← Back to writing

কুয়োর ব্যাঙের ব‍্যাঙ্গোলজি

কুয়োর ব্যাঙের ব‍্যাঙ্গোলজি

কুয়োর ব্যাঙের একটা বিশেষ সুবিধা আছে। তাকে পৃথিবী দেখতে হয় না, পৃথিবী সম্পর্কে জানতে হয় না, এমনকি কুয়োর বাইরেও যে বিশাল এক জগৎ আছে, সেটাও বিশ্বাস করতে হয় না। তার কাছে কুয়োটাই মহাবিশ্ব, কুয়োর জলই সভ্যতার সমুদ্র, আর নিজের লাফের পরিধিই মহাকাশের সীমানা। সমস্যা হলো, এই ক্ষুদ্র জলজ ভূগোলের অধিবাসী যখন নিজেকে বিশ্ববিশারদ মনে করতে শুরু করে, তখন তার আত্মবিশ্বাসের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রও নিতান্তই তুচ্ছ হয়ে যায়।

বিপত্তি আরও বাড়ে, যখন কুয়োর ব্যাঙ কুয়োর বাইরে বসবাসকারী প্রাণীদের জীবনযাত্রা নির্ধারণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। কে কী খাবে, কী পরবে, কীভাবে চলবে, কী চিন্তা করবে, কার সঙ্গে মিশবে, কোন পথে যাবে, এমনকি কখন হাসবে আর কখন কাঁদবে, তারও বিধিবদ্ধ নির্দেশিকা তৈরি করে ফেলে সে। নিজের কুয়োর জল কতটা পরিষ্কার, তাতে কতটা শ্যাওলা জমেছে, কিংবা নিজের অস্তিত্বের দুর্গন্ধ কত দূর ছড়িয়েছে, সেসব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তার সমস্ত চিন্তা কুয়োর বাইরের পৃথিবীকে কীভাবে কুয়োর নিয়মে পরিচালিত করা যায়।

এ এক অদ্ভুত প্রজাতির আত্মপ্রসাদ। নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, সে-ই অন্যের জ্ঞান যাচাইয়ের প্রধান পরীক্ষক। নিজের অভিজ্ঞতার পরিধি কয়েক হাতের জলাশয়, অথচ অন্যের জীবনদর্শন বিচার করতে তার বিশ্বকোষীয় দক্ষতা। নিজের স্বাধীনতা বলতে কুয়োর দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা, অথচ অন্যের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপে সে আন্তর্জাতিক আইনপ্রণেতা। কুয়োর বাইরে কেউ সমুদ্র দেখলে তার আপত্তি, পাহাড় দেখলে তার সন্দেহ, আকাশ দেখলে তার অস্বস্তি। কারণ, বাইরের পৃথিবীর বিস্তৃতি স্বীকার করলে তার নিজের মহত্ত্বের বেলুনে সূচ ফুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই ব্যাঙদের সবচেয়ে বড় প্রতিভা হলো, তারা কখনো নিজেদের শাসক বলে পরিচয় দেয় না। তারা নিজেদের অভিভাবক, সংস্কারক, নীতিনির্ধারক, সমাজরক্ষক কিংবা মানবকল্যাণের একমাত্র বৈধ ঠিকাদার হিসেবে উপস্থাপন করে। তাদের প্রতিটি হুকুমের মোড়কে থাকে কল্যাণের সিল, প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার পেছনে থাকে নৈতিকতার বিজ্ঞাপন, আর প্রতিটি হস্তক্ষেপের যুক্তি হিসেবে থাকে মানুষের মঙ্গল। মানুষের মঙ্গল যে মানুষের নিজের বিবেচনা, অভিজ্ঞতা ও স্বাধীনতার মধ্য দিয়েও অর্জিত হতে পারে, এই সামান্য সত্যটি তাদের কুয়োর পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

