সন্দেহের অন্ধকারে অমূল্যের নির্বাসন
মানুষের জীবনে সব শূন্যতা বাইরের কোনো দুর্যোগ থেকে জন্ম নেয় না; কিছু শূন্যতা মানুষ নিজেই নিজের চেতনার ভিতরে নির্মাণ করে। জীবনের অমূল্য প্রাপ্তিগুলো তখন তার চোখে আর প্রাপ্তি থাকে না, হয়ে ওঠে সন্দেহের বিষয়। যে ভালোবাসা নিঃশব্দে আশ্রয় দিতে এসেছিল, তার মধ্যে সে স্বার্থের হিসাব খোঁজে; যে বিশ্বাস দীর্ঘদিনের আচরণে নিজেকে প্রমাণ করেছে, তার মধ্যেও সে অদৃশ্য ভাঙনের শব্দ শুনতে পায়; যে সুযোগ তার সামনে ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেয়, তার ভেতরেও সে প্রতারণার সম্ভাবনা আবিষ্কার করে। এভাবে বাস্তবতার ওপর যখন সন্দেহের আবরণ জমতে থাকে, তখন সত্যের কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও সত্যের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। অমূল্য জিনিসটি মূল্য হারায় না, মূল্যবোধের চোখটিই ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যায়।
সন্দেহের স্বভাব বড় সূক্ষ্ম। সে কখনো ঝড়ের মতো এসে জীবনকে ভেঙে দেয় না; বরং দেয়ালের ভেতর সাদা পিঁপড়ের মতো নিঃশব্দে কাঠামো ক্ষয় করে। প্রথমে সে একটি প্রশ্ন তোলে, তারপর সেই প্রশ্নের চারপাশে একটি অনুমান গড়ে ওঠে, অনুমান ক্রমে বিশ্বাসের রূপ নেয়, আর একদিন মানুষ নিজের নির্মিত বিশ্বাসকেই বাস্তবতার চূড়ান্ত সত্য বলে গ্রহণ করে। তখন প্রমাণের প্রয়োজন থাকে না, কারণ সন্দেহ নিজেই নিজের সাক্ষী হয়ে যায়। একটি নীরবতা হয়ে ওঠে গোপন অভিসন্ধির সংকেত, একটি বিলম্ব হয়ে ওঠে অবহেলার প্রমাণ, একটি অসম্পূর্ণ বাক্য হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ অভিযোগ। মানুষ তখন সত্যকে অনুসরণ করে না, নিজের আশঙ্কার পদচিহ্ন অনুসরণ করে বাস্তবতার কাছে পৌঁছাতে চায়। অথচ আশঙ্কা কখনো বাস্তবতার বিকল্প নয়।
এই মানসিক প্রবণতার শিকড় অনেক সময় বর্তমানের চেয়ে অতীতে গভীরভাবে প্রোথিত থাকে। কোনো একদিন বিশ্বাস ভেঙেছে, কোনো এক সম্পর্ক প্রতারণায় শেষ হয়েছে, কোনো স্বপ্ন আকস্মিক আঘাতে ভস্ম হয়েছে; সেই অভিজ্ঞতা যদি চেতনার মধ্যে যথাযথভাবে পরিশোধিত না হয়, তবে মানুষ ভবিষ্যতের প্রতিটি সম্ভাবনাকে অতীতের পুনরাবৃত্তি বলে ভাবতে শুরু করে। তখন নতুন মানুষকে সে পুরোনো মানুষের অপরাধে বিচার করে, নতুন সম্পর্ককে পুরোনো সম্পর্কের ব্যর্থতার দায় বহন করায়, নতুন সুযোগকে পুরোনো ব্যর্থতার ছায়ায় মেপে দেখে। অতীত তখন আর স্মৃতি থাকে না, হয়ে ওঠে বর্তমানের ওপর বসানো এক অদৃশ্য ছাঁচ। ফলে যে মানুষটি আজ সত্য নিয়ে সামনে এসেছে, তাকেও এমন এক ইতিহাসের জবাবদিহি করতে হয়, যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ ভাবে, সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে; প্রকৃতপক্ষে অনেক সময় সে অভিজ্ঞতার ভেতরেই বন্দী হয়ে থাকে।