয়তো জমা দিতাম না।
ঘরের দরজা খুলার আগেই যুদ্ধ শুরু হয়। বাইরে না- ঘরের মধ্যেই। একজন থাকেন, তিনি জন্মগত উপদেষ্টা। আপনি কাশি দিলেও তিনি কইবেন, “আমি আগেই কইছিলাম।” আপনি পানি খাইলেন- ভুল। না খাইলেন- আরও ভুল। আপনি বই পড়েন, তিনি কইবেন, “এইসব বই পড়ে কী হইব?” আপনি বই না পড়লে কইবেন, “তোমার কোনো উন্নতি নাই।”
আরেকজন থাকবেন, তিনি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গোয়েন্দা। আপনি পাঁচ মিনিট চুপ থাকলে তিনি ভাববেন, নিশ্চয়ই কোনো গোপন ষড়যন্ত্র রান্না হইতাছে। আপনি হাসলে- কারে দেখে হাসলেন? ফোন ধরলেন- কার ফোন? ফোন ধরলেন না- ক্যান ধরলেন না? আপনি জানালার দিকে তাকাইলেন- ওইদিকে কী আছে? আপনি ছাদের দিকে তাকাইলেন- ওপরেও নাকি যোগাযোগ শুরু হইছে!
তারপর থাকবেন কেউ “ইগো সম্রাজ্ঞী”। এই জনের কাছে ক্ষমা চাওয়া মহাপাপ। ভুল তিনি করেন, কিন্তু ক্ষমা চাইবেন আপনি। কারণ তিনি ভুল করলেও সেটা দর্শন; আপনি ঠিক করলেও সেটা অপরাধ।
একজন থাকবেন “ডমিনেটিং ট্রেইটর”। আপনার নিজের মতামত থাকাটা উনার কাছে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। আপনি কোন জামা পরবেন, চুলের কেমুন কাটিং দিবেন, কখন ঘুমাবেন, কী লিখবেন, কার সঙ্গে কথা বলবেন- সব কিছুর ওপর উনার সাংবিধানিক অধিকার আছে। আপনার জীবন? আরে না! ওটা উনার প্রকল্প।
আরেকজন থাকবেন “অতি-অন্তর্মুখী সাধু”। এমন চুপচাপ থাকেন যে মনে হয় শব্দের সঙ্গেও উনার ছাড়াছাড়ি হইছে। আপনি কথা কইতে গেলে শুধু “হুঁ”, “আচ্ছা”, “দেখি”- এই তিনটা শব্দে একখান মহাকাব্য শেষ কইরা দেন।
আবার একজন থাকবেন “অতি-বহির্মুখী মাইক”। উনারে যদি পাঁচ মিনিট চুপ করাইতে পারেন, তাইলে নোবেল শান্তি পুরস্কার আপনার। উনি কথা বলেন না- কথা উৎপাদন করেন। আপনি একটা বাক্য শুরু করলে উনি দশটা শেষ করেন। আপনার গল্পে আপনার চরিত্রই আর থাকে না; সবখানে উনিই নায়ক।
তারপর আছেন “সুপারফিশিয়াল নিম্ফোম্যানিয়াক”। উনার কাছে মানুষ না, প্যাকেটটাই আসল। বইয়ের মলাট সুন্দর? বাহ! ভেতরে কী লেখা, তাতে কী আসে যায়! মানুষের ছবি সুন্দর? ব্যাস, চরিত্রের সার্টিফিকেট পাস।
একজন থাকবেন “সন্দেহ বিভাগের স্থায়ী সচিব”। পৃথিবীর প্রতিটা ঘটনা উনার কাছে ষড়যন্ত্র। বৃষ্টি হইলে ষড়যন্ত্র, রোদ উঠলে ষড়যন্ত্র, বিদ্যুৎ গেলে ষড়যন্ত্র, বিদ্যুৎ আইলেও ষড়যন্ত্র। মনে হয় মহাবিশ্বের সব গ্রহ-নক্ষত্র সারাদিন উনাকেই নিয়া মিটিং করে।
এইসব চরিত্র নিয়া ঘরের মধ্যে যখন সকালের সেশন শেষ হয়, তখন মনে হয়- যাক, যুদ্ধ শেষ। না ভাই! এইডা তো শুধু ওয়ার্ম-আপ আছিলো।