মজার ব্যাপার, কুয়োর ব্যাঙের নিজের জীবনযাপন নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। তার কুয়োতে জল কমে গেলে সেটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু বাইরের কারও জীবনে সমস্যা দেখা দিলে সেটা তার চরিত্রের দোষ। নিজের ভুল হলে পরিস্থিতি দায়ী, অন্যের ভুল হলে তার নৈতিক অবক্ষয়। নিজের অজ্ঞতা হলে সেটা সরলতা, অন্যের ভিন্নমত হলে সেটা ঔদ্ধত্য। নিজের স্বার্থপরতা হলে সেটা বাস্তববুদ্ধি, অন্যের আত্মরক্ষা হলে সেটা স্বার্থপরতা। এই দ্বিমুখী দর্শনের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে কুয়োর ব্যাঙের বিশ্বসংবিধান।

কুয়োর বাইরের মানুষগুলোও অবশ্য সব সময় নির্দোষ নয়। কেউ কেউ নিজেরাই এই ব্যাঙদের মাথায় তুলে নাচায়, কেউ তাদের নির্দেশকে জীবনের চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নেয়, কেউ আবার নিজের বিবেকের দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমায়। ফলে কুয়োর ব্যাঙের শাসন কেবল তার দম্ভের কারণে টিকে থাকে না, টিকে থাকে মানুষের অন্ধ আনুগত্য, প্রশ্নহীনতা ও আত্মসমর্পণের উর্বর জমিতে। ব্যাঙের কুয়ো ছোট হতে পারে, কিন্তু তার প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র তখন আর ছোট থাকে না।

অথচ পৃথিবীর নিয়ম বড় সহজ। কুয়োর জল আর সমুদ্রের জল এক নয়, কুয়োর সীমানা আর পৃথিবীর সীমানা এক নয়, আর নিজের অভিজ্ঞতাই যে জীবনের একমাত্র সংবিধান নয়, সেটুকু বুঝতে কোনো মহাকাশবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু কুয়োর দেয়াল পেরিয়ে একবার বাইরে তাকানোর সাহস। কিন্তু তাকালেই তো বিপদ! দেখা যাবে, নিজের অজান্তেই পৃথিবী এত দিন নিজের মতো করে চলেছে। কুয়োর ব্যাঙের অনুমতি ছাড়াই মানুষ প্রেম করেছে, শিল্প সৃষ্টি করেছে, বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে, সভ্যতা গড়েছে, ভুল করেছে, ভুল শুধরেছে এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছে।

তাই কুয়োর ব্যাঙদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো স্বাধীন চিন্তা। কারণ, স্বাধীন চিন্তা মানেই তাদের কর্তৃত্বের অবসান। তারা সমুদ্রকে কুয়ো বানাতে চায়, আকাশকে কুয়োর ছাদে নামিয়ে আনতে চায়, আর পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মাথায় নিজেদের কুয়োর একটি করে অদৃশ্য ঢাকনা বসাতে চায়। তাদের স্বপ্নের পৃথিবীতে সবাই স্বাধীন, তবে স্বাধীনতার সংজ্ঞাটি তাদের অনুমোদিত; সবাই মুক্ত, তবে মুক্তির সীমানা তাদের নির্ধারিত; সবাই সুখী, তবে সুখের পরিমাপও তাদের তৈরি।

সবচেয়ে হাস্যকর হলো, এই ব্যাঙেরা নিজেরাই জানে না যে তারা আসলে কুয়োর বন্দি। তারা মনে করে, কুয়োর বাইরে যারা আছে, তারাই পথভ্রষ্ট। অথচ বন্দিত্বের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ শিকল নয়, নিজের সীমাবদ্ধতাকে মহাবিশ্ব ভেবে বসে থাকা। যে নিজের চারপাশের দেয়ালকেই দিগন্ত মনে করে, সে অন্যের দিগন্ত নির্ধারণ করতে গিয়ে আসলে নিজের অজ্ঞতারই বিজ্ঞাপন দেয়।
কুয়োর ব্যাঙের সমস্যা সে কুয়োয় থাকে, তা নয়; সমস্যা হলো, সে কুয়োর বাইরে পৃথিবীটাকেও নিজের কুয়ো বানাতে চায়। আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৌতুক হলো, যে নিজে এক পা-ও কুয়োর বাইরে ফেলতে সাহস পায় না, সে-ই অন্যদের জন্য পৃথিবীর পথনকশা তৈরি করে!

প্রদ্যোত / ০১ অক্টোবর ২০২৬