← Back to writing

দেহের ভিতর দীপ জ্বলে

দেহের ভিতর দীপ জ্বলে

মানুষের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভুলগুলোর একটি হলো শরীরকে আত্মার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো। যেন শরীর যত নিচে নামবে, আত্মা তত ওপরে উঠবে; আকাঙ্ক্ষা যত নিঃশেষ হবে, মানুষ তত পবিত্র হবে। অথচ মানুষ তো শরীরের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয়, শরীরের মধ্য দিয়েই পৃথিবীকে অনুভব করে, ভালোবাসে, স্পর্শ করে, কাঁদে, আনন্দ পায় এবং অন্য একটি প্রাণের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করে। শরীরকে অস্বীকার করে আত্মাকে খোঁজা তাই অনেক সময় নিজের অস্তিত্বের দরজাটিই বন্ধ করে দিয়ে আকাশ খোঁজার মতো। মানুষের গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের একটি বিস্ময়কর দিক হলো, বহু সাধক বরং শরীরের মধ্যেই সেই অদৃশ্য রহস্যের সন্ধান করেছেন।

বাংলার বাউল দর্শনে এই উপলব্ধি এক অনন্য রূপ পেয়েছে। লালন ফকিরের দেহতত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষকে বাদ দিয়ে দূরের কোনো অদৃশ্য সত্তার সন্ধান অসম্পূর্ণ। “যা কিছু আছে এই ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে” ধরনের দেহকেন্দ্রিক বোধের মধ্যে শরীর কেবল মাংস, রক্ত ও অস্থির সমষ্টি নয়; শরীর হয়ে ওঠে এক মহাবিশ্বের প্রতীক। মানুষের দেহই অনুসন্ধানের ক্ষেত্র, মানুষই সাধনার আয়না, আর মানুষের অন্তরেই অজানাকে জানার সম্ভাবনা। লালনের দর্শনকে তাই কেবল যৌনতার দর্শন হিসেবে পড়া ভুল। তাঁর দেহতত্ত্বের গভীরে রয়েছে আত্মপরিচয়, মানবপ্রেম, গুরুবোধ, অন্তর্জাগরণ এবং বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের সন্ধান।

বাউল দেহতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সত্যকে কেবল বাইরে খুঁজলে তাকে পাওয়া যায় না। মন্দির, মসজিদ, মঠ, উপাসনালয়, শাস্ত্র ও আচার মানুষের অনুসন্ধানের বাহ্যিক অবলম্বন হতে পারে, কিন্তু যে মানুষ নিজের দেহ ও মনকে চিনতে শেখেনি, সে নিজের অস্তিত্বের রহস্য কীভাবে চিনবে? লালনের প্রশ্নের শক্তি এখানেই। তিনি মানুষকে বাইরের পরিচয়ের আগে নিজের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজতে আহ্বান করেন। তাঁর কাছে দেহ কোনো অপবিত্র বস্তু নয়; দেহ হলো সাধনার ক্ষেত্র।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ভারতীয় যোগ ও তান্ত্রিক পরম্পরার কিছু গভীর সংযোগ আছে, যদিও তাদের এক করে দেখা উচিত নয়। যোগের বহু ধারায় শরীরকে চেতনার পথে একটি যন্ত্র বা ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শ্বাস, ইন্দ্রিয়, মন, প্রাণশক্তি, ধ্যান এবং আত্মসংযমের মাধ্যমে সাধক নিজের চেতনাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখেন। পতঞ্জলীয় যোগে যেমন চিত্তের বিক্ষেপ প্রশমনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি হঠযোগের নানা ধারায় শরীরকে সাধনার উপযোগী করে তোলার জন্য আসন, প্রাণায়াম, মুদ্রা ও অন্যান্য অনুশীলন বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ যোগের গভীর শিক্ষা শরীরকে ঘৃণা করা নয়; বরং শরীর ও মনকে এমনভাবে জানা, যাতে মানুষ নিজের চেতনার প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারে।

