← Back to writing

শিশুর মন কারও উত্তরাধিকার নয়

শিশুর মন কারও উত্তরাধিকার নয়

একটি শিশু পৃথিবীতে জন্ম নেয় কোনো ধর্মের প্রতিনিধি হয়ে নয়, কোনো দর্শনের অনুসারী হয়ে নয়, কোনো রাজনৈতিক মতবাদের সৈনিক হয়ে নয়। সে আসে এক অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা নিয়ে। তার চোখে তখন পৃথিবী কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাসের রঙে রাঙানো থাকে না, কোনো পবিত্র গ্রন্থের ব্যাখ্যায় বিভক্ত থাকে না, কোনো জাতি, সম্প্রদায়, মতবাদ কিংবা মতাদর্শের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। তার কাছে পৃথিবী প্রথমে একটি বিস্ময়, তারপর একটি প্রশ্ন, তারপর একটি অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধানের স্বাভাবিক পথটিই তার মানবিক বিকাশের প্রথম বিদ্যালয়। অথচ মানুষের নির্মিত সমাজব্যবস্থায় শিশুর জন্মের মুহূর্ত থেকেই তার পরিচয়ের ওপর নানা নাম, পরিচয়, বিশ্বাস ও আনুগত্যের সিলমোহর বসিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, তুমি এই ধর্মের, তুমি ওই সম্প্রদায়ের, তুমি এই বিশ্বাসের উত্তরাধিকারী। শিশুটি তখনো জানে না ধর্ম কী, দর্শন কী, ঈশ্বর কী, নাস্তিকতা কী, আত্মা কী, মুক্তি কী, এমনকি নিজের অস্তিত্বের অর্থ কী। অথচ তার হয়ে আমরা ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি সে কী বিশ্বাস করবে। এখানেই মানবসভ্যতার এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন জন্ম নেয়। একটি শিশুকে আমরা পৃথিবী আবিষ্কারের স্বাধীনতা দেব, নাকি পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের পূর্বনির্ধারিত ধারণাগুলো তার কোমল মনের ওপর লিখে দিয়ে তাকে সেই লেখার মধ্যেই সারাজীবন বন্দী রাখব?

শিশু জন্মগতভাবে স্বাধীনতার অধিকারী। এই স্বাধীনতা কোনো রাষ্ট্রের দান নয়, কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুগ্রহ নয়, কোনো পরিবারের অনুমতিও নয়। মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত বলেই এটি তার মৌলিক অধিকার। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তার বিশ্বাস বেছে নিতে পারে, পরিবর্তন করতে পারে, প্রত্যাখ্যান করতে পারে, সংশোধন করতে পারে। কিন্তু একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার বেছে নেওয়ার মতো কোনো জ্ঞানভাণ্ডার থাকে না। তার সামনে বিকল্প থাকে না, থাকে কেবল গ্রহণের প্রবল চাপ। সে যা দেখে, তাই সত্য বলে মনে করে; যাকে ভালোবাসে, তার কথাকে প্রশ্নাতীত বলে গ্রহণ করে; পরিবার যে পরিচয় দেয়, সেটিই তার নিজের পরিচয় বলে মনে হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে শিশুর ওপর কোনো বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া আসলে স্বাধীন চিন্তার বীজ রোপণ নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত চিন্তার কাঠামো নির্মাণ। একটি শিশু তখন নিজের পৃথিবী আবিষ্কার করে না, তাকে দেওয়া পৃথিবীর মধ্যেই নিজের স্থান খুঁজতে শেখে।

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের প্রশ্ন করার ইতিহাস। মানুষ যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চেয়েছে সূর্য কেন ওঠে, বজ্রপাত কেন হয়, মৃত্যু কী, পৃথিবী কোথা থেকে এসেছে, মানুষ কেন বেঁচে থাকে, তখনই জ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছে। প্রাচীন মানুষ প্রকৃতির রহস্যকে ব্যাখ্যা করতে নানা পৌরাণিক কাহিনি নির্মাণ করেছে, দেবতার ধারণা সৃষ্টি করেছে, আত্মা ও পরজগতের কল্পনা করেছে। এসব বিশ্বাস মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অমূল্য অংশ। কিন্তু ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই যে মানুষ তার পূর্বপুরুষের প্রতিটি ধারণাকে চিরন্তন সত্য হিসেবে ধরে রাখেনি। পৃথিবী একসময় সমতল মনে হয়েছে, পরে মানুষ জেনেছে পৃথিবী গোল। একসময় সূর্যকে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে দেখা হয়েছে, পরে জ্যোতির্বিজ্ঞান সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। রোগকে কখনো অভিশাপ মনে করা হয়েছে, পরে জীবাণুবিজ্ঞান তার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেছে। বজ্রপাতকে দেবতার ক্রোধ মনে করা হয়েছে, পরে পদার্থবিজ্ঞান তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। অর্থাৎ মানবসভ্যতার অগ্রগতি ঘটেছে বিশ্বাসকে অন্ধভাবে রক্ষা করার মাধ্যমে নয়, বরং প্রশ্ন করার সাহসের মাধ্যমে।

