← Back to writing

ফইন্নি ঈশ্বরগো ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করেন

ফইন্নি ঈশ্বরগো ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করেন

“ফইন্নি ঈশ্বরগো ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করেন।” কথাটা শুনতে যতটা বেয়াদবি, ভেতরে ততটাই অর্থনীতি। কারণ পৃথিবীর ধর্মীয় বাজারের দিকে একটু মন দিয়া তাকাইলে দেখা যায়, ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা অনেক জায়গায় এমন পর্যায়ে গিয়া দাঁড়াইছে যে ভক্তি কম, ব্যবস্থাপনা বেশি; প্রার্থনা কম, আয়োজন বেশি; আত্মার অনুসন্ধান কম, চাঁদার খাতা বেশি।

মানুষ ঈশ্বরের কাছে যাইব, শান্তি চাইব, নিজের অন্তরের সঙ্গে কথা কইব, জীবনের অর্থ খুঁজব, নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হইব, মানুষের প্রতি মমতা বাড়াইব। এইটুকুর জন্য কি আসলেই এত কিছু লাগে?

একজন মানুষ একটা নিরিবিলি ঘরে বসতে পারে। চোখ বন্ধ করতে পারে। নিজের ভেতরের দরজা খুলতে পারে। নিঃশব্দে পরমাত্মাকে ডাকতে পারে। তার জন্য মাইক লাগে না, মঞ্চ লাগে না, প্যান্ডেল লাগে না, ব্যানার লাগে না, লাউডস্পিকার লাগে না, ভিআইপি লাগে না, চাঁদার বাক্স লাগে না। ঈশ্বর যদি সত্যিই সর্বত্র থাকেন, তাইলে তাঁরে খুঁজতে এত বড় বাড়ি বানানোর দরকারটা কী?

এইখানেই আমার সন্দেহ শুরু হয়।

ঈশ্বর নাকি মানুষের হৃদয়ে থাকেন, অথচ ঈশ্বরের জন্য মানুষের হৃদয়ের চাইতে দালানটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হইয়া গেল কেমনে? ঈশ্বর নাকি সর্বশক্তিমান, অথচ তাঁর ঘরের ছাদ চুইয়া পানি পড়লে মানুষের চাঁদা লাগে কেন? ঈশ্বর নাকি সর্বত্র বিরাজমান, অথচ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ঠিকানা লাগে কেন? আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ নাকি সম্ভব, কিন্তু মাঝখানে কিছু সম্মানিত মধ্যস্থতাকারী বা দালাল না থাকলে অনেকের যেন ধর্মীয় সংযোগটাই দুর্বল হইয়া যায়।

ফলে ধর্মকেন্দ্র তৈরি হয়, দানবাক্স বসে, চাঁদার খাতা খোলে, অনুষ্ঠান হয়, মাইক বাজে, লোক ডাকা হয়, ব্যানার ওঠে, খাবারের আয়োজন হয়, বক্তৃতা হয়, ভক্তির আবহ তৈরি হয়। তারপর মানুষ আসে, মাথা নোয়ায়, টাকা দেয়, আবার বাড়ি ফিরে যায়।

ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা হইল কি না, সেই খবর অবশ্য কেউ রাখে না। কিন্তু চাঁদার বাক্স ভরল কি না, সেই খবর সবাই রাখে। এইখানেই ধর্ম আর ধর্মের ব্যবসার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্যটা ধরা পড়ে। প্রার্থনা যদি সত্যিই আত্মার বিষয় হয়, তাহলে এত আয়োজন কেন? ধ্যান যদি সত্যিই অন্তরের যাত্রা হয়, তাহলে এত লোক জড়ো করার দরকার কী? ঈশ্বর যদি নিভৃতির মধ্যে অনুভব করা যায়, তাহলে মাইকের শব্দে তাঁকে ডাকাডাকি করার দরকার কী?

মানুষ যদি একা বসে নিজের অহংকারটাকে একটু নামাইতে পারে, নিজের লোভটাকে একটু চিনতে পারে, নিজের হিংসাটাকে একটু প্রশ্ন করতে পারে, নিজের অপরাধের সামনে দাঁড়াইতে পারে, তাহলেই তো একটা সত্যিকারের ধর্মীয় সাধনা শুরু হয়।

কিন্তু এই কাজটা বড় কঠিন। কারণ নিজের ভেতরে ঢুকতে কোনো চাঁদা লাগে না, কিন্তু সাহস লাগে। নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াইতে কোনো মাইক লাগে না, কিন্তু সততা লাগে। নিজের ভুল স্বীকার করতে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান লাগে না, কিন্তু চরিত্র লাগে। আর চরিত্রের বাজারে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো দানবাক্স নাই। তাই বাইরের আয়োজনটা অনেক সময় সহজ হয়ে যায়।

একটা বিশাল ধর্মকেন্দ্র বানাও। মানুষ ডাকো। অনুষ্ঠান করো। চাঁদা তোলো। বক্তৃতা দাও। ভক্তির আবহ তৈরি করো। তারপর সবাই মিলে ঘোষণা করো, ঈশ্বরের কাজ হইতেছে। কী কাজ হইতেছে, সেটা অবশ্য ঈশ্বরই জানেন। মানুষের কাজটা পরিষ্কার। টাকা দেওয়া।

