← Back to writing

ঈশ্বরের বাজেট, মানুষের বুদ্ধি

ঈশ্বরের বাজেট, মানুষের বুদ্ধি

পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে একটু দূর থেকে তাকালে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। মানুষ একই সঙ্গে অসাধারণ বুদ্ধিমান এবং আশ্চর্য রকম অযৌক্তিক। যে মানুষ নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর হিসাব করতে পারে, যে মানুষ মহাকাশযানকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে পাঠিয়ে তার কাছ থেকে তথ্য ফিরিয়ে আনতে পারে, যে মানুষ কোষের ভেতরের জিনগত সংকেত পড়তে পারে, যে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করে নিজের চিন্তারই একটি যান্ত্রিক প্রতিরূপ নির্মাণ করতে পারে, সেই মানুষই আবার নিজের অজানা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করার আশায় হাজার হাজার বছর ধরে অলৌকিকতার বাজারে বিনিয়োগ করে এসেছে। পৃথিবীতে অসংখ্য ধর্ম, অগণিত সম্প্রদায়, অসংখ্য দেবদেবী, নবী, অবতার, সাধু, গুরু, পীর, আধ্যাত্মিক মধ্যস্থতাকারী এবং তাদের ঘিরে নির্মিত বিপুল সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস, আচার, উপাসনালয়, উৎসব, আনুষ্ঠানিকতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে। ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার, কিন্তু প্রশ্নটি সেখানে নয়। প্রশ্নটি হলো, মানবসভ্যতা তার সীমিত অর্থ, শ্রম, সময়, মেধা এবং সামাজিক শক্তির কত অংশ অদৃশ্য জগতের অনুমানকে সন্তুষ্ট করার জন্য ব্যয় করে এবং কত অংশ দৃশ্যমান পৃথিবীকে বোঝা, নির্মাণ করা ও উন্নত করার জন্য ব্যয় করে। এই প্রশ্নটি ধর্মবিরোধী নয়, বরং সভ্যতাবিষয়ক। কারণ মানুষ যদি পৃথিবীর দারিদ্র্য, রোগ, অশিক্ষা, ক্ষুধা, বেকারত্ব, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং সামাজিক অবিচারের সমাধানের চেয়ে পরকালের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে তার সভ্যতার অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নের উত্তর দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হতে পারে; কিন্তু মানুষের অজ্ঞতার অস্তিত্ব একটি বাস্তবতা, ক্ষুধার অস্তিত্ব একটি বাস্তবতা, রোগের অস্তিত্ব একটি বাস্তবতা, উৎপাদনহীনতার অস্তিত্ব একটি বাস্তবতা। সুতরাং একটি সভ্যতার প্রথম নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধান সৃষ্টি করা।

মানুষের ইতিহাসে উপাসনালয় নির্মাণের জন্য যে বিপুল স্থাপত্য, শ্রম, অর্থ ও শিল্পশক্তি ব্যয় হয়েছে, তার অনেকটাই নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় স্থাপত্য, সংগীত, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সাহিত্য ও দর্শন মানব সংস্কৃতির বিরাট অংশকে সমৃদ্ধ করেছে। অতএব সব ধর্মীয় ব্যয়কে অন্ধকার বা অপচয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অপরিণত, তেমনি ধর্মীয় আবেগের নামে জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান ও উৎপাদনশীলতাকে অবহেলা করাও সভ্যতার জন্য বিপজ্জনক। প্রকৃত সমস্যাটি হলো ভারসাম্যের অভাব। যখন একটি সমাজে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে উপাসনালয়ের গম্বুজ, মিনার, শিখর বা অলংকার নির্মাণ করা সম্ভব হয়, কিন্তু একই সমাজে একটি আধুনিক গবেষণাগার নির্মাণের জন্য অর্থ পাওয়া যায় না, তখন প্রশ্নটি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নয়, সমাজের অগ্রাধিকারবোধের বিরুদ্ধে। যখন হাজার হাজার মানুষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমবেত হতে পারে, কিন্তু একটি বই পড়ার জন্য দশ মিনিট সময় বের করতে পারে না, তখন প্রশ্নটি প্রার্থনার বিরুদ্ধে নয়, চিন্তার অভ্যাসের বিরুদ্ধে। যখন একটি শিশুকে পরকালের পুরস্কার ও শাস্তির গল্প মুখস্থ করানো হয়, কিন্তু তাকে প্রশ্ন করতে, পরীক্ষা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো হয় না, তখন সমস্যা ধর্মবিশ্বাসে নয়, শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোতে। সভ্যতা তখনই বিপন্ন হয় যখন বিশ্বাস জ্ঞানের বিকল্প হয়ে ওঠে এবং কর্তৃত্ব প্রশ্নের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।