তাই কোনো শিশুর ভবিষ্যৎকে আমাদের অতীতের অমীমাংসিত প্রশ্নের কারাগারে বন্দী করা কতটা ন্যায়সংগত, সেটিই মূল প্রশ্ন। বাবা মা তাদের সন্তানকে ভালোবাসেন, তাই তারা নিজেদের জানা পৃথিবীটিই সন্তানের হাতে তুলে দিতে চান। কিন্তু ভালোবাসা এবং অধিকার এক জিনিস নয়। সন্তানকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে তার চিন্তার ভবিষ্যৎও বাবা মায়ের মালিকানাধীন। সন্তান আমাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে আসে, কিন্তু আমাদের জন্য পৃথিবীতে আসে না। তার জীবন তার নিজের। তার চিন্তা তার নিজের। তার সম্ভাবনা তার নিজের। বাবা মা তাকে ভাষা শেখাবেন, যাতে সে কথা বলতে পারে; যুক্তি শেখাবেন, যাতে সে প্রশ্ন করতে পারে; নৈতিকতা শেখাবেন, যাতে সে অন্যের অধিকার বুঝতে পারে; জ্ঞান দেবেন, যাতে সে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তার হয়ে চূড়ান্ত উত্তর লিখে দেওয়া উচিত নয়।

শিশুর শিক্ষার প্রথম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাকে কোনো নির্দিষ্ট মতবাদে পরিণত করা নয়, তাকে মানুষ করে তোলা। তাকে শেখাতে হবে সত্য বলতে, অন্যের কষ্ট বুঝতে, দুর্বলকে রক্ষা করতে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে, ভিন্নমতকে সহ্য করতে, নিজের ভুল স্বীকার করতে এবং অজানাকে ভয় না পেতে। তাকে শেখাতে হবে যে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়। সন্দেহ করা পাপ নয়। না জানা লজ্জার নয়। বরং না জেনে জানার ভান করাই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক পতনের অন্যতম লক্ষণ। যে শিশু প্রশ্ন করতে শেখে, সে একদিন নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে পারে। আর যে নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে পারে, সে অন্যের বিশ্বাসের প্রতিও সহনশীল হতে শেখে। এই প্রশ্ন করার স্বাধীনতাই সভ্যতার প্রাণশক্তি।

ধর্ম মানুষের ইতিহাসে গভীরতম ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ধর্ম মানুষকে সান্ত্বনা দিয়েছে, নৈতিকতার ভাষা দিয়েছে, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও স্থাপত্যের অসংখ্য মহৎ সৃষ্টি অনুপ্রাণিত করেছে। অসংখ্য মানুষ ধর্মের মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছে। তাই ধর্মের অস্তিত্বকে অস্বীকার করাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্ম। ধর্ম যদি সত্যিই মানুষের আত্মিক মুক্তির পথ হয়, তবে সেই পথে যাওয়ার জন্য স্বাধীন ইচ্ছার প্রয়োজন কেন থাকবে না? যে বিশ্বাস প্রশ্নকে ভয় পায়, সে বিশ্বাসের শক্তি কোথায়? আর যে বিশ্বাস প্রশ্নের মধ্য দিয়েও টিকে থাকতে পারে, তার জন্য শিশুর স্বাধীনতাকে ভয় পাওয়ারই বা কী কারণ? ধর্মকে যদি সত্য বলে মনে করা হয়, তবে সত্যের শক্তি এতটাই প্রবল হওয়া উচিত যে একটি পরিণত মানুষ নিজে অনুসন্ধান করেও তার কাছে পৌঁছাতে পারে।