তন্ত্রের কিছু ধারায় এই অনুসন্ধান আরও সাহসী হয়ে ওঠে। সেখানে মানবজীবনের যে শক্তিগুলোকে সাধারণত দমন বা অস্বীকার করা হয়, সেগুলোকেও চেতনার রূপান্তরের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। যৌনতা সেই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ও কখনো নির্দিষ্ট সাধনপদ্ধতির অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু তন্ত্রকে কেবল যৌনসাধনা হিসেবে দেখাও গুরুতর ভুল। তন্ত্রের বিস্তৃত ঐতিহ্যে মন্ত্র, ধ্যান, দেবীচেতনা, শরীর, শক্তি, প্রতীক, শ্বাস, আচার এবং চেতনার রূপান্তর নানা স্তরে কাজ করেছে। কিছু নির্দিষ্ট তান্ত্রিক ধারায় যৌন মিলনকে সাধনার অংশ হিসেবে দেখা হলেও, সেটি সমগ্র তন্ত্রের সংজ্ঞা নয়।

এখানেই একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য সামনে আসে। মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে কেবল দমন করলেই মানুষ মুক্ত হয় না। আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে হয়। নিজের মধ্যে যে টান, ক্ষুধা, ভয়, আকর্ষণ, ঈর্ষা ও ভালোবাসা কাজ করছে, তাকে সচেতনতার আলোয় দেখতে হয়। কারণ মানুষ যে প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে, সেটি অনেক সময় অচেতন স্তরে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। যোগের আত্মসংযম এবং তান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্যে পথ আলাদা হলেও উভয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো নিজের অভ্যন্তরীণ শক্তির সঙ্গে সচেতন সম্পর্ক স্থাপন করা।

এই জায়গায় “কামনা” শব্দটির অর্থও নতুন করে বুঝতে হয়। কামনা শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা নয়। মানুষ চায় ভালোবাসা, স্বীকৃতি, নিরাপত্তা, সান্নিধ্য, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, সাফল্য এবং অমরত্বের অনুভূতি। যৌন আকাঙ্ক্ষা এই বৃহৎ মানবিক আকাঙ্ক্ষার একটি শক্তিশালী প্রকাশ। তাই শরীরের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে গেলে মানুষের একাকিত্বকেও বুঝতে হয়। মানুষ অনেক সময় শরীরের কাছে যায়, কিন্তু তার অন্তর্গত প্রয়োজন থাকে হৃদয়ের কাছে যাওয়া। সে স্পর্শ চায়, কিন্তু আসলে চায় গ্রহণযোগ্যতা। সে মিলন চায়, কিন্তু গভীরে হয়তো সে বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি চায়।

লালনের দেহতত্ত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে তিনি মানুষের এই অন্তর্গত রহস্যকে কেবল নৈতিকতার কাঠামোয় আটকে রাখেন না। তাঁর দর্শনে “মানুষ” একটি গভীর অনুসন্ধানের বিষয়। মানুষকে না জেনে অদৃশ্যকে জানার দাবি তাঁর কাছে অর্থহীন হয়ে ওঠে। দেহ তাই তাঁর কাছে কেবল বস্তু নয়, রহস্যের দরজা। শরীরের মধ্যে যে প্রাণ, সেই প্রাণের মধ্যে যে চেতনা, সেই চেতনার মধ্যে যে অজানা প্রশ্ন, সেই প্রশ্নের অনুসন্ধানই সাধনার পথ।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পৃথিবীর নানা আধ্যাত্মিক পরম্পরার বিস্ময়কর কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়। প্রাচীন ভারতীয় যোগী থেকে শুরু করে তিব্বতের কিছু তান্ত্রিক সাধনা, চীনের দাওবাদী অন্তর্গত সাধনা, সুফি মরমিয়া ভাবনা এবং খ্রিস্টীয় মিস্টিকদের কিছু আত্মঅনুসন্ধানী ধারায় শরীর ও চেতনার সম্পর্ক নিয়ে গভীর চিন্তা হয়েছে। তাদের পদ্ধতি, ভাষা, দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব এক নয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন বহু জায়গায় ফিরে এসেছে: মানুষের ভেতরের শক্তি, আকাঙ্ক্ষা ও চেতনাকে কীভাবে এমনভাবে রূপান্তর করা যায়, যাতে মানুষ নিজের সংকীর্ণ সত্তাকে অতিক্রম করতে পারে?