এইখানেই আমার সেই বিখ্যাত বক্তব্যটা আবার বলতে ইচ্ছা করে। “ফইন্নি ঈশ্বরগো ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করেন।” একবার শুধু পরীক্ষা কইরা দেখেন। সবাই যদি একদিন কইয়া বসে, “ভাই, ঈশ্বরের নামে আর টাকা দিমু না, বরং ক্ষুধার্ত মানুষরে খাওয়ামু, অসুস্থ মানুষরে চিকিৎসা করামু, গরিবের বাচ্চারে পড়ামু, একটা গাছ লাগামু, একটা মানুষের পাশে দাঁড়ামু,” তাহলে ধর্মীয় ব্যবসার বাজারে কী অবস্থা হয় দেখি।

তখন হয়তো অনেক ধর্মকেন্দ্রের হিসাবরক্ষক রাত জাগবে। দানবাক্সের সামনে দাঁড়াইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। চাঁদার খাতা খুলে দেখবে, পাতা আছে, টাকা নাই মাইকওয়ালা কইবে, “স্যার, অনুষ্ঠান হবে?”আয়োজক কইবে, “কী দিয়া হবে?” বক্তা কইবে, “আমারে ডাকবেন?” আয়োজক কইবে, “গাড়িভাড়া দিতে পারব না।”

তারপর ধীরে ধীরে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটবে। মানুষ বুঝতে শুরু করবে, ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে আসলে এত লোকের দরকার ছিল না। এত বড় ঘরেরও দরকার ছিল না। এত সাজসজ্জার দরকার ছিল না।এত শব্দের দরকার ছিল না। একটা মানুষ, একটা নীরব ঘর, একটু আত্মসংযম, একটু ধ্যান, একটু বিবেক, আর একটা সত্যিকারের প্রশ্নই যথেষ্ট। “আমি কেমন মানুষ?” এই প্রশ্নটা যদি মানুষ প্রতিদিন নিজেকে করতে পারে, তাইলে পৃথিবীর অনেক ধর্মীয় অনুষ্ঠান অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। কারণ ধর্মের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মসজিদে, মন্দিরে, গির্জায় কিংবা কোনো ধর্মীয় মঞ্চে হয় না।

ধর্মের পরীক্ষা হয় বাজারে। আপনি দুর্বল মানুষকে ঠকালেন কি না। আপনি ক্ষমতা পেয়ে অন্যায় করলেন কি না। আপনি ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দিলেন কি না। আপনি নিজের চেয়ে ছোট মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করলেন কি না। আপনি একা ঘরে থাকলে যেমন, মানুষের সামনে তেমন কি না। এইখানেই আসল ধর্ম। বাকি অনেক কিছুই সাজসজ্জা।

আর সাজসজ্জার ব্যবসা খুব ভালো ব্যবসা। এখানে পণ্য অদৃশ্য, ক্রেতা আবেগপ্রবণ, আর বিক্রেতা আত্মবিশ্বাসী। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ঈশ্বরের নামে ব্যবসা করতে গেলে ঈশ্বরের কোনো অংশীদারিত্ব লাগে না। ঈশ্বর কোনো কমিশন চান কি না, সেটাও জানা যায় না। তিনি হিসাবের খাতা দেখেন কি না, তাও জানা যায় না। কিন্তু মানুষ তাঁর নামে হিসাব করে। আর সেই হিসাবের টাকা দিয়ে দালান ওঠে, অনুষ্ঠান হয়, মাইক বাজে, ভোজ হয়, প্রচার হয়, প্রতিষ্ঠা হয়। অর্থাৎ ঈশ্বর নীরব, কিন্তু তাঁর ব্যবসা বেশ সরব।

তাই যদি সত্যিই ঈশ্বরকে ভালোবাসেন, একটু নীরব হন। একটু একা বসেন। চোখ বন্ধ করেন। নিজের ভেতরে যান। যদি পরমাত্মা থাকেন, তাঁকে সেখানে খুঁজে দেখেন। হয়তো আশ্চর্য হইয়া দেখবেন, এতদিন যাঁরে খুঁজতে এত দূরে গেছেন, তিনি আপনার নিজের ভেতরেই বসে আছেন। তাঁর কোনো দানবাক্স নাই। কোনো চাঁদার খাতা নাই। কোনো প্রবেশমূল্য নাই। কোনো ভিআইপি পাস নাই। কোনো মাইক নাই। কোনো প্যান্ডেল নাই। শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার মধ্যে মানুষ আর পরমাত্মার একান্ত আলাপ।

তাই ভিক্ষাটা বন্ধ করেন। মানুষ যদি সত্যিই ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে হয়তো ঈশ্বর কোথাও যাবেন না। কিন্তু ঈশ্বরের নামে যেইসব গড সার্ভিসিং হোম বছরের পর বছর মানুষের আবেগ আর দান খয়রাতের উপর টিকে আছে, তাদের অনেকগুলোর সার্ভিস হয়তো সত্যিই বন্ধ হইয়া যাবে। আর তখন হয়তো ধর্মের দোকানদাররা প্রথমবার বুঝবে, ঈশ্বরকে ভালোবাসার জন্য দোকান লাগে না। ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার জন্য কাউন্টার লাগে না। আর পরমাত্মার সঙ্গে দেখা করার জন্য দালালও লাগে না।

মানুষ যদি নিজের অন্তরে সত্যিই একবার প্রবেশ করতে পারে, তাহলে ধর্মের সবচেয়ে বড় মন্দির, সবচেয়ে বড় মসজিদ, সবচেয়ে বড় গির্জা, সবচেয়ে বড় আশ্রম সবই তার নিজের ভেতরে। বাকি সবকিছু? সেটা অনেক সময় মানুষের বানানো স্থাপত্য। আর স্থাপত্যের বিল দিতে হয় মানুষকেই, ঈশ্বরকে নয়।

প্রদ্যোত