কারণ অজ্ঞ মানুষ শুধু নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তাকে অন্যের দ্বারা পরিচালিত করাও সহজ হয়। ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক আধিপত্যের পেছনে অস্ত্রের পাশাপাশি জ্ঞানের অসমতাও কাজ করেছে। যে জাতি প্রযুক্তি জানে, সে প্রযুক্তি বিক্রি করে; যে জাতি প্রযুক্তি বোঝে না, সে প্রযুক্তি কিনে। যে জাতি জ্ঞান উৎপাদন করে, সে নীতি নির্ধারণে প্রভাবশালী হয়; যে জাতি কেবল জ্ঞান আমদানি করে, সে অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়। যে সমাজ নিজের কৃষির প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, শিল্পপ্রযুক্তি, জ্বালানি ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং শিক্ষাব্যবস্থার জ্ঞান নিজে তৈরি করতে পারে না, সে যত ধর্মীয়ভাবে আবেগপ্রবণই হোক, অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল থাকবে। আর অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরনির্ভরতাও তৈরি করে। তখন উন্নত দেশ এসে শুধু পণ্য বিক্রি করে না, তারা জ্ঞান বিক্রি করে, প্রযুক্তি বিক্রি করে, বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো বিক্রি করে, এমনকি জীবনযাপনের স্বপ্নও বিক্রি করে। আমরা তাদের মোবাইল কিনি, সফটওয়্যার কিনি, ওষুধ কিনি, যন্ত্র কিনি, বিনোদন কিনি, শিক্ষা কিনি এবং কখনো কখনো তাদের তৈরি ধারণাগুলোকেও নিজেদের চিন্তা বলে গ্রহণ করি। মজার ব্যাপার হলো, আমরা যখন তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করি তখন গর্ব করি যে আমরা আধুনিক; কিন্তু সেই প্রযুক্তির পেছনে যে শত শত বছরের গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, গবেষণা, পরীক্ষাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, বই, বিতর্ক এবং প্রশ্ন করার সংস্কৃতি রয়েছে, তার জন্য নিজের সমাজে কতটা বিনিয়োগ করেছি, সেই হিসাবটি করতে চাই না।

আমাদের সভ্যতার একটি চমৎকার ব্যঙ্গাত্মক অভ্যাস হলো, আমরা ফল চাই কিন্তু শিকড়ে পানি দিতে চাই না। আমরা চাই উন্নত হাসপাতাল, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণায় অর্থ দিতে চাই না। আমরা চাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু গবেষণার পরিবেশ চাই না। আমরা চাই বিশ্বমানের প্রযুক্তি, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা চাই না। আমরা চাই সন্তান বিদেশে পড়ুক, কিন্তু দেশের স্কুলে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি করতে চাই না। আমরা চাই আমাদের তরুণরা বিশ্বজয় করুক, কিন্তু তাদের হাতে বইয়ের পরিবর্তে যদি কেবল পরীক্ষার গাইড তুলে দিই, তাহলে তারা সর্বোচ্চ পরীক্ষার্থী হতে পারে, চিন্তক হতে পারে না। আমরা চাই দেশ প্রযুক্তিনির্ভর হোক, অথচ প্রযুক্তি তৈরির বদলে প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যেই আধুনিকতার সংজ্ঞা খুঁজে নিই। একটি জাতি যখন প্রযুক্তির ভোক্তা হতে পেরে আনন্দিত হয় কিন্তু প্রযুক্তির নির্মাতা হতে চায় না, তখন তার আধুনিকতা অনেকটা এমন এক ব্যক্তির মতো, যে বিলাসবহুল গাড়িতে বসে নিজের দারিদ্র্যের ওপর বক্তৃতা দিচ্ছে।

