প্রাপ্তির অতল অন্ধকারে
সন্দেহ, অধিকার ও হারিয়ে ফেলার মানুষের মনস্তত্ত্ব
মানুষের জীবনে কিছু প্রাপ্তি আসে এত সহজে, এত অপ্রত্যাশিতভাবে, যে তার সহজলভ্যতাই একদিন তাকে মূল্যহীন করে তুলতে শুরু করে। যে জিনিসের জন্য অন্য কেউ সারাজীবন অপেক্ষা করে, যে সম্পর্কের জন্য কেউ অসংখ্য জন্মের মতো দীর্ঘ একাকিত্ব পেরিয়ে যায়, যে ভালোবাসা পেতে মানুষের বহু দরজায় কড়া নাড়তে হয়, সেই ভালোবাসা যদি কারও জীবনে চাওয়ার আগেই এসে বসে, তখন মানুষ অনেক সময় তার সৌভাগ্যকে সৌভাগ্য বলে গ্রহণ করতে পারে না। বরং তার ভেতরে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত প্রশ্ন, “এত সহজে পেলাম কী করে?” এই প্রশ্নটি প্রথমে কৌতূহল, পরে সংশয়, তারপর সন্দেহ, এবং শেষ পর্যন্ত সন্দেহবাতিকতায় রূপ নেয়। মানুষ তখন প্রাপ্তির সৌন্দর্য উপভোগ না করে প্রাপ্তির সত্যতা পরীক্ষা করতে থাকে। ভালোবাসার উষ্ণতায় হাত না রেখে সে বারবার আগুনের দিকে তাকিয়ে দেখতে চায়, এই আগুন সত্যিই আগুন তো, নাকি কেবল আলো ফেলার কোনো কৌশল। অথচ জীবনের অনেক সত্য প্রমাণের অপেক্ষায় থাকে না। কিছু সত্য অনুভব করতে হয়, ধারণ করতে হয়, তার পাশে শান্ত হয়ে বসতে হয়।
সন্দেহবাতিক মন আসলে কখনো বর্তমানের মধ্যে বাস করে না। সে সবসময় ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য বিপর্যয় কিংবা অতীতের কোনো অদৃশ্য ব্যাখ্যার মধ্যে বসবাস করে। আজ যে মানুষটি ভালোবাসছে, সন্দেহবাতিক মন তার ভালোবাসার মধ্যে আগামীকালের প্রতারণা খুঁজে বেড়ায়। আজ যে হাতটি ধরে আছে, সে হাত কখন ছেড়ে যাবে, সেই আশঙ্কা তাকে আজকের স্পর্শটুকুও উপভোগ করতে দেয় না। ফলে যে মানুষটি ভালোবাসা পেয়েছে, সে ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে বসবাস করতে করতে ধীরে ধীরে তার নিজের ভয়ের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করে। তার চোখ তখন মানুষকে দেখে না, সম্ভাবনাকে দেখে। তার কান কথা শোনে না, কথার অন্তর্লুকানো অর্থ খুঁজে বেড়ায়। একটি স্বাভাবিক নীরবতা তার কাছে রহস্য হয়ে ওঠে, সামান্য দূরত্ব হয়ে ওঠে প্রত্যাখ্যানের পূর্বাভাস, অন্য কারও সঙ্গে একটি সাধারণ কথোপকথন হয়ে ওঠে বিশ্বাসঘাতকতার সম্ভাব্য প্রমাণ। এভাবেই সন্দেহ বাস্তবতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে এবং মানুষ নিজেরই নির্মিত ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে একদিন প্রকৃত মানুষটিকে হারিয়ে ফেলে।
প্রাপ্তির অমূল্যায়নের সঙ্গে সন্দেহের একটি গভীর সম্পর্ক আছে। মানুষ যা সহজে পায়, তার প্রতি তার বিস্ময় ধীরে ধীরে কমে যায়। যে ফুলটি পাওয়ার জন্য সে একদিন উদগ্রীব ছিল, প্রতিদিন হাতে পাওয়ার পর একসময় তার চোখ ফুলের সৌন্দর্য নয়, পাপড়ির দাগ খুঁজতে শুরু করে। যে মানুষটি একদিন তার কাছে আশ্রয় ছিল, তাকে সে একসময় সম্পত্তি ভাবতে শুরু করে। ভালোবাসা তখন আর সম্পর্ক থাকে না, হয়ে ওঠে অধিকার। যত্ন