বাইরে বের হইলেই শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব।
রাস্তায় এক ভাই আছেন, হর্ন না বাজাইলে গাড়ি চলে না। মনে হয় উনার গাড়ি ডিজেলে না, হর্নে চলে।
অফিসে এক ভদ্রলোক আছেন, অন্যের কাজের ওপর দাঁড়াইয়া নিজের কৃতিত্বের ছবি তোলেন। আপনি সারারাত খাটলেন, সকালে উনি কইবেন, “আমরা তো অনেক কষ্ট করছি।”
চায়ের দোকানে এক দার্শনিক আছেন। দেশের অর্থনীতি, বিশ্বরাজনীতি, মহাকাশ, কোয়ান্টাম ফিজিক্স, ফুটবল, সাহিত্য- সব বিষয়ে উনার সমান অজ্ঞতা, আর সেই অজ্ঞতাটাই তিনি সমান আত্মবিশ্বাসে বিতরণ করেন।
ফেসবুকে ঢুকলে তো আরেক সার্কাস। একজন প্রতিটা পোস্টে বিচারক। আরেকজন প্রতিটা মন্তব্যে উকিল। তৃতীয়জন নিজেই বাদী, নিজেই বিবাদী, নিজেই সাক্ষী, নিজেই রায় ঘোষণা করে। কমেন্ট বক্সটা আদালত না, যেন পাগলদের অলিম্পিক।
এইসব মানুষদের সবচেয়ে বড় গুণ হইল- তারা কখনো নিজেরে সমস্যা ভাবে না। তারা ভাবে, পৃথিবীর সবাই সফটওয়্যার আপডেটের অপেক্ষায় আছে; শুধু তারাই ফাইনাল ভার্সন।
আর আপনি? আপনি যদি একটু লিখতে চান, কেউ কইবে- “এইসব লিখে কী লাভ?” আপনি যদি গান করেন- “এই বয়সে এইসব?” আপনি যদি ছবি আঁকেন- “এতে ভাত মিলব?” আপনি যদি চুপচাপ বসে ভাবেন- “নিশ্চয়ই কিছু লুকাইতাছে।”
সৃজনশীল মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু সমালোচনা না; অবিরাম মানসিক শব্দ। একেকজন মানুষ একেকটা লাউডস্পিকার নিয়া আপনার মাথার ভেতর বসে থাকে। কেউ অহংকার বাজায়, কেউ সন্দেহ বাজায়, কেউ নিয়ন্ত্রণের বাঁশি বাজায়, কেউ তুলনার ঢাক বাজায়। আপনার নিজের চিন্তার জন্য মাথার ভেতর এক ইঞ্চি জায়গাও খালি থাকে না।
কখনো কখনো মনে হয়, শিল্পী হওয়ার আগে মানুষরে শব্দনিরোধক হেলমেট দেওয়া উচিত। কারণ ক্যানভাসের চেয়ে বড় যুদ্ধটা চলে মাথার ভেতর।
তারপরও মানুষ লিখে। গান গায়। ছবি আঁকে। কবিতা বানায়। কারণ সৃজনশীলতা এক অদ্ভুত জিনিস। চারদিকে যতই কোলাহল থাকুক, সে ফাঁক খুঁজে নেয়। কিন্তু হায়, সেই ফাঁকটুকুও যদি সারাক্ষণ এইসব চরিত্রে ভর্তি থাকে, তাইলে শিল্পী মাঝে মাঝে নিজেরেই জিগায়- “এই যে এতদিন ধইরা সাইকোগো লগে ডিল করতাছি… আমি এখনো সুস্থ আছি, নাকি সুস্থ থাকার অভিনয়টাই এত নিখুঁত হইয়া গেছে যে আমিও টের পাইতাছি না?”
তারপর আয়নার দিকে তাকাই। আয়নাডা কিছু কয় না। শুধু এমনভাবে হাসে, যেন বহুদিন ধইরা আমারে চিনে ফেলছে।
আর আমি দীর্ঘশ্বাস ফালাইয়া মনে মনে কই-
“হে পরম করুণাময়, আমারে বড়লোক বানাইয়েন না, বিখ্যাতও বানাইয়েন না। শুধু এইটুকু দয়া করেন- সাইকোগো লগে ডিল করতে করতে যেন নিজেই আর ফুলটাইম সাইকো না হইয়া যাই!”