আর এখানেই আসে উপাসনা বনাম জ্ঞানচর্চার আসল প্রশ্ন। উপাসনা যদি মানুষকে নৈতিক করে, সহানুভূতিশীল করে, সত্যবাদী করে, আত্মসংযমী করে এবং মানুষের কল্যাণে উদ্বুদ্ধ করে, তবে তার সামাজিক মূল্য আছে। কিন্তু উপাসনা যদি মানুষকে বাস্তবতা থেকে পালানোর পথ দেয়, প্রশ্ন থেকে দূরে রাখে, অন্যকে ঘৃণা করতে শেখায়, অন্ধ আনুগত্য তৈরি করে অথবা নিজের ব্যর্থতার কারণকে অলৌকিক শক্তির ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায়িত্ববোধ থেকে মুক্তি দেয়, তখন সেটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়। একইভাবে বিজ্ঞানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবিক নয়। বিজ্ঞান অস্ত্র তৈরি করতে পারে, নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে। তাই সমাধান কেবল ধর্মকে সরিয়ে বিজ্ঞান বসিয়ে দেওয়া নয়। মানুষের প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতা, নৈতিকতা এবং মানবিকতার সমন্বিত সংস্কৃতি। এমন মানুষ দরকার যে প্রার্থনা করতে পারে, কিন্তু প্রার্থনার পরেও নিজের কাজ নিজে করবে; যে বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্নও করতে পারে; যে ঐতিহ্যকে সম্মান করবে, কিন্তু ঐতিহ্যের ভুলকে ভুল বলার সাহসও রাখবে; যে ধর্মীয় পরিচয় বহন করবে, কিন্তু নিজের পরিচয়ের চেয়ে সত্যকে বড় মনে করবে। কারণ সত্য কোনো ধর্মের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

আজকের যুগে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ পৃথিবী এখন কেবল অজ্ঞতার সঙ্গে লড়ছে না, তথ্যের অতিরিক্ততার সঙ্গেও লড়ছে। একসময় অজ্ঞ মানুষ বই না পেয়ে অজ্ঞ থাকত; এখন মানুষ হাজার হাজার তথ্যের মাঝখানে থেকেও অজ্ঞ থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে এমন তথ্য দেখায় যা তার পূর্বধারণাকে শক্তিশালী করে। অ্যালগরিদম তার রাগকে পণ্য বানায়, তার ভয়কে বিজ্ঞাপন বানায়, তার বিশ্বাসকে বাজার বানায় এবং তার মনোযোগকে অর্থে রূপান্তরিত করে। ফলে একুশ শতকের অন্ধবিশ্বাস কেবল পুরোনো কুসংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন ডিজিটাল। ভুয়া চিকিৎসা, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, অলৌকিকতার ভিডিও, মিথ্যা ইতিহাস, ধর্মীয় উসকানি, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং বাণিজ্যিক প্রতারণা একই পর্দায় পাশাপাশি বসে মানুষের মনকে প্রভাবিত করছে। অতএব আজ জ্ঞানচর্চা মানে শুধু বই পড়া নয়। জ্ঞানচর্চা মানে তথ্য যাচাই করা, উৎস বিশ্লেষণ করা, পরিসংখ্যান বোঝা, যুক্তির ভুল শনাক্ত করা, প্রমাণের মান বিচার করা এবং নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও সত্যকে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি অর্জন করা। একুশ শতকের শিক্ষিত মানুষ সেই ব্যক্তি নয় যে সবচেয়ে বেশি তথ্য জানে; বরং সে, যে জানে কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোন তথ্য সন্দেহজনক এবং কোন তথ্য সম্পর্কে এখনো বলা সম্ভব নয়।