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বন্দিত্ব সবচেয়ে নির্মম। ভালোবাসা কোনো হিসাবের খাতা নয়, যেখানে প্রতিটি অনুভূতির পাশে কারণ এবং প্রতিটি আচরণের পাশে ব্যাখ্যা লিখে রাখতে হয়। অথচ সন্দেহপ্রবণ মন ভালোবাসাকেও ক্রমাগত জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে রাখে। কেন এত যত্ন, কেন আজ এত নীরবতা, কেন এই কথাটি, কেন ওই অনুপস্থিতি, কেন এই পরিবর্তন? প্রশ্নের এই অবিরাম প্রবাহ একসময় ভালোবাসার স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করে দেয়। যে মানুষটি ভালোবাসত, সে অনুভব করে তার ভালোবাসা গ্রহণ করা হচ্ছে না, পরীক্ষা করা হচ্ছে; তার উপস্থিতি উপভোগ করা হচ্ছে না, তার উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তখন সম্পর্কের উষ্ণতা ধীরে ধীরে আত্মপক্ষসমর্থনের ক্লান্তিতে নিভে যায়। সবচেয়ে করুণ হলো, সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়ার পরে সন্দেহপ্রবণ মানুষটি প্রায়ই নিজের পূর্বধারণাকেই সত্য বলে মনে করে; সে দেখে মানুষটি চলে গেছে, কিন্তু দেখতে পায় না যে অবিশ্বাসের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে মানুষটি বহু আগেই অন্তর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।
আত্মসন্দেহ এই একই বিষকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। বাইরের মানুষ যেখানে একজনের সম্ভাবনা দেখতে পায়, সে নিজে সেখানে নিজের অযোগ্যতার হিসাব খুঁজে বেড়ায়। প্রশংসা তার কাছে অতিরঞ্জন, সুযোগ তার কাছে দুর্ঘটনা, সাফল্য তার কাছে সাময়িক এবং স্বীকৃতি তার কাছে ভুল বিচার বলে মনে হয়। ফলে মানুষ নিজের হাতে পাওয়া সম্ভাবনাকেও অবিশ্বাস করতে করতে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে ব্যর্থতার ভয় তাকে সাফল্যের পথেই পা রাখতে দেয় না। তার ভেতরে যেন একজন অদৃশ্য প্রহরী বসে থাকে, যে প্রতিটি স্বপ্নের দরজা খোলার আগে বলে ওঠে, “তুমি কি সত্যিই এর যোগ্য?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই অনেক জীবন নিজের সম্ভাবনার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। তখন বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতার চেয়ে অন্তর্গত অবিশ্বাসই হয়ে ওঠে তার বৃহত্তম পরাজয়।