শিশুকে কোনো ধর্ম সম্পর্কে জানানো এবং শিশুর ওপর কোনো ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি ও মানবসভ্যতার চিন্তার ইতিহাস সম্পর্কে শিশুকে শিক্ষা দেওয়া জ্ঞানের অংশ হতে পারে। কিন্তু তাকে বলা যে জন্মের কারণে তোমার সত্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, তোমার প্রশ্নের সীমা নির্ধারিত হয়ে গেছে, তোমার পৃথিবীর ব্যাখ্যাও নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেটি জ্ঞান নয়, সেটি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত মানসিক কাঠামোর পুনরুৎপাদন। শিক্ষা শিশুর সামনে দরজা খুলবে। মতবাদ যদি সেই দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়, তবে তা শিক্ষার বিপরীত শক্তিতে পরিণত হয়।

একটি শিশুর মন নদীর মতো। তাকে প্রবাহিত হতে দিতে হয়। নদীর পথ যদি জন্মের আগেই পাথর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তার স্বাভাবিক স্রোত কোথায় যাবে? শিশুর মনও তেমন। সেখানে প্রশ্ন আসবে, কৌতূহল আসবে, বিরোধ আসবে, সংশয় আসবে, বিস্ময় আসবে, প্রেম আসবে, বিদ্রোহ আসবে। এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই তার ব্যক্তিত্ব তৈরি হবে। আমরা যদি প্রতিটি প্রশ্নের আগে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা, সামাজিক ভয়, পারিবারিক লজ্জা কিংবা কোনো পূর্বনির্ধারিত দর্শনের দেয়াল তুলে দিই, তবে শিশুটি হয়তো বাধ্য হয়ে নীরব হবে, কিন্তু তার চিন্তা থেমে থাকবে না। বরং দমন করা প্রশ্ন একদিন বিকৃত রূপে ফিরে আসতে পারে। যে মনকে প্রশ্ন করতে দেওয়া হয় না, সে হয় অন্ধ আনুগত্য শেখে, নয়তো গোপন বিদ্রোহ শেখে। কোনো সুস্থ সমাজই তার শিশুদের এই দুই প্রান্তে ঠেলে দিতে পারে না।

মানুষের মন গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব। এই সময়ে যে ধারণা গভীরভাবে প্রবেশ করে, তা পরবর্তী জীবনে অবচেতন সত্যের মতো কাজ করতে পারে। শিশুকে যদি বলা হয়, পৃথিবীর অন্য মানুষরা ভুল, কেবল আমাদের বিশ্বাসই সত্য, তবে তার মধ্যে খুব অল্প বয়সেই বিভাজনের বীজ জন্ম নিতে পারে। সে অন্য ধর্মের শিশুকে বন্ধু হিসেবে নয়, ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে। সেখান থেকেই তৈরি হয় আমরা এবং তারা। ইতিহাসের অসংখ্য সংঘাত, ধর্মীয় বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণার পেছনে এই মানসিক বিভাজনের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। শিশুর মনে যদি প্রথমেই মানবিক পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে ধর্মীয় পরিচয় তার ওপর আরোপিত বিভাজনের কারণ না হয়ে ব্যক্তিগত আত্মিক পছন্দের একটি অংশ হতে পারে।

একটি শিশুর প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত মানুষ। তারপর সে চাইলে নিজেকে নানা পরিচয়ে চিনতে পারে। কারণ মানবিকতা কোনো ধর্মের সম্পত্তি নয়। করুণা কোনো সম্প্রদায়ের একচেটিয়া অধিকার নয়। সত্যবাদিতা কোনো ধর্মগ্রন্থের একক আবিষ্কার নয়। ন্যায়বোধ কোনো জাতির উত্তরাধিকার নয়। একজন মানুষ ভালো হতে পারে কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে, আবার ধর্মীয় পরিচয় থাকা সত্ত্বেও অমানবিক হতে পারে। একইভাবে ধর্মহীন একজন মানুষও গভীর নৈতিকতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার অধিকারী হতে পারে। নৈতিকতার মূল উৎসকে যদি কেবল একটি পরিচয়ের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়, তবে আমরা মানুষের অন্তর্গত বিবেকের বিশালতাকে ছোট করে ফেলি।