দাওবাদী কিছু সাধনাপদ্ধতিতে যৌনশক্তি ও প্রাণশক্তির সম্পর্ক নিয়ে যে ধারণাগুলো গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর লক্ষ্য ছিল জীবনীশক্তিকে সচেতনভাবে পরিচালনা করা। তিব্বতি বৌদ্ধ তন্ত্রের কিছু উচ্চতর সাধনায় দেহ, শ্বাস, চেতনা এবং সূক্ষ্ম শক্তির ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে গভীর ধ্যান ও চেতনার রূপান্তরের জন্য। সুফি সাধনায় যৌনসাধনা সাধারণ কোনো পথ নয়; বরং সেখানে প্রেম, আকুলতা, আত্মবিসর্জন এবং প্রিয়তমের সঙ্গে আত্মিক ঐক্যের রূপক শক্তিশালী। খ্রিস্টীয় মিস্টিকদের অনেকের কাছে প্রেমের ভাষা কখনো এত গভীর হয়েছে যে মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের সীমারেখা রূপকের মধ্যে এসে মিলেছে। এসব ঐতিহ্যকে এক করে ফেলা যাবে না, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি মানবিক প্রশ্নের প্রতিধ্বনি শোনা যায়: মানুষ কীভাবে নিজের সীমাবদ্ধ সত্তাকে অতিক্রম করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কেউ আকাঙ্ক্ষাকে সংযত করেছেন, কেউ ধ্যানের মাধ্যমে তাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, কেউ প্রতীকের মাধ্যমে তাকে রূপান্তরের ভাষায় প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ প্রেমের মধ্যে আত্মবিসর্জনের পথ খুঁজেছেন। এখানেই বোঝা যায়, আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস আসলে মানুষের নিজের শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইতিহাসও।

তবে যৌনতাকে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম সতর্কতা জরুরি। যৌন আনন্দ নিজে আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়। যৌন আকাঙ্ক্ষার তীব্রতাও কোনো পরম সত্যের প্রমাণ নয়। যৌনতার মধ্যে যেমন আত্মঅতিক্রমের সম্ভাবনা আছে, তেমনি আত্মপ্রবঞ্চনার সম্ভাবনাও আছে। একজন মানুষ অন্য একজনকে ভালোবাসতে পারে, আবার সেই ভালোবাসার নামে তাকে অধিকারও করতে পারে। সে শরীরের ঘনিষ্ঠতাকে আত্মিক মিলন ভাবতে পারে, আবার নিজের ভোগকে আধ্যাত্মিকতার ভাষায় বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাও করতে পারে। তাই পবিত্রতার মূল শর্ত শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা নয়, চেতনার সততা।

সত্যিকারের ঘনিষ্ঠতা শুরু হয় সম্মতি থেকে এবং পূর্ণতা পায় পারস্পরিক মর্যাদায়। যেখানে একজন অন্যজনের শরীরকে নিজের অধিকার মনে করে, সেখানে আধ্যাত্মিকতার আলো খুব দ্রুত নিভে যায়। যেখানে একজন অন্যজনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন একজন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে, সেখানে ঘনিষ্ঠতা হয়ে ওঠে বিশ্বাসের ক্ষেত্র। ভালোবাসাপূর্ণ যৌন সম্পর্কের গভীরতা তাই কেবল শরীরের মিলনে নয়; বরং নিরাপত্তা, বিশ্বাস, কোমলতা, দায়িত্ব, পারস্পরিক গ্রহণ এবং আত্মউন্মোচনের মধ্যে।

এইখানে লালনের মানবতাবাদী দেহতত্ত্ব নতুন অর্থ পায়। দেহকে পবিত্র বলার অর্থ শরীরকে ভোগের বস্তু বানানো নয়। বরং শরীরের মধ্য দিয়ে যে মানুষটি প্রকাশিত হচ্ছে, তাকে পূর্ণ মর্যাদায় দেখা। অন্যের শরীরকে সম্মান করা মানে তার স্বাধীন অস্তিত্বকে সম্মান করা। নিজের শরীরকে সম্মান করা মানে নিজের আকাঙ্ক্ষা ও সীমারেখাকেও সম্মান করা। এই পারস্পরিক সম্মান ছাড়া কোনো মিলনই সত্যিকার অর্থে পূর্ণ হতে পারে না।

দেহতত্ত্বের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হয়তো এই যে, শরীরকে অতিক্রম করতে হলেও প্রথমে শরীরকে জানতে হয়। নিজের শ্বাস না জেনে ধ্যান করা যায় না, নিজের মন না জেনে আত্মজ্ঞান সম্ভব নয়, নিজের আকাঙ্ক্ষাকে না জেনে আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে ওঠার কথাও অর্থহীন। মানুষ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকেই তার যাত্রা শুরু। তাই নিজের বর্তমান অবস্থাকে অস্বীকার নয়, প্রত্যক্ষ করাই সাধনার প্রথম ধাপ।