তবে সন্দেহকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও জ্ঞান নয়। মানুষকে প্রশ্ন করতে হবে, যাচাই করতে হবে, প্রতারণা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু সত্য অনুসন্ধানের সংশয় এবং চেতনাগ্রাসী সন্দেহ এক নয়। সংশয় বলে, “আমি জানি না, তাই জানতে চাই”; অসুস্থ সন্দেহ বলে, “আমি জানি কিছু একটা ভুল, এখন শুধু তার প্রমাণ চাই।” প্রথমটি জ্ঞানের দিকে এগোয়, দ্বিতীয়টি পূর্বধারণাকে শক্ত করে। প্রথমটি দরজা খুলে বাইরে দেখে, দ্বিতীয়টি জানালা বন্ধ করে নিজের ঘরের অন্ধকারকেই বাইরের পৃথিবীর রং বলে ঘোষণা করে। তাই বিবেচনাশীল মানুষ বিশ্বাস ও সংশয়ের মধ্যে একটি সুস্থ দূরত্ব রাখে; সে কাউকে অন্ধভাবে গ্রহণ করে না, আবার অকারণে প্রত্যাখ্যানও করে না। তার বিচার প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়, ভয় বা কল্পনার ওপর নয়।
বাস্তব পৃথিবীতে প্রতারণা আছে বলেই সর্বত্র প্রতারণা নেই। মানুষের মধ্যে স্বার্থ আছে বলেই প্রতিটি ভালোবাসা স্বার্থপর নয়। কোনো সম্পর্ক ভেঙেছে বলেই সম্পর্ক নামের সত্যটি মিথ্যা হয়ে যায় না। বরং জীবনের পরিণত বোধ মানুষকে শেখায়, পৃথিবীকে তার সমগ্রতায় দেখতে হয়। আলো এবং অন্ধকার পাশাপাশি থাকে বলেই সূর্যকে অস্বীকার করা যায় না। মানুষ অসম্পূর্ণ বলেই তার আন্তরিকতাকে বাতিল করা যায় না। একটি ভুল একটি মানুষের সমগ্র চরিত্রের রায় নয়, যেমন একটি ব্যর্থতা একটি জীবনের সমস্ত সম্ভাবনার মৃত্যু নয়। বাস্তবতার প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে মানুষকে বিচ্ছিন্ন মুহূর্তের বদলে ধারাবাহিকতার দিকে তাকাতে হয়।
অমূল্য প্রাপ্তির অবমূল্যায়নের আরেকটি কারণ হলো অভ্যাস। যে মানুষ প্রতিদিন পাশে থাকে, তার উপস্থিতি একসময় এত স্বাভাবিক হয়ে যায় যে তার অসাধারণত্ব চোখে পড়ে না। যে হাত প্রতিদিন আশ্রয় দেয়, তার উষ্ণতা আমরা অনেক সময় অনুভব করি না; যে মানুষ প্রতিকূল দিনে পাশে দাঁড়ায়, তার উপস্থিতিকে আমরা জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম বলে ধরে নিই। কিন্তু জীবন কোনো কিছুর স্থায়িত্বের নিশ্চয়তাপত্র দেয় না। সময় তার নিজের নিয়মে মানুষকে দূরে সরায়, সুযোগের দরজা বন্ধ করে, পরিচিত কণ্ঠকে নীরবতায় পাঠায়। তখন অনুপস্থিতি এসে উপস্থিতির প্রকৃত মূল্য প্রকাশ করে। কিন্তু হারানোর পরে যে উপলব্ধি আসে, তার মধ্যে জ্ঞানের পাশাপাশি অনুতাপও থাকে; কারণ তখন মূল্য বোঝা গেলেও অনেক সময় মূল্যবানটিকে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা আর থাকে না।
এই কারণেই কৃতজ্ঞতা কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়, এটি এক ধরনের চেতনার স্বচ্ছতা। কৃতজ্ঞ মানুষ প্রাপ্তিকে স্বাভাবিক বলে অবজ্ঞা করে না; সে জানে, জীবনের বড় সম্পদগুলো অনেক সময় নিঃশব্দে আসে। একটি আন্তরিক সম্পর্ক, একটি নির্ভরযোগ্য মানুষ, একটি সুযোগ, একটি সুস্থ সকাল, সৃষ্টির সামান্য অবকাশ, নিজের প্রতিভাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা, কিংবা বিপদের মধ্যে একটি আশ্বাসের বাক্য, এসবের কোনো বাজারমূল্য নেই, অথচ এগুলোর অনুপস্থিতিতে মানুষের সমগ্র জীবন নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে। যে চোখ মূল্য বুঝতে শেখে, তার কাছে সামান্যও গভীর হয়ে ওঠে; আর যে চোখ সন্দেহে অভ্যস্ত, তার কাছে প্রাচুর্যও অপূর্ণ মনে হয়।
