শিল্পী নাকি শিল্পের ব্যবসায়ী?
একজন শিল্পী যখন তার শিল্পসত্তাকে সামান্য অর্থের কাছে, ব্যক্তিস্বার্থের কাছে, লোভের কাছে, হিংসার কাছে কিংবা বিদ্বেষের কাছে বন্ধক রাখে, তখন তার হাতে হয়তো মাইক্রোফোন থাকে, গলায় পরিচয়পত্র থাকে, দেয়ালে পুরস্কারের ছবি থাকে, নামের পাশে ‘শিল্পী’ শব্দটিও থাকে; শুধু শিল্পটাই আর থাকে না। তখন সে স্বীকৃত শিল্পী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে ধীরে ধীরে ধিকৃত শিল্পে, কখনো বিকৃত শিল্পে রূপান্তরিত হয়। শিল্পের পোশাক থাকে, শিল্পের শরীর থাকে, শিল্পের আত্মা থাকে না। যেন মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের গান, আর মঞ্চের নিচে সুবিধার হিসাবখাতা!
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে এমন এক বিচিত্র প্রজাতির সাংস্কৃতিক প্রাণীও দেখা যায়, যারা সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের নীতির রঙ পরিবর্তন করতে অসাধারণ পারদর্শী। ক্ষমতার পালা বদল হলে তাদের আদর্শও পাল্টায়, স্লোগান পাল্টায়, আনুগত্যের ঠিকানা পাল্টায়; শুধু পদ, পরিচয়, সুযোগ এবং ব্যক্তিগত সুবিধার প্রতি ভালোবাসাটি অপরিবর্তিত থাকে। তারা কোনো সরকারের শিল্পী নয়, কোনো মতাদর্শের শিল্পী নয়, এমনকি কখনো কখনো শিল্পেরও শিল্পী নয়; তারা মূলত পরিস্থিতির শিল্পী। বাতাস যেদিকে, তাদের পতাকা সেদিকে। ক্ষমতার জানালা খোলা থাকলে তারা সংস্কৃতির দূত, জানালা বন্ধ হলে অন্য জানালার সন্ধানে ব্যস্ত।
কেউ সংস্কৃতিকে করেন ক্ষমতার সঙ্গী, কেউ দুঃশাসনের সঙ্গী, কেউ উস্কানির সঙ্গী, কেউ আবার সংস্কারের নামে নিজের স্বার্থের সংস্কার করেন। শিল্প তখন আর সমাজের বিবেক থাকে না, হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র। মঞ্চ হয়ে যায় দরবার, সংগঠন হয়ে যায় ক্ষুদ্র ক্ষমতার কেন্দ্র, আর শিল্পীর কণ্ঠ হয়ে যায় পৃষ্ঠপোষকের মনের মাইক। যে কণ্ঠ অন্যায়ের বিরুদ্ধে উঠবার কথা, সেটিই সুবিধার সামনে এত নিচু হয়ে যায় যে তাকে আর কণ্ঠ বলা যায় না, তাকে বলা যায় কণ্ঠের প্রশাসনিক সংস্করণ।
শিল্পীর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্বাধীনতা। অথচ সুবিধাবাদী শিল্পী স্বাধীনতাকেই প্রথমে বিক্রি করে। তারপর বিক্রি করে বিবেক, তারপর নীতি, তারপর প্রতিবাদ, শেষে নিজের শিল্পসত্তা। বিনিময়ে পায় কয়েকটি ছবি, কয়েকটি পদ, কিছু মঞ্চ, কিছু প্রশংসাপত্র, কিছু সামাজিক পরিচিতি এবং সস্তা জনপ্রিয়তার কয়েক মুঠো ফেনা। বাহ! কী লাভজনক শিল্পচর্চা! এখানে কবিতার চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, গানের চেয়ে সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অভিনয়ের চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর প্রতিভার চেয়ে কার সঙ্গে দেখা গেল সেটিই বড় যোগ্যতা।
অথচ শিল্প ব্যবসা নয়। শিল্পীর সৃষ্টির বিনিময়ে সম্মানী পাওয়া অপরাধ নয়, পেশাগত শ্রমের মূল্য নেওয়াও অপরাধ নয়। অপরাধ তখনই শুরু হয়, যখন অর্থ শিল্পকে পরিচালনা করতে বসে, স্বার্থ বিবেককে পরিচালনা করতে বসে এবং জনপ্রিয়তার লোভ সত্যকে সম্পাদনা করতে বসে। তখন শিল্প আর সৃষ্টি থাকে না, পণ্য হয়ে যায়। শিল্পী আর স্রষ্টা থাকেন না, হয়ে ওঠেন বিক্রয় প্রতিনিধি। শুধু পার্থক্য একটাই, দোকানের পণ্যের গায়ে মূল্য লেখা থাকে; এই পণ্যের গায়ে লেখা থাকে ‘শিল্পী’!