এই কারণেই প্রাচীন সাধকেরা কখনো কখনো শরীরকে একটি ক্ষুদ্র মহাবিশ্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মানুষের শরীরে জন্মের রহস্য আছে, মৃত্যুর রহস্য আছে, শ্বাসের রহস্য আছে, স্মৃতির রহস্য আছে, আকাঙ্ক্ষার রহস্য আছে, ভালোবাসার রহস্য আছে। মানুষের মস্তিষ্কে চিন্তা জন্ম নেয়, হৃদয়ে অনুভূতি জাগে, স্নায়ুতন্ত্রে স্পর্শের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, হরমোন ও নিউরোকেমিক্যাল পরিবর্তনে আকর্ষণ ও সংযুক্তির অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের এই প্রক্রিয়াগুলোর জৈবিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু ব্যাখ্যা পাওয়া মানেই রহস্য শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং আমরা যত বেশি জানি, ততই বুঝি মানুষ কত অসীম জটিল।

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান আমাদের দেখিয়েছে যে যৌন আকর্ষণ, প্রেম এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্ধনের সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া যুক্ত। আকর্ষণে ডোপামিনসহ পুরস্কারব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধনে অক্সিটোসিন ও ভাসোপ্রেসিনসহ নানা জৈবিক প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ভালোবাসাকে কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নামিয়ে আনা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করে তাকে কেবল অতীন্দ্রিয় রহস্য বলা একইভাবে অসম্পূর্ণ। মানুষ একই সঙ্গে জীববৈজ্ঞানিক প্রাণী, মনস্তাত্ত্বিক সত্তা এবং অর্থ নির্মাণকারী চেতনাসম্পন্ন অস্তিত্ব।

এই বহুমাত্রিকতাই মানুষের যৌনতাকে এত গভীর করে। শরীর তার জৈবিক ভাষায় কথা বলে, মন তার আবেগের ভাষায় কথা বলে, সম্পর্ক তার নৈতিক ভাষায় কথা বলে, আর চেতনা তার অর্থের ভাষায় কথা বলে। চারটি ভাষা যখন পরস্পরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে যায়, তখন একটি মানবিক সম্পর্ক গভীর হয়ে ওঠে। আর যখন একটিকে অন্যটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিকৃতি জন্ম নেয়।

তাই আধ্যাত্মিকতার প্রকৃত অর্থ যদি হয় নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ক্রমশ গভীরতর সচেতন হওয়া, তাহলে শরীর সেই সাধনার শত্রু নয়। শরীর হলো প্রথম আশ্রম। শ্বাস হলো প্রথম মন্ত্র। অনুভূতি হলো প্রথম পাঠ। আকাঙ্ক্ষা হলো প্রথম প্রশ্ন। ভালোবাসা হলো প্রথম আয়না। আর আত্মসচেতনতা হলো সেই প্রদীপ, যার আলোয় মানুষ নিজের ভেতরের অন্ধকারকে দেখতে শেখে।

লালনের দেহতত্ত্ব আমাদের এখানেই একটি বিপ্লবী শিক্ষা দেয়: মানুষকে বাদ দিয়ে সত্যকে খুঁজো না। নিজের ভেতরের মানুষটিকে না জেনে বাইরের অসীমকে জানার দাবি করো না। শরীরকে অপমান করে পবিত্রতা অর্জনের চেষ্টা করো না। আবার শরীরের আনন্দকে চূড়ান্ত সত্য ভেবেও থেমে যেও না। শরীরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করো, কিন্তু শরীরেই আটকে থেকো না। আকাঙ্ক্ষাকে দেখো, তাকে বোঝো, তার উৎসের দিকে তাকাও। তারপর প্রশ্ন করো, এই আকাঙ্ক্ষার গভীরে আসলে কী আছে?