দর্শনের ইতিহাস আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মানুষ যখন নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করেছে, তখন কোনো একটি উত্তরেই তার চিন্তার সমাপ্তি ঘটেনি। সক্রেটিস প্রশ্ন করেছেন, প্লেটো আদর্শের জগৎ নির্মাণ করেছেন, এরিস্টটল যুক্তির কাঠামো নির্মাণ করেছেন, বুদ্ধ দুঃখ ও মুক্তির প্রশ্ন নিয়ে ভাবেছেন, উপনিষদ আত্মা ও ব্রহ্মের সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছে, কনফুসিয়াস নৈতিক সমাজের কথা বলেছেন, ডেকার্ট সন্দেহকে জ্ঞানের পদ্ধতি করেছেন, কান্ট মানুষের নৈতিক স্বাধীনতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন, আর আধুনিক বিজ্ঞান প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের বহু পুরোনো ধারণাকে পুনর্গঠন করেছে। দর্শনের সৌন্দর্য তার চূড়ান্ত উত্তরে নয়, বরং প্রশ্নকে জীবিত রাখার ক্ষমতায়। সুতরাং শিশুকে কোনো দর্শনের চূড়ান্ত উত্তর দিয়ে দেওয়ার চেয়ে তাকে দর্শনের প্রশ্নগুলো করতে শেখানো অনেক বেশি মানবিক।

শিশুর স্বাধীনতার অর্থ তাকে একা ছেড়ে দেওয়া নয়। স্বাধীনতা কখনো দায়িত্বহীনতার নাম নয়। শিশুর জন্য পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের দায়িত্ব অপরিসীম। তাকে নিরাপত্তা দিতে হবে, ভালোবাসা দিতে হবে, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দিতে হবে, ভাষা ও গণিতের ভিত্তি শেখাতে হবে, শিল্প ও বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় করাতে হবে, ইতিহাস জানতে দিতে হবে, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তাকে নৈতিকতার আলোয় বড় করতে হবে। কিন্তু নৈতিকতা আর মতবাদ এক জিনিস নয়। একটি শিশুকে শেখানো যায় যে অন্যকে কষ্ট দেওয়া অন্যায়, কিন্তু তাকে এমন কোনো মতবাদে আবদ্ধ করার প্রয়োজন নেই যার কারণে সে অন্য মতের মানুষকে ঘৃণা করবে। তাকে শেখানো যায় যে মানুষের জীবন মূল্যবান, কিন্তু তার আত্মার চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে তাকে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করার প্রয়োজন নেই।

আজকের পৃথিবী বহুত্বের পৃথিবী। একই শহরে, একই বিদ্যালয়ে, একই কর্মক্ষেত্রে নানা ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি ও জীবনদৃষ্টির মানুষ পাশাপাশি বাস করে। এই বাস্তবতায় শিশুকে যদি শেখানো হয় যে কেবল তার জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয়ই সত্য, তবে সে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হবে না। তাকে শেখাতে হবে ভিন্নতার সঙ্গে বসবাসের শিল্প। তাকে শেখাতে হবে, তুমি আমার মতো নও বলেই তুমি আমার শত্রু নও। তুমি ভিন্নভাবে প্রার্থনা করো, কিংবা কোনো প্রার্থনাই করো না, তবু তোমার মানবিক মর্যাদা আমার সমান। সভ্যতার ভবিষ্যৎ এই বোধের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট করার সবচেয়ে সূক্ষ্ম পদ্ধতিগুলোর একটি হলো তাকে এমন একটি নিশ্চিততার মধ্যে বড় করা, যেখানে প্রশ্নের কোনো স্থান নেই। কারণ ভুল উত্তর যতটা ক্ষতিকর, প্রশ্নহীনতা তার চেয়েও ভয়ংকর। ভুল জ্ঞান সংশোধন করা যায়, কিন্তু প্রশ্ন করার ক্ষমতা যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে মানুষ নিজের ভুলকেও সত্য বলে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে। তাই শিশুকে সব উত্তর দেওয়ার চেয়ে তাকে ভালো প্রশ্ন করতে শেখানো জরুরি। তাকে বলতে হবে, পৃথিবীকে তুমি দেখো, জানো, বোঝো, প্রশ্ন করো। আজ যা সত্য বলে মনে হচ্ছে, আগামীকাল তার আরও গভীর ব্যাখ্যা আবিষ্কৃত হতে পারে। জ্ঞান কখনো সম্পূর্ণতার অহংকার নয়, বরং অসম্পূর্ণতার বিনয়।