তাহলে বেরিয়ে আসার পথ কী? প্রথম কাজ হলো বিশ্বাস ধ্বংস করা নয়, অন্ধবিশ্বাসের ওপর জ্ঞানের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয় কাজ হলো উপাসনালয় বন্ধ করা নয়, সমাজের সম্পদ বণ্টনে জ্ঞান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উৎপাদনের যথার্থ অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা। তৃতীয় কাজ হলো ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা নয়, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, নৈতিক দর্শন ও তুলনামূলক সংস্কৃতির শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। চতুর্থ কাজ হলো শিশুকে উত্তর মুখস্থ করানোর বদলে প্রশ্ন করতে শেখানো। তাকে বলা দরকার, “তুমি প্রশ্ন করো, কারণ প্রশ্নই জ্ঞানের দরজা।” পঞ্চম কাজ হলো জাতীয় বাজেটে গবেষণাকে বিলাসিতা নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। ষষ্ঠ কাজ হলো গবেষক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, লেখক, উদ্ভাবক ও দক্ষ কারিগরকে সামাজিক মর্যাদা দেওয়া। যে সমাজে একজন কোটিপতি ব্যবসায়ীকে তার সম্পদের জন্য সম্মান করা হয় কিন্তু একজন গবেষককে তার জ্ঞানের জন্য যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয় না, সে সমাজের মূল্যবোধে কোথাও গুরুতর অসামঞ্জস্য রয়েছে। সপ্তম কাজ হলো উৎপাদনশীলতাকে সংস্কৃতির অংশ বানানো। কৃষককে শুধু খাদ্য উৎপাদক নয়, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির অংশীদার করতে হবে; কারিগরকে শুধু শ্রমিক নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতার বাহক হিসেবে দেখতে হবে; শিক্ষককে শুধু চাকরিজীবী নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাতা হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মানুষের ভেতরে একটি নতুন আত্মমর্যাদা তৈরি করা। সেই আত্মমর্যাদা যেন বলে, “আমি কারও অলৌকিক করুণার অপেক্ষায় বসে থাকব না; আমি জানব, শিখব, পরীক্ষা করব, সৃষ্টি করব।” একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি তখনই শুরু হয়, যখন তার মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে এবং প্রশ্ন করার জন্য অপরাধবোধে ভোগে না। যে শিশু আকাশ দেখে জিজ্ঞেস করে, “ওটা কী?” তাকে যদি বলা হয়, “চুপ করো, বড়রা যা বলেছে তাই সত্য,” তবে সেখানে কেবল একটি প্রশ্নকে হত্যা করা হয় না, একটি সম্ভাব্য বিজ্ঞানীকেও হত্যা করা হয়। কিন্তু সেই শিশুকে যদি বলা হয়, “চলো, আমরা একসঙ্গে খুঁজে দেখি,” তখনই সভ্যতার ভবিষ্যৎ জন্ম নেয়। মানুষের চূড়ান্ত কর্তব্য হয়তো ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করা নয়; বরং নিজের সম্ভাবনাকে অপচয় না করা। কারণ মানুষকে যদি একটি মস্তিষ্ক, একটি বিবেক, একটি কৌতূহল এবং একটি সীমিত জীবন দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেই জীবনকে কেবল পরকালের অজানা পুরস্কারের জন্য প্রস্তুত করতে করতে ইহকালের বাস্তব পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে ফেলা এক গভীর আত্মপ্রবঞ্চনা।

সুতরাং আমাদের প্রয়োজন ধর্মহীন পৃথিবী নয়, অন্ধত্বহীন পৃথিবী; বিশ্বাসহীন মানুষ নয়, প্রশ্ন করতে সক্ষম মানুষ; উপাসনাহীন সমাজ নয়, জ্ঞান ও মানবিকতার কাছে জবাবদিহি করা সমাজ। মন্দির থাকুক, মসজিদ থাকুক, গির্জা থাকুক, মঠ থাকুক, উপাসনার ঘণ্টা বাজুক, আজান উঠুক, প্রার্থনার শব্দ উঠুক, মানুষ তার বিশ্বাস পালন করুক। কিন্তু একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের দরজা আরও বড় হোক, গ্রন্থাগারের আলো আরও উজ্জ্বল হোক, গবেষণাগারের দরজা আরও প্রশস্ত হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা আরও গভীর হোক, বিজ্ঞানীর হাতে অর্থ ও মর্যাদা থাকুক, শিল্পীর হাতে সৃজনশীলতার স্বাধীনতা থাকুক, শিশুর হাতে বই থাকুক এবং তরুণের সামনে কর্মসংস্থানের বাস্তব পথ থাকুক। কারণ সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে আমরা কতবার আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করেছি তা দিয়ে নয়, পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে কতবার সমস্যার সমাধান তৈরি করেছি তা দিয়ে।