হয়তো সেখানে আছে ভালোবাসার ক্ষুধা। হয়তো আছে একাকিত্বের ভয়। হয়তো আছে নিজের অস্তিত্বকে অন্যের মধ্যে অনুভব করার আকুলতা। হয়তো আছে সৃষ্টির প্রাচীনতম তাগিদ। আর হয়তো এসবের গভীরে রয়েছে এমন এক ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা, যার ভাষা ধর্ম ভেদে বদলায়, সংস্কৃতি ভেদে বদলায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তার স্পন্দন বহু যুগ ধরে একই থাকে।

তখন যৌনতা আর কেবল শরীরের ঘটনা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে মানুষকে নিজের দিকে ফেরানোর একটি আয়না। প্রেম তখন কেবল কাউকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং নিজেকে উন্মুক্ত করার সাহস। মিলন তখন কেবল দুটি শরীরের সান্নিধ্য নয়, বরং দুটি স্বাধীন অস্তিত্বের পারস্পরিক বিশ্বাস। আর সাধনা তখন শরীরকে ত্যাগ করার নাম নয়, বরং শরীর, মন, আকাঙ্ক্ষা ও চেতনাকে এমন এক সমন্বয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া, যেখানে মানুষ নিজের মধ্যে বিভক্ত থাকে না।

সম্ভবত এই কারণেই পৃথিবীর বহু সাধনপথের গভীরে একই আকুলতা ফিরে আসে: বিচ্ছিন্নতা থেকে ঐক্যের দিকে যাত্রা। কেউ তাকে যোগ বলেছেন, কেউ ধ্যান, কেউ প্রেম, কেউ সাধনা, কেউ আত্মজ্ঞান, কেউ পরমের সন্ধান। পথগুলো এক নয়, দর্শনগুলোও এক নয়। কিন্তু মানুষের গভীর প্রশ্নটি আশ্চর্যভাবে এক: আমি কীভাবে নিজের সীমাবদ্ধ সত্তাকে অতিক্রম করে জীবনের বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে সংযুক্ত হব?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি ধর্ম, কোনো একটি সাধনপদ্ধতি কিংবা কোনো একটি দর্শনের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। কারণ মানুষ যেখানে আছে, সেখানেই তার সাধনার শুরু। তার শরীরেই তার প্রথম মন্দির, তার মনেই প্রথম অরণ্য, তার আকাঙ্ক্ষাতেই প্রথম ঝড়, তার ভালোবাসাতেই প্রথম নদী এবং তার আত্মসচেতনতাতেই প্রথম প্রদীপ।

শেষ পর্যন্ত আলোকিত হওয়া মানে নিজের মানবিকতাকে অস্বীকার করা নয়; বরং তাকে এত গভীরভাবে জানা, যাতে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার আর তাকে শাসন করতে না পারে। যৌনতাকে ভয় না করে তাকে বোঝা। আকাঙ্ক্ষাকে দেবত্ব না দিয়ে তাকে সচেতন করা। শরীরকে অপবিত্র না ভেবে তাকে সম্মান করা। ভালোবাসাকে অধিকার না বানিয়ে স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করা। আর নিজের আনন্দের সীমানা পেরিয়ে অন্যের অস্তিত্বের প্রতিও মমতা জন্মানো।

তখন দেহ আর কেবল দেহ থাকে না। দেহ হয়ে ওঠে জিজ্ঞাসা। আকাঙ্ক্ষা হয়ে ওঠে আয়না। প্রেম হয়ে ওঠে পথ। সচেতনতা হয়ে ওঠে প্রদীপ। আর মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, যে রহস্যকে সে এতদিন আকাশের ওপারে খুঁজছিল, তার একটি দরজা হয়তো তার নিজের শরীরের মধ্যেই ছিল।

লালনের দেহতত্ত্বের সবচেয়ে মানবিক শিক্ষা এবং পৃথিবীর নানা যোগী ও সাধকের গভীর অনুসন্ধানকে পাশাপাশি রাখলে তাই একটি অনন্ত সত্যের আভাস পাওয়া যায়: মানুষকে নিজের অস্তিত্ব থেকে পালিয়ে মুক্ত হতে হয় না; নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করেই তাকে মুক্তির পথ খুঁজতে হয়।

দেহের ভিতর দিয়েই চেতনার যাত্রা। আকাঙ্ক্ষার ভিতর দিয়েই আত্মজিজ্ঞাসা। ভালোবাসার ভিতর দিয়েই অপরকে জানার শিক্ষা। আর নিজের সীমারেখাকে অতিক্রম করতে করতে একদিন মানুষ হয়তো অনুভব করে, তার সবচেয়ে গভীর সাধনা কোনো দূরবর্তী আকাশে নয়, বরং এই স্পন্দিত জীবনের মধ্যেই।

দেহের ভিতরেই যে দীপ জ্বলে, তাকে দেখতে শেখাই হয়তো মানুষের প্রথম সত্যিকারের সাধনা।

প্রদ‍্যোত