← Back to writing

ধর্ম, না কি পালানোর ফ্যান্টাসি?

ধর্ম, না কি পালানোর ফ্যান্টাসি?

কর্মবিমুখ ও জ্ঞানবিমুখ মানুষের কাছে ধর্ম কখনো কখনো বিশ্বাসের আলো নয়, বরং বাস্তবতা থেকে পালিয়ে থাকার এক আরামদায়ক ফ্যান্টাসি হয়ে ওঠে। যেখানে শ্রমের পরিবর্তে প্রার্থনা, অনুসন্ধানের পরিবর্তে অন্ধবিশ্বাস, আত্মসমালোচনার পরিবর্তে ভাগ্য, আর নৈতিক দায়িত্বের পরিবর্তে ঈশ্বরের ইচ্ছাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে ধর্ম আর মানুষের চেতনাকে প্রসারিত করে না, বরং তার অক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার আশ্রয় হয়ে ওঠে। অবশ্য ধর্ম নিজে এই প্রবণতার সমার্থক নয়; মানুষের মানসিক দুর্বলতা ধর্মের ভাষা ধার করে যখন নিজের সুবিধাকে পবিত্রতার পোশাক পরায়, তখনই সমস্যার সূত্রপাত।

জ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, আর সত্যিকারের প্রশ্ন মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ালে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে হয়, প্রচলিত ধারণাকে পরীক্ষা করতে হয়, ভুল বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে হয় এবং কখনো কখনো নিজের দীর্ঘদিনের স্বার্থকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়। তাই যে মন প্রশ্নের শ্রমে যেতে চায় না, সে উত্তর খোঁজে না; সে এমন একটি বিশ্বাস খোঁজে, যা তাকে প্রশ্নের দায় থেকে মুক্তি দেবে। এখানেই অন্ধবিশ্বাসের জন্ম। বিশ্বাস তখন আর আত্মার অনুসন্ধান থাকে না, হয়ে ওঠে চিন্তার অবসর গ্রহণ।

কর্মবিমুখতারও নিজস্ব মনস্তত্ত্ব আছে। কাজ মানে দায়িত্ব, দায়িত্ব মানে ব্যর্থতার সম্ভাবনা, আর ব্যর্থতার সম্ভাবনা মানে নিজের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়া। তাই যে মানুষ কর্মের ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, সে অনেক সময় ফলাফলকে ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করে মানসিক স্বস্তি লাভ করে। সে বলতে পারে, “যা হওয়ার তা হবেই।” বাক্যটি কখনো গভীর দর্শন হতে পারে, কিন্তু কর্ম এড়ানোর অজুহাত হিসেবেও এটি ভয়ংকর কার্যকর। কারণ বাস্তবতার নির্মাণে মানুষের ভূমিকা অস্বীকার করে ভাগ্যকে সর্বময় কর্তা বানিয়ে দিলে নিজের কোনো ব্যর্থতার হিসাব দিতে হয় না।

লোভী মানুষের ধর্মচর্চাতেও একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব থাকে। সে প্রায়ই ঈশ্বরকে ভালোবাসার চেয়ে ঈশ্বরের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনাকে বেশি ভালোবাসে। তার প্রার্থনা হয়ে ওঠে লেনদেনের ভাষা, পুণ্য হয়ে ওঠে বিনিয়োগ, দান হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ লাভের বিমা। সে চায় সম্পদ, ক্ষমতা, নিরাপত্তা, সাফল্য, প্রতিপত্তি, এমনকি প্রতিপক্ষের পতনও; তারপর নিজের আকাঙ্ক্ষাগুলোর ওপর পবিত্রতার আবরণ চাপিয়ে তাকে ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ নৈতিকতার প্রথম পরীক্ষা হলো, আমি কী চাই তার চেয়ে আমি কীভাবে চাই এবং সেই চাওয়ার পথে অন্য মানুষের অধিকার কতটা অক্ষুণ্ণ রাখছি।

ভীরু মানুষও ধর্মের মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পেতে পারে, বিশেষত যখন ধর্মকে আত্মশক্তির পরিবর্তে অলৌকিক রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অজানা ভবিষ্যৎ, মৃত্যু, রোগ, বিপর্যয়, সামাজিক অনিশ্চয়তা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার সামনে দাঁড়ানোর সাহস না থাকলে মানুষ এমন এক শক্তির কল্পনা করতে পারে, যে তার হয়ে সবকিছু সামলে দেবে। এই মানসিক আশ্রয় সাময়িক সান্ত্বনা দিতে পারে, কিন্তু যদি তা মানুষকে বাস্তব সমস্যার মোকাবিলা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে সান্ত্বনা ধীরে ধীরে আত্মপ্রতারণায় পরিণত হয়। কারণ প্রার্থনা যদি হাতকে কর্মহীন করে, বিশ্বাস যদি মস্তিষ্ককে প্রশ্নহীন করে এবং ধর্ম যদি বিবেককে নিষ্ক্রিয় করে, তবে সেখানে আধ্যাত্মিকতা যতই থাকুক, মানবিক পরিণতি শুভ হয় না।