এখানেই মানুষের চেতনার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে। সে পৃথিবীকে হারানোর আগেই তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। তার হাতে সম্পর্ক থাকে, কিন্তু সম্পর্কের প্রতি আস্থা থাকে না; সুযোগ থাকে, কিন্তু গ্রহণের সাহস থাকে না; ভালোবাসা থাকে, কিন্তু তা অনুভব করার নিশ্চিন্ততা থাকে না। ধীরে ধীরে সে নিজের চারপাশের জীবন্ত জগতকে মানসিকভাবে নির্বাসিত করতে থাকে। শেষে যখন চারদিকে নীরবতা জমে, তখন সে সেই নীরবতার কারণ খোঁজে পৃথিবীতে। অথচ শূন্যতা বাইরে থেকে এসে তাকে গ্রাস করেনি; সে নিজেই একে একে তার জীবনের সম্ভাবনাগুলোর দরজা বন্ধ করেছে।
শূন্যতা কখনো কখনো তাই অনুপস্থিতির ফল নয়, ভুল দৃষ্টির ফল। মানুষ যদি প্রতিটি আলোকে আগুন ভেবে পিছিয়ে যায়, তবে তার অন্ধকারের জন্য সূর্য দায়ী নয়। যদি প্রতিটি সেতুকে ফাঁদ মনে করে নদীর দুই পারে একা দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার বিচ্ছিন্নতার জন্য নদী দায়ী নয়। যদি প্রতিটি মানুষের হাতে লুকানো অস্ত্র খুঁজতে থাকে, তবে একদিন তার হাত ধরার মতো হাত না থাকার জন্য পৃথিবীকে অভিযুক্ত করারও কোনো নৈতিক অধিকার তার থাকে না। জীবন তাকে প্রতিদিন কিছু না কিছু দিয়ে যায়; মানুষ কখনো কখনো তার মূল্য না বুঝে সেগুলোকে নিজের সন্দেহের জাদুঘরে মৃত বস্তুতে পরিণত করে।
তাই আত্মজাগরণের প্রথম কাজ সন্দেহকে নির্বংশ করা নয়, সন্দেহের উৎসকে চিনে নেওয়া। আমি কেন অবিশ্বাস করছি, আমার এই আশঙ্কার পেছনে কি বর্তমানের কোনো সত্য আছে, নাকি অতীতের কোনো ক্ষত এখনো কথা বলছে, আমি কি সত্য জানতে চাই, নাকি নিজের ভয়কে সত্য প্রমাণ করতে চাই, এই প্রশ্নগুলোই মানুষকে নিজের ভেতরের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কারণ বাইরের পৃথিবীকে সংশোধন করার আগে নিজের দেখার পদ্ধতিকে সংশোধন করা জরুরি। দৃষ্টি যদি বিকৃত হয়, তবে স্বচ্ছ আয়নাতেও মুখ বিকৃত দেখাবে।
পরিণত চেতনা তাই অন্ধ বিশ্বাসের বিপরীত, কিন্তু অন্ধ অবিশ্বাসেরও বিপরীত। সে জানে, বিশ্বাসের সঙ্গে বিবেচনা থাকতে হয়, আবার বিবেচনার সঙ্গে মানবিকতারও স্থান থাকতে হয়। সে প্রশ্ন করে, কিন্তু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য; সে সতর্ক থাকে, কিন্তু হৃদয়ের সব দরজা বন্ধ করে নয়; সে মানুষকে বিচার করে, কিন্তু একটি মুহূর্তের ছায়া দিয়ে তার সমগ্র অস্তিত্বকে মুছে দেয় না। তার কাছে জীবন কোনো নিখুঁত নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নয়; বরং অনিশ্চয়তার মধ্যেও সত্য, সৌন্দর্য ও মানবিকতার সম্ভাবনাকে চিনে নেওয়ার এক অবিরাম সাধনা।
শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত দারিদ্র্য অনেক সময় প্রাপ্তির অভাবে নয়, প্রাপ্তির মূল্যবোধের অভাবে। যার হাতে অল্প অথচ চোখে কৃতজ্ঞতা, সে গভীরভাবে সমৃদ্ধ; আর যার চারপাশে প্রাচুর্য অথচ চেতনায় অবিশ্বাস, সে নিজের সম্পদের মধ্যেই নিঃস্ব। কারণ সম্পদ কেবল যা আমাদের কাছে আছে তা নয়, যা আছে তার অর্থ উপলব্ধি করার ক্ষমতাও সম্পদের অংশ। সন্দেহ সেই উপলব্ধির ওপর ধুলো জমায়; কৃতজ্ঞতা সেই ধুলো সরিয়ে দেয়।
সুতরাং জীবনের দিকে তাকানোর আগে নিজের চোখের দিকে তাকানো প্রয়োজন। যে চোখ অতীতের ক্ষত দিয়ে বর্তমানকে মাপে, সে বর্তমানকে কখনো তার নিজস্ব আলোয় দেখতে পাবে না। যে মন প্রতিটি প্রাপ্তির মধ্যে সম্ভাব্য ক্ষতি খোঁজে, সে প্রাপ্তির আনন্দে পৌঁছাতে পারবে না। আর যে মানুষ প্রতিটি ভালোবাসার সামনে প্রমাণের পাহাড় দাঁড় করায়, একদিন সেই পাহাড়ের ওপারেই হয়তো দাঁড়িয়ে থাকবে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি, কিন্তু দুজনের মধ্যে আর কোনো পথ থাকবে না।
অমূল্য প্রাপ্তি হারিয়ে যাওয়ার পরে তার মূল্য আবিষ্কার করা জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অনুতাপগুলোর একটি। কারণ তখন উপলব্ধি ফিরে আসে, কিন্তু সময় ফিরে আসে না; ভালোবাসার সত্য বোঝা যায়, কিন্তু মানুষটি হয়তো আর থাকে না; সুযোগের মাহাত্ম্য ধরা পড়ে, কিন্তু দরজাটি ইতিমধ্যে বন্ধ; নিজের আলোকে চিনতে শেখা যায়, কিন্তু জীবনের অনেকটা পথ হয়তো অন্ধকারেই পেরিয়ে গেছে।
তাই চেতনার সত্যিকারের জাগরণ হলো প্রাপ্তির মধ্যেই তার অমূল্যতা অনুভব করা। সন্দেহকে প্রশ্ন করা, কিন্তু সত্যকে নয়; মানুষকে যাচাই করা, কিন্তু ভালোবাসার সম্ভাবনাকে নয়; নিজের সীমা জানা, কিন্তু নিজের সম্ভাবনাকে নির্বাসিত না করা। কারণ জীবন আমাদের হাতে সবসময় অমৃত তুলে দেয় না, কিন্তু যখন দেয়, তখন তাকে বিষ ভেবে ফেলে দেওয়ার মতো দুর্ভাগ্য আর নেই।
সন্দেহপ্রবণ মানুষ অমূল্য প্রাপ্তিকেও নিমেষে মূল্যহীন বিবেচনায় অবজ্ঞার আঁধারে নির্বাসিত করে; তারপর যে শূন্যতা তার চারপাশে জন্ম নেয়, তাকে সে নিয়তি বলে ভুল করে। অথচ অনেক শূন্যতার জন্মদাতা কোনো নিষ্ঠুর ভাগ্য নয়, মানুষের নিজের অবিশ্বাস। অমূল্য হারানোর আগে তাকে চিনে নেওয়াই তাই প্রজ্ঞা, আর প্রাপ্তির ভেতর তার মহিমা অনুভব করাই চেতনার পরিণত আলো।
প্রদ্যোত