ধর্ম ব্যবসায়ী ধর্মকে পণ্য বানায়, শিক্ষা ব্যবসায়ী জ্ঞানকে পণ্য বানায়, আর সংস্কৃতি ব্যবসায়ী সংস্কৃতিকে পণ্য বানায়। তিনজনের ব্যবসায়িক দর্শন প্রায় একই: আবেগ তৈরি করো, অনুসারী তৈরি করো, বাজার তৈরি করো, তারপর লাভ তুলো। পার্থক্য শুধু পণ্যের মোড়কে। কেউ ঈশ্বরের নামে বিক্রি করে, কেউ শিক্ষার নামে, কেউ সংস্কৃতির নামে। কিন্তু যেখানে মুনাফা সত্যের চেয়ে বড়, সেখানে পেশা যাই হোক, ব্যবসায়িক মানসিকতাই শেষ কথা।
শিল্পীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অবশ্যই থাকবে, আত্মমর্যাদাও থাকবে, নিজের মতও থাকবে। কিন্তু আত্মমগ্নতা আর শিল্পসত্তা এক জিনিস নয়। আত্মকেন্দ্রিকতা শিল্পীর স্বাধীনতা নয়; বরং অনেক সময় সেটিই শিল্পের সবচেয়ে নীরব কারাগার। যে শিল্পী নিজের প্রতিভাকে শুধু নিজের প্রশংসার আয়নায় দেখতে দেখতে সমাজ, মানুষ, ইতিহাস এবং সত্যকে ভুলে যান, তিনি ধীরে ধীরে শিল্পী থেকে নিজেরই ভক্তে পরিণত হন। তখন তিনি সৃষ্টি করেন কম, নিজের মূর্তি নির্মাণ করেন বেশি।
সবচেয়ে হাস্যকর দৃশ্যটি তখনই দেখা যায়, যখন একই মানুষ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষমতার দরজায় দাঁড়িয়ে একই মুখে ভিন্ন সুরে গান গেয়ে নিজেকে নীতিবান শিল্পী হিসেবে পরিচয় দেন। গতকাল যে কথাকে অন্যায় বলেছিলেন, আজ সেটিই যদি পৃষ্ঠপোষকের সুবিধা হয়, তবে তিনি বলেন সেটি ‘পরিস্থিতির দাবি’। গতকাল যে পতাকার নিচে দাঁড়ানোকে নৈতিক কর্তব্য বলেছিলেন, আজ অন্য পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে সেটিকেই বলেন ‘সাংস্কৃতিক বহুত্ব’। আহা, কী অপূর্ব নমনীয় নৈতিকতা! রাবারের মতো টানলে যত লম্বা হয়, ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে ততই কার্যকর!
শিল্পের কাজ কারও দরবার সাজানো নয়; শিল্পের কাজ দরবারের আয়না ধরে দেওয়া। শিল্পীর কাজ ক্ষমতার প্রশংসাগীতি লেখা নয়; প্রয়োজনে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করা। শিল্পের কাজ মানুষের দুর্বলতাকে চাটুকারিতায় পরিণত করা নয়; বরং মানুষের ভিতরের অন্ধকারে আলো জ্বালানো। তাই যে শিল্পী ক্ষমতার রঙে নিজের কণ্ঠ রাঙান, তিনি যত বড় মঞ্চেই দাঁড়ান, তার শিল্পের উচ্চতা মাপা যায় না মঞ্চের উচ্চতায়। আর যে শিল্পী সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট মঞ্চেও নিজের কণ্ঠ অক্ষত রাখেন, ইতিহাসের দীর্ঘ মঞ্চে শেষ পর্যন্ত তারই প্রতিধ্বনি টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকে।
শিল্পীর মাথা নত হতে পারে মানুষের প্রতি, ভালোবাসার প্রতি, সৌন্দর্যের প্রতি, সত্যের প্রতি। কিন্তু লোভের কাছে মাথা নত করে শিল্পী হওয়া যায় না। অর্থের কাছে আত্মসমর্পণ করে শিল্পী হওয়া যায় না। বিদ্বেষকে শিল্পের ভাষা বানিয়ে শিল্পী হওয়া যায় না। ক্ষমতার পায়ের কাছে বিবেক রেখে এসে মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার গান গাইলেই স্বাধীন শিল্পী হওয়া যায় না।
শিল্পীর আসল পরিচয় তার পুরস্কারে নয়, তার অবস্থানে; তার পদে নয়, তার প্রতিবাদে; তার জনপ্রিয়তায় নয়, তার সততায়; তার সংগঠনের ব্যানারে নয়, তার সৃষ্টির ভিতরে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস খুব নিষ্ঠুর হিসাবরক্ষক। সে শিল্পীর পদবী মনে রাখে না, পৃষ্ঠপোষকের তালিকা মনে রাখে না, ক্ষমতার সঙ্গে তোলা ছবির অ্যালবামও সংরক্ষণ করে না। সে শুধু জিজ্ঞেস করে- যখন শিল্প বিক্রি হচ্ছিল, তখন তুমি কী সৃষ্টি করেছিলে? যখন বিবেক নিলামে উঠেছিল, তখন তোমার কণ্ঠ কোথায় ছিল? আর যখন সত্যকে চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন তোমার শিল্প কি কথা বলেছিল?
সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে নামের পাশে ‘শিল্পী’ লিখে লাভ কী?
তখন মানুষটি শিল্পী নয়; শিল্পের ব্যবসায়ী।
আর তার শিল্প- শিল্প নয়, বিক্রিত বিবেকের অলংকৃত বিজ্ঞাপন।
প্রদ্যোত / ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