সত্যিকারের ধর্মের শক্তি সম্ভবত এখানেই যে তা মানুষকে নিজের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সে জিজ্ঞেস করে, আমি কেমন মানুষ? আমার কর্মের মধ্যে কতটা সততা আছে? আমার জ্ঞানের সীমা কোথায়? আমার লোভ কোথায় আমাকে অন্ধ করছে? আমার ভয় কোথায় আমাকে কাপুরুষ করে তুলছে? অন্যের প্রতি আমার আচরণে কতটা ন্যায় আছে? এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু মানুষের বিবেক জাগে অস্বস্তির মধ্য দিয়েই। যে ধর্ম এই আত্মজিজ্ঞাসা তৈরি করে, সে মানুষকে দুর্বল করে না; বরং তাকে নিজের দায়িত্বের সামনে দাঁড় করায়।

তাই ধর্মকে বিচার করার একটি বাস্তব মাপকাঠি হতে পারে মানুষের জীবনযাত্রায় তার ফল। কোনো বিশ্বাস যদি মানুষকে অধিক সত্যবাদী, জ্ঞানান্বেষী, পরিশ্রমী, সহনশীল, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল করে, তবে সেই বিশ্বাস তার মানবিকতাকে সমৃদ্ধ করছে। বিপরীতে কোনো বিশ্বাস যদি তাকে অলস, অসহিষ্ণু, প্রশ্নভীত, লোভী, কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিংবা অন্যের প্রতি নিষ্ঠুর করে তোলে, তবে সেখানে বিশ্বাসের পবিত্রতার দাবি যতই উচ্চকণ্ঠ হোক, তার ফলাফলকে প্রশ্ন করতেই হবে। কারণ মানুষের মুখের ধর্মীয় পরিচয় নয়, তার কর্মই তার বিশ্বাসের প্রকৃত ব্যাখ্যা।

সভ্যতার অগ্রগতি কখনো কেবল প্রার্থনার শক্তিতে ঘটেনি। মানুষের জিজ্ঞাসা বিজ্ঞান সৃষ্টি করেছে, শ্রম সমাজ নির্মাণ করেছে, যুক্তি কুসংস্কার ভেঙেছে, নৈতিকতা আইনকে মানবিক করেছে এবং সাহস অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করিয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস কোনো ব্যক্তির অন্তর্জগতে অর্থ ও সান্ত্বনা দিতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর বাস্তব সমস্যার সমাধানে জ্ঞান, সংগঠিত কর্ম, নৈতিক সিদ্ধান্ত এবং প্রমাণভিত্তিক চিন্তার বিকল্প নেই। ক্ষুধার্ত মানুষকে খাদ্য দিতে হয়, অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দিতে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান গড়তে হয়, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে শিক্ষা ছড়াতে হয়। সেখানে শুধু প্রার্থনা যথেষ্ট নয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থাটি তৈরি হয় তখন, যখন মানুষ নিজের দুর্বলতাকে ধর্মীয় মহিমায় উন্নীত করে। সে অলস, কিন্তু বলে ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করি; সে অজ্ঞ, কিন্তু বলে বিশ্বাসই যথেষ্ট; সে লোভী, কিন্তু বলে ঈশ্বর আমাকে সমৃদ্ধ করুন; সে ভীরু, কিন্তু বলে সব ঈশ্বরের হাতে; সে অন্যায় করে, তারপর পাপমোচনের আশ্বাসে নিজের বিবেককে ঘুম পাড়ায়। এভাবে ধর্ম মানুষের আত্মশুদ্ধির আয়না না হয়ে আত্মপ্রবঞ্চনার পর্দা হয়ে ওঠে। তখন ঈশ্বরের প্রয়োজন হয় না মানুষের চরিত্র বদলানোর জন্য; বরং মানুষের চরিত্র অপরিবর্তিত রাখার জন্যই ঈশ্বরের নাম ব্যবহৃত হয়।

মানুষের মুক্তি তাই বিশ্বাসের পরিমাণে নয়, চেতনার গভীরতায়। প্রশ্ন করতে শেখা, না জানাকে স্বীকার করা, সত্যের সামনে নিজের অহংকে সরিয়ে রাখা, ভুল হলে সংশোধন করা, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা এবং নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করা, এগুলোই জাগ্রত মানুষের লক্ষণ। ধর্ম যদি এই মানুষটিকে নির্মাণ করে, তবে ধর্ম মানবতার সহযাত্রী। আর ধর্ম যদি মানুষকে বাস্তবতা থেকে পালানোর নেশা দেয়, তবে সেটি যত পবিত্র নামেই পরিচিত হোক, তার ভেতরে ফ্যান্টাসির অন্ধকার কাজ করছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ধর্ম আছে কি নেই, তা নয়; প্রশ্ন হলো ধর্ম মানুষকে কী বানাচ্ছে। সে কি তাকে আরও মানবিক করছে, নাকি আরও অমানবিক? সে কি তার চোখ খুলছে, নাকি চোখ বুজিয়ে দিচ্ছে? সে কি তাকে কর্মে আহ্বান করছে, নাকি কর্ম থেকে অব্যাহতি দিচ্ছে? সে কি তাকে সত্যের সামনে দাঁড় করাচ্ছে, নাকি আরামদায়ক মিথ্যার মধ্যে আশ্রয় দিচ্ছে? যে মুহূর্তে মানুষ এই প্রশ্নগুলো করতে শেখে, সেই মুহূর্তেই তার ভেতরের বিবেক জেগে ওঠে। আর জাগ্রত বিবেকের সামনে কোনো অন্ধবিশ্বাস, কোনো অলসতা, কোনো লোভ কিংবা কোনো ভয় চিরকাল পবিত্রতার মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

প্রদ‍্যোত