এই প্রসঙ্গে একটি গভীর নৈতিক সত্য সামনে আসে। বাবা মা সন্তানের শরীরের জন্ম দিতে পারেন, কিন্তু তার চেতনার মালিক হতে পারেন না। তারা তার শৈশবের আশ্রয় হতে পারেন, কিন্তু তার সমগ্র ভবিষ্যতের স্থপতি হতে পারেন না। একটি শিশুকে নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের যন্ত্রে পরিণত করা যেমন অন্যায়, তেমনি নিজের অসম্পূর্ণ বিশ্বাস পূরণের বাহন বানানোও অন্যায়। সন্তানকে আমরা প্রায়ই বলি, তুমি আমার সন্তান। অথচ আরও গভীর সত্য হলো, সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তার জীবন আমাদের ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু আমাদের মালিকানার সঙ্গে নয়।

একদিন সেই শিশুই বড় হবে। সে প্রেমে পড়বে, ব্যর্থ হবে, সাফল্য পাবে, প্রশ্ন করবে, বিশ্বাস বদলাবে, হয়তো কোনো বিশ্বাস গ্রহণ করবে, হয়তো প্রত্যাখ্যান করবে। সে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে। সেই দিনটির জন্য তাকে প্রস্তুত করাই আমাদের কর্তব্য। তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত নয়, যাতে সে কেবল আমাদের কণ্ঠস্বরের পুনরাবৃত্তি করে। বরং এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত, যাতে একদিন সে নিজের কণ্ঠ খুঁজে পায়। আমরা যদি সত্যিই সন্তানকে ভালোবাসি, তবে তার স্বাধীন চিন্তার জন্মকে ভয় না পেয়ে তাকে স্বাগত জানাতে হবে।

মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় অর্জন কেবল প্রযুক্তি নয়, কেবল মহাকাশযান নয়, কেবল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছে যে অন্য মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদার মূল্য আছে। সেই মানবিক অগ্রযাত্রার পরবর্তী অধ্যায় হতে পারে শিশুর চিন্তার স্বাধীনতাকে স্বীকার করা। একটি শিশু কোন পরিবারে জন্মাবে, কোন দেশে জন্মাবে, কোন ভাষা শুনে বড় হবে, কোন আর্থিক বাস্তবতার মধ্যে তার শৈশব কাটবে, এগুলোর অধিকাংশই সে নিজে বেছে নিতে পারে না। তার জন্ম তার পছন্দ নয়। তাহলে জন্মের সঙ্গে তার ওপর এমন একটি চূড়ান্ত বিশ্বাসের ভার চাপিয়ে দেওয়া কেন ন্যায়সংগত হবে, যা সে নিজে কখনো নির্বাচন করেনি?

কোনো শিশুকে ধর্মহীন করে তোলাই লক্ষ্য নয়, কোনো ধর্ম থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়াও লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য একটাই, শিশুকে তার নিজের মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া। সে বড় হয়ে যদি ধর্মে আশ্রয় খুঁজে পায়, সেটি তার স্বাধীন অনুসন্ধানের ফল হোক। যদি দর্শনে শান্তি খুঁজে পায়, সেটিও তার নিজের আবিষ্কার হোক। যদি বিজ্ঞানে সত্যের সন্ধান পায়, তাকে সেই পথেও যেতে দেওয়া হোক। যদি কোনো বিশ্বাস তার কাছে অর্থহীন মনে হয়, সেই সিদ্ধান্তের অধিকারও তার থাকুক। কারণ স্বাধীনতার প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই, সেখানে গ্রহণের পাশাপাশি প্রত্যাখ্যানের অধিকারও থাকে।

শিশুর মনকে কোনো মতবাদের কারখানা বানানো যাবে না। তাকে কোনো ধর্মের সৈনিক, কোনো দর্শনের অনুগত, কোনো সামাজিক বিভাজনের বাহক কিংবা কোনো পূর্বপুরুষের অসমাপ্ত বিতর্কের উত্তরাধিকারী বানানো উচিত নয়। তাকে মানুষ হতে দিতে হবে। তাকে আকাশ দেখতে দিতে হবে, মাটির গন্ধ নিতে দিতে হবে, বই পড়তে দিতে হবে, গান শুনতে দিতে হবে, প্রশ্ন করতে দিতে হবে, ভুল করতে দিতে হবে, আবার উঠে দাঁড়াতে দিতে হবে। তার বিস্ময়কে হত্যা করা যাবে না। কারণ বিস্ময় থেকেই প্রশ্ন জন্মায়, প্রশ্ন থেকে জ্ঞান, জ্ঞান থেকে প্রজ্ঞা, আর প্রজ্ঞা থেকেই মানুষের সত্যিকারের মুক্তি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, প্রশ্নটি মানুষের পক্ষে। প্রশ্নটি কোনো ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নয়, প্রশ্নটি শিশুর স্বাধীনতার পক্ষে। প্রশ্নটি কোনো দর্শনকে অপমান করার নয়, প্রশ্নটি দর্শনের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষার। কারণ যে দর্শন সত্যকে ভালোবাসে, সে স্বাধীন অনুসন্ধানকে ভয় করবে না। যে ধর্ম সত্য ও মানবিকতার কথা বলে, সে শিশুর মনকে বন্দী করতে চাইবে না। যে পরিবার সত্যিই সন্তানকে ভালোবাসে, সে তার হাতে নিজের বিশ্বাসের শিকল তুলে দেবে না, বরং তার হাতে একটি প্রদীপ তুলে দেবে, যাতে সে নিজের পথ নিজেই দেখতে পারে।