পুনশ্চ:
এই যুগে আবার নতুন এক প্রজাতির লগেও ডিল করতে হয় “রিল-ডুডস্”। না, সব তরুণ না। কিন্তু এমন একদল মানুষ, যাদের জীবনটা মনে হয় পনেরো সেকেন্ডের ভিডিওতে আটকা পড়ে গেছে। ধৈর্য দুই আঙুল, মনোযোগ তিন সেকেন্ড, কিন্তু আত্মবিশ্বাস হিমালয়ের চূড়ার চেয়েও উঁচু।
একজন বইয়ের প্রথম দুই পৃষ্ঠা পড়েই বইটার রিভিউ দিয়া দেয়। আরেকজন দশ সেকেন্ডের ভিডিও দেখে ঘোষণা করে- “এই বিষয়ে আমার গবেষণা শেষ।”
কেউ কোনো কথা শেষ পর্যন্ত শুনে না। মাঝপথেই উত্তর রেডি। প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই মতামত রেডি। আর যুক্তি যদি একটু লম্বা হয়, সঙ্গে সঙ্গে রায়- “ব্রো, এত সিরিয়াস হও কেন?”
এমনও আছে, পাঁচ মিনিট নীরব বসে থাকলে মনে হয় পৃথিবীর সব সার্ভার ডাউন হইয়া গেছে। হাত নিজের অজান্তেই ফোন খোঁজে। আঙুল স্ক্রল করে। কী দেখতাছে, ক্যান দেখতাছে- সেই খবর ভগোম্যানই জানেন।
আরেকজন আছে, বাস্তব জীবনের চেয়ে নিজের অনলাইন সংস্করণটারে বেশি ভালোবাসে। সকালের নাস্তা খাওয়ার আগেই ছবি। চা ঠান্ডা হইয়া গেলেও সমস্যা নাই; স্টোরি আপলোড আগে। মনে হয় জীবনটা আর বাঁচার জন্য না- দেখানোর জন্য।
তারপর আসে “তাৎক্ষণিক সফলতা বিদ্যালয়”। তিন দিন গিটার শিখছে- চতুর্থ দিন কনসার্টের স্বপ্ন। দুইটা কবিতা লিখছে- তৃতীয় দিন নিজেকে জাতীয় কবি ভাবতাছে। এক মাস জিমে গেছে- এহন অন্যদের ফিটনেস কোচিং দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এত দ্রুত বিশেষজ্ঞ সম্ভবত আগে জন্মায় নাই।
আর সমালোচনা? ওহ, এইখানেই আসল নাটক। আপনি যদি বলেন- “এই অংশটা আরও ভালো করা যায়”- ব্যাস! মনে হবে আপনি তার সাত পুরুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছেন। গঠনমূলক পরামর্শকেও ব্যক্তিগত অপমান মনে করার এক আশ্চর্য প্রতিভা জন্মাইছে।
অবশ্য উল্টা দিকও আছে। এই প্রজন্মের অনেক তরুণ আবার অসম্ভব সৃজনশীল, প্রযুক্তিবান্ধব, দ্রুত শেখে, নতুন চিন্তা আনে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন গতি গভীরতার জায়গা দখল করে, আর ভাইরাল হওয়াটা মূল্যবান হওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
এইসব আচরণের ভিড়ে একজন শিল্পী বসে একটা কবিতার প্রথম লাইন ভাবতে যায়। ঠিক তখনই কেউ কইতাছে- “এত বড় লেখা কে পড়বে?” আরেকজন কইতাছে- “এক মিনিটের মধ্যে বলেন।” তৃতীয়জন বলে- “এইটা কি শর্টস বানানো যাবে?”
তখন মনে হয়, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক দুনিয়ায় ঢুকতাছি, যেখানে মনোযোগ বিলাসিতা, ধৈর্য বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী, আর চিন্তার গভীরতা অ্যালগরিদমের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করতাছে।
তারপর আবার নিজের মাথায় হাত দিই। ভাবি- আমি কি সত্যিই মানুষজনের সঙ্গে কথা বলতাছি, নাকি প্রত্যেকে নিজের নিজের অদৃশ্য ক্যামেরার সামনে অভিনয় করতাছে?
এইসব চরিত্রের ভিড়ে টিকে থাকাটাই এখন একধরনের শিল্প। আর শিল্পী হওয়া? ওইডা তো রীতিমতো বীরত্ব।
প্রদ্যোত