দ্য মেটিকুলাস প্রজেক্ট অব হোমো পয়জনাস
(মাইক্রো সাইন্স ফিকশন)
হোমো পয়জনাসদের গবেষণাগারের নীলচে আলোয় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল প্রজেক্টের প্রধান বিজ্ঞানী, শিম্পাঞ্জি ড.মোসফ্রিকি। তার মাথায় ছিল একটি চ্যাপ্টা টুপি আর চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। মানব সভ্যতার আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তার ক্ষোভ। বিশেষ করে ডিজিটাল দুনিয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা তাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল- মানুষ একে অপরের সাথে যুক্ত হওয়ার বদলে প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল ঝগড়া আর ট্রোলিংয়ে মেতে উঠছে। ড.মোসফ্রিকি হোমো সেপিয়েন্সদের উপর চটে আছেন। ক্ষোভটা কোনো মহৎ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব থেকে আসেনি, এসেছিল চরম এক আত্মসম্মানবোধ থেকে। মহাজাগতিক গবেষণাগারের মনিটরে যখনই সে পৃথিবীর মানুষের কাণ্ডকারখানা দেখত, তখনই তার মেজাজ বিগড়ে যেত। মানুষ একে অপরকে ট্রাফিক জ্যামে গালি দিচ্ছে "বান্দর" বলে, পরীক্ষায় কম পেলে শিক্ষক বলছেন "বাঁদরামি করিস না", এমনকি ডিজিটাল দুনিয়ায় কেউ একটু বোকার মতো আচরণ করলেই কমেন্ট বক্সে লেখে, "পুরো বানরের জাত!" ড.মোসফ্রিকি চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে গজ গজ করে উঠল, "আমরা বনে থাকি, শান্তিতে থাকি। আর এই দ্বিপদী জীবগুলো নিজেরা সারাদিন ঝগড়া করে নাম খারাপ করে আমাদের? দাঁড়াও, দেখাচ্ছি 'বাঁদরামি' কাকে বলে!"
এই ক্ষোভ থেকেই সে আবিষ্কার করল "প্রাইমেট পালস" নামক এক অতি-বেগুনি ডিজিটাল রশ্মি। এর কাজ ছিল মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরের সমস্ত সৃজনশীলতা, যুক্তি আর ধৈর্যকে এক ঝটকায় মুছে দিয়ে সেখানে খাঁটি আদিম হুজুগ ঢুকিয়ে দেওয়া।
ড.মোসফ্রিকি ইন্টারনেটের স্যাটেলাইট লিংকের মাধ্যমে এই রশ্মি ছুড়ে দিল বাঙ্গুস্তানের ওপর। প্রথম ধাক্কাটা এলো ডিজিটাল স্ক্রিনে। সকাল হতেই দেখা গেল, দেশের লাখ লাখ মানুষ কোনো যুক্তি-তর্ক ছাড়া হুট করেই নিজেদের প্রোফাইল পিকচার লাল রঙের বাঁদর বানাতে শুরু করেছে। কেউ জিজ্ঞেস করলেই তারা যুক্তিসঙ্গত জবাব না দিয়ে স্ক্রিনের সামনেই কিচিরমিচির ভঙ্গিতে টাইপ করতে লাগল।
ধীরে ধীরে এই ভার্চুয়াল হুজুগ নেমে এলো বাস্তবের রাস্তায়। মানুষের ভেতরের "আদিম সত্তা" জেগে ওঠায় তারা দল বেঁধে রাস্তায় নেমে এলো। তাদের প্রথম টার্গেট হলো দেশের ইতিহাস আর সংস্কৃতি। "এসব দিয়ে কী হবে? আমাদের আদিম স্বাধীনতাই সব!"- এই স্লোগান তুলে তারা শতাব্দী প্রাচীন জাদুঘর, লাইব্রেরি আর শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে ভাঙচুর চালাল। বই খাতা পুড়িয়ে, ছবি ছিঁড়ে তারা এক অদ্ভুত উল্লাস প্রকাশ করতে লাগল। কোনো নতুন চিন্তা বা সৃজনশীলতার কথা বললেই তাকে দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করা হতে লাগল।
কিছুদিনের মধ্যেই এই বিশৃঙ্খলা রূপ নিল এক মহাবিপ্লবে। লাখ লাখ মানুষ কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা ভবিষ্যৎ চিন্তা ছাড়াই স্রেফ হুজুগের বশে সোজা গিয়ে হাজির হলো ক্ষমতার কেন্দ্রে। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী- সবকিছুকে এক ঝটকায় ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়ে তারা পুরো সরকার ব্যবস্থাকেই ওলটপালট করে দিল।
কিন্তু সমস্যা হলো, ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর তো দেশ চালাতে হয় বুদ্ধিমত্তা আর অর্থনীতি দিয়ে। কিন্তু মস্তিষ্কে তখন কেবলই "এইপ অ্যাটিটিউড"। দেশের কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেল, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল, বাজার সিন্ডিকেট আর হুজুগে অর্থনীতির চোরাবালিতে পড়ে পুরো দেশটা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। দেশ যখন দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখন পাশের বড় বড় ক্ষমতাশালী দেশগুলো এই সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে ছিল। তারা এসে খুব সহজেই এই লণ্ডভণ্ড, সম্পদহীন এবং বুদ্ধিহীন দেশটার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের হুজুগে একটা স্বাধীন, সার্বভৌম ভূখণ্ড পরিণত হলো বাইরের শক্তির হাতের পুতুলে।
মহাজাগতিক ল্যাবের বিশাল স্ক্রিনে পুরো বাঙ্গুস্তানের এই ধ্বংসযজ্ঞ আর পতন দেখছিল ড.মোসফ্রিকি। তার মুখে তখন এক পৈশাচিক স্যাটায়ারধর্মী হাসি। সে তার রোবোটিক গ্লাভস জোড়া খুলে টেবিলের ওপর রাখল।
আসলে পুরো বাঙ্গুস্তান ধ্বংস করা, অর্থনীতি পঙ্গু করা বা বাইরের শক্তির হাতে দেশকে তুলে দেওয়া- এসব ড.মোসফ্রিকি মূল লক্ষ্যই ছিল না। তার আসল উদ্দেশ্যটা ছিল অনেক ছোট, কিন্তু অত্যন্ত ব্যক্তিগত।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আপনমনে হেসে বলল, "মানুষেরা নিজেদের একটু বেশি বুদ্ধিমান ভাবত, আর কথায় কথায় নিজেদের বোকামির জন্য আমাদের গালি দিত! আজ নিজেদের আসল রূপটা দেখলে তো? এখন থেকে যখনই তোমরা একে অপরকে 'বাঁদর' বলে গালি দেবে, অন্তত আয়নায় মুখটা দেখে নিও যে আসল বাঁদরামিটা কারা করে!"
প্রদ্যোত