প্রতিটি শিশু একটি অসমাপ্ত কবিতা। তার প্রথম পংক্তি আমরা লিখে দিতে পারি, কিন্তু শেষ পংক্তি আমাদের লেখার অধিকার নেই। প্রতিটি শিশু একটি অমুদ্রিত বই। তার প্রচ্ছদ আমরা সাজিয়ে দিতে পারি, কিন্তু তার প্রতিটি অধ্যায়ের ভাষা নির্ধারণ করতে পারি না। প্রতিটি শিশু একটি অঙ্কুরিত বৃক্ষ। তাকে মাটি, জল, আলো ও আশ্রয় দিতে হয়, কিন্তু তার শাখাগুলো কোন আকাশের দিকে ছড়াবে, সেই সিদ্ধান্ত প্রকৃতির নিজের। আমাদের কাজ তাকে বড় করা, নিজের প্রতিচ্ছবিতে ছোট করা নয়।

তাই শিশুর অধিকার নিয়ে যখন আমরা কথা বলি, তখন শুধু তার খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার কথা বললেই চলবে না। তার চিন্তার নিরাপত্তার কথাও বলতে হবে। তার প্রশ্নের অধিকার, সংশয়ের অধিকার, অনুসন্ধানের অধিকার, বিশ্বাস করার অধিকার এবং একদিন নিজের বিশ্বাস নির্বাচন বা প্রত্যাখ্যান করার অধিকারও তার মানবিক অধিকারের অংশ। জন্ম তাকে একটি পরিবার দিয়েছে, একটি ভাষা দিয়েছে, একটি সংস্কৃতি দিয়েছে। কিন্তু জন্ম তার বিবেকের মালিকানা কাউকে দেয়নি।

একটি সভ্য পৃথিবীর স্বপ্ন তাই এমন হওয়া উচিত, যেখানে কোনো শিশু জন্মের মুহূর্তেই কোনো মতবাদের বন্দী হয় না। যেখানে তাকে বলা হয় না, তোমার হয়ে আমরা সব সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি। বরং বলা হয়, এই পৃথিবী তোমার সামনে খোলা। শিখো, দেখো, প্রশ্ন করো, ভালোবাসো, ভুল করো, আবার শিখো। পৃথিবীর সব জ্ঞান তোমার সামনে রাখা হলো, কিন্তু কোন সত্য তোমার অন্তরে সত্য হয়ে উঠবে, সেই সিদ্ধান্ত একদিন তুমি নিজেই নেবে। কারণ মানুষকে মানুষ করে তোলার সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাসের উত্তরাধিকার নয়, স্বাধীনভাবে সত্যের সন্ধান করার সাহস।

প্রতিটি শিশু তার নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার অধিকার রাখে। তার জন্ম তার পরিচয়ের শুরু হতে পারে, কিন্তু তার চিন্তার শেষ কথা নয়। তাকে উত্তরাধিকার দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু উত্তরাধিকারকে তার ভাগ্য বানিয়ে দেওয়া যায় না। তার হাতে বিশ্বাস তুলে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বিবেক কেড়ে নেওয়া যায় না। শিশুর মন কোনো ধর্মের সম্পত্তি নয়, কোনো দর্শনের সম্পত্তি নয়, কোনো পরিবারের সম্পত্তি নয়। শিশুর মন তার নিজের। আর সেই মনকে মুক্ত, জিজ্ঞাসু, মানবিক ও স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হতে দেওয়াই আমাদের সময়ের অন্যতম গভীর নৈতিক দায়িত্ব।

প্রদ্যোত
(শিক্ষা ও সংস্কৃতি কর্মী)