তখন স্বাধীনতার ভাষা না হয়ে নিয়ন্ত্রণের ভাষা হয়ে ওঠে। “তুমি আমার” এই বাক্যটি যখন ভালোবাসার মাধুর্য অতিক্রম করে মালিকানার ঘোষণা হয়ে ওঠে, তখন সম্পর্কের ভেতর অদৃশ্য শিকল জন্ম নেয়। মানুষ ভুলে যায়, ভালোবাসা কাউকে নিজের করে পাওয়ার নাম নয়, বরং এমন এক পরিসর সৃষ্টি করার নাম যেখানে দুজন মানুষ নিজেদের স্বাধীন সত্তা অক্ষুণ্ণ রেখেও একে অন্যের কাছে নিরাপদ থাকতে পারে।
প্রকৃতির প্রতিটি সম্পর্কেরই একটি স্থিতিস্থাপকতা আছে। একটি সুতো যতটা টান সহ্য করতে পারে, তারও একটি সীমা থাকে। সম্পর্কও তেমন। সেখানে অভিমান থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, দূরত্ব থাকবে, ভুল বোঝাবুঝি থাকবে, আবার ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাও থাকবে। কিন্তু যখন অধিকারবোধ ভালোবাসাকে অতিক্রম করে যায়, যখন প্রতিটি নিঃশ্বাসের হিসাব চাওয়া হয়, প্রতিটি নীরবতার ব্যাখ্যা দাবি করা হয়, প্রতিটি ব্যক্তিগত পরিসরকে অনধিকার প্রবেশের বিষয় মনে করা হয়, তখন সম্পর্কের সুতোয় ক্রমাগত টান পড়তে থাকে। একসময় সেই টান আর স্থিতিস্থাপক থাকে না। সুতো ছিঁড়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, যে মানুষটি সম্পর্কটিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে গিয়ে এত শক্ত করে টেনেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই শক্ত হাতই সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত আঁকড়ে ধরা অনেক সময় ধরে রাখে না, বরং ছেড়ে দিতে বাধ্য করে।
মানুষের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা হলো, সে যাকে হারানোর ভয় করে তাকে আরও বেশি করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। কিন্তু ভালোবাসা নিয়ন্ত্রণের বস্তু নয়। নদীকে মুঠোয় ধরতে গেলে নদী থাকে না, কেবল ভেজা হাতটুকু থাকে। পাখিকে ভালোবাসার নামে খাঁচায় বন্দী করলে পাখি কাছে থাকে ঠিকই, কিন্তু তার গান হারিয়ে যায়। তেমনি কোনো মানুষকে নিজের পৃথিবীর সম্পূর্ণ কেন্দ্র করে ফেললে তার চারপাশে এমন এক অদৃশ্য বেষ্টনী তৈরি হয়, যেখানে ভালোবাসা ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধ হতে থাকে। মানুষের নিজের একটি অন্তর্জগৎ আছে, তার নিজস্ব নীরবতা আছে, বন্ধুত্ব আছে, স্মৃতি আছে, স্বপ্ন আছে, ব্যক্তিগত আকাশ আছে। সেই আকাশকে সম্পূর্ণ নিজের করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা যত বাড়ে, ততই সম্পর্কের আকাশ ছোট হতে থাকে। অথচ ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য হলো, দুইটি পৃথক আকাশ পাশাপাশি থেকেও একই চাঁদের আলো ভাগ করে নিতে পারে।
সন্দেহের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি প্রমাণের অপেক্ষা করে না। সন্দেহ নিজেই নিজের প্রমাণ তৈরি করে। মানুষ যখন কোনো কিছু সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন তার মস্তিষ্ক বাস্তবতার