একদিন হয়তো মানুষ বুঝবে, জ্ঞানই মানুষের সবচেয়ে বড় তীর্থযাত্রা। প্রশ্নই তার সবচেয়ে পবিত্র মন্ত্র। গবেষণাগার তার আধুনিক সাধনাস্থল। বিদ্যালয় তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। গ্রন্থাগার তার স্মৃতির ভাণ্ডার। আর মানুষের কল্যাণ তার সর্বোচ্চ নৈতিক ধর্ম। তখন ঈশ্বরকে অস্বীকার করেও নয়, ঈশ্বরকে প্রমাণ করেও নয়, মানুষ তার নিজের দায়িত্বকে স্বীকার করেই বড় হয়ে উঠবে। সে বুঝবে, স্বর্গ কোথায় তা নিয়ে বিতর্ক করার চেয়ে পৃথিবীকে নরক না বানানো বেশি জরুরি; পরকালে কে পুরস্কার দেবে তা নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে বর্তমানে কে ক্ষুধার্ত, কে অশিক্ষিত, কে অসুস্থ, কে বেকার এবং কে প্রতারিত হচ্ছে তা দেখা বেশি জরুরি। কারণ মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা কোনো আকাশভাঙা বিস্ময় নয়; অজ্ঞ মানুষ জ্ঞানী হয়ে ওঠা, পরনির্ভর জাতি আত্মনির্ভর হয়ে ওঠা, ভীত মানুষ প্রশ্ন করতে শেখা এবং ভোক্তা মানুষ স্রষ্টায় পরিণত হওয়াই মানবসভ্যতার প্রকৃত অলৌকিকতা।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি হবে না, পৃথিবীতে কত ঈশ্বরের উপাসনা হয়েছিল। প্রশ্ন হবে, এত ঈশ্বরের পৃথিবীতে মানুষ কতটা মানুষ হতে পেরেছিল। কতটি উপাসনালয় উঠেছিল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে কতটি বিদ্যালয় উঠেছিল। কত ঘণ্টা প্রার্থনা হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে কত ঘণ্টা মানুষ জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করেছে। কত অর্থ পবিত্র স্থাপত্যে ব্যয় হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে কত অর্থ মানবমুক্তির জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হয়েছে। কারণ ঈশ্বরের নামে নির্মিত স্থাপত্য সময়ের সাক্ষী হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানের নামে নির্মিত একটি বিদ্যালয় একটি প্রজন্মকে বদলে দিতে পারে; একটি গবেষণাগার একটি রোগের অবসান ঘটাতে পারে; একটি বই একটি মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তুলতে পারে; একটি প্রশ্ন একটি সভ্যতার গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। আর সেই জাগরণই আমাদের দরকার।

বোধ শুধু যথেষ্ট নয়, বোধ থেকে উন্মেষ চাই। উন্মেষ থেকে প্রশ্ন চাই। প্রশ্ন থেকে অনুসন্ধান চাই। অনুসন্ধান থেকে জ্ঞান চাই। জ্ঞান থেকে দক্ষতা চাই। দক্ষতা থেকে উৎপাদন চাই। উৎপাদন থেকে আত্মনির্ভরতা চাই। আর আত্মনির্ভরতা থেকে এমন এক মানবিক সভ্যতা চাই, যেখানে মানুষ আর নিজের অজ্ঞতাকে পবিত্রতার পোশাক পরিয়ে গর্ব করবে না।

যে দিন মানুষ প্রার্থনার পাশাপাশি গবেষণা করবে, বিশ্বাসের পাশাপাশি প্রশ্ন করবে, ঐতিহ্যের পাশাপাশি যুক্তি রাখবে, আবেগের পাশাপাশি প্রমাণ চাইবে এবং ঈশ্বরের কাছে আশীর্বাদ চাওয়ার পাশাপাশি নিজের দুই হাত দিয়ে পৃথিবীকে একটু ভালো করার চেষ্টা করবে, সেদিনই মানুষের সত্যিকার উন্মেষ শুরু হবে।

সেদিন হয়তো পৃথিবী থেকে ঈশ্বরের প্রয়োজন শেষ হবে না। কিন্তু মানুষের বোকা বানানোর বাজারটি নিঃসন্দেহে অনেক ছোট হয়ে যাবে।

প্রদ‍্যোত