শ্রেষ্ঠত্বের অভিনয় এবং শ্রেষ্ঠের নীরব হাসি
মানুষের একটি অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা আছে। যে মানুষটির সামনে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করলে নিজের অহং একটু ছোট হয়ে যেতে পারে, তার সামনেই সে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শনী শুরু করে। জ্ঞান কম হলে জ্ঞানের প্রদর্শন, ক্ষমতা সীমিত হলে ক্ষমতার অভিনয়, অভিজ্ঞতা অল্প হলে অভিজ্ঞতার গল্প, আর ভিতরে অনিশ্চয়তা থাকলে বাইরে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। যেন নিজের প্রকৃত উচ্চতা নিয়ে সংশয় যত বেশি, নিজের তৈরি মঞ্চটি তত উঁচু করতে হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ প্রায়ই ভুল দর্শকের সামনে অভিনয় করে। যার সামনে তুমি নিজেকে মহাজ্ঞানী প্রমাণ করতে চাইছ, সে হয়তো তোমার কথার মধ্যেই তোমার জ্ঞানের সীমা দেখতে পাচ্ছে। যার সামনে তুমি নিজের প্রভাব দেখাতে চাইছ, সে হয়তো বুঝে ফেলেছে তোমার প্রভাবের প্রকৃত পরিধি। যার সামনে তুমি অভিজ্ঞতার পাহাড় সাজাচ্ছ, সে হয়তো সেই পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রই পড়তে পারে। ফলে তোমার শ্রেষ্ঠত্বের প্রদর্শন তার কাছে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হয়ে ওঠে না; বরং তোমার আত্মপরিচয়ের দুর্বলতার একটি বিনোদনমূলক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।
অপরের চোখে নিজেকে বড় দেখানোর চেষ্টা অনেক সময় নিজের চোখেই নিজেকে ছোট করে ফেলে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, অতিরিক্ত আত্মপ্রদর্শনের পেছনে প্রায়ই থাকে অনিরাপত্তা, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের মূল্য সম্পর্কে অস্থিরতা। যে মানুষ নিজের অবস্থান সম্পর্কে অন্তরে তুলনামূলকভাবে স্থির, তাকে প্রতিটি মুহূর্তে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে হয় না। সূর্যকে সূর্য প্রমাণ করার জন্য মাইক হাতে রাস্তায় নামতে হয় না। তার আলোই তার পরিচয়।
অন্যদিকে, কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো এটি নিজের সম্পর্কে একটি মিথ্যা চরিত্র নির্মাণ করে। মানুষ প্রথমে অন্যকে বিশ্বাস করানোর জন্য অভিনয় করে, পরে সেই অভিনয় বজায় রাখার জন্য নিজেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করে। তখন বাস্তব মানুষটি এবং প্রদর্শিত মানুষটির মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একসময় নিজের মুখটি আয়নায় দেখলেও সে বুঝতে পারে না কোনটি তার আসল মুখ আর কোনটি সামাজিক মুখোশ।
আর এখানেই আসে সবচেয়ে নির্মম হাস্যরস। তুমি যাকে বোকা ভেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাচ্ছ, সে হয়তো তোমাকে থামিয়ে সংশোধন করছে না। সে বুঝেছে, তোমাকে সংশোধন করার চেয়ে তোমার আত্মপ্রদর্শনের নাটকটি শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছায়, তা দেখা অনেক বেশি শিক্ষণীয়। তার নীরবতা সম্মতি নয়; অনেক সময় সেটি পর্যবেক্ষণ। তার হাসি প্রশংসা নয়; অনেক সময় সেটি উপলব্ধির ফল।
শ্রেষ্ঠ মানুষের সামনে অযোগ্যতার সবচেয়ে হাস্যকর রূপ হলো নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে যাওয়া। প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব তুলনা চায় না। যে সত্যিই জানে, সে জানে তার অজানা কত বিশাল। যে সত্যিই পারে, সে জানে কোথায় সে পারে না। যে সত্যিই শক্তিশালী, সে প্রতিটি দুর্বল মানুষের সামনে নিজের শক্তির প্রদর্শনী করে বেড়ায় না। আত্মবিশ্বাসের একটি গভীর বৈশিষ্ট্য হলো তার শব্দ কম; আর অহংকারের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো তার শব্দের প্রয়োজন বেশি।
তাই নিজেকে যা নও, তা হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা শুধু নৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মঘাতিতা। কারণ মিথ্যা পরিচয়কে প্রতিদিন নতুন করে অভিনয় করতে হয়, কিন্তু সত্য পরিচয়কে কোনো অভিনয় করতে হয় না। তুমি যত বেশি নিজেকে ফুলিয়ে তুলবে, বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনাও তত বাড়বে। আর বাস্তবতা এমন এক আয়না, যেখানে মেকআপের কোনো বিশেষ অধিকার নেই।
জীবনের সবচেয়ে পরিণত বুদ্ধি সম্ভবত এইটুকু বোঝা যে সব ঘরে তোমাকে সবচেয়ে জ্ঞানী হতে হবে না, সব আলো তোমার ওপর পড়তে হবে না, এবং প্রত্যেক শ্রেষ্ঠ মানুষের সামনে নিজের উচ্চতা ঘোষণা করা নিজের উচ্চতার প্রমাণ নয়।
তুমি যতটুকু, ততটুকুই থাকো। জ্ঞান থাকলে জ্ঞান কথা বলুক, দক্ষতা থাকলে কাজ কথা বলুক, চরিত্র থাকলে আচরণ কথা বলুক। নিজের হয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার দায়িত্ব নিজের ওপর নিও না। কারণ সত্যিকারের মূল্যবান জিনিসের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, তার প্রচারক না থাকলেও তার মূল্য কমে না।
নিজেকে বড় দেখানোর আগে একবার দেখে নাও, তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছ। কখনো কখনো তুমি যে মঞ্চে উঠে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের অভিনয় করছ, দর্শকসারিতে বসে থাকা মানুষটি সেই মঞ্চের নির্মাতাই হতে পারে। যার সামনে তুমি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করছ, সে যদি সত্যিই তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়, তবে তোমার প্রদর্শন তার কাছে শ্রেষ্ঠত্ব নয়, তোমার অজ্ঞতার বিনোদন।
প্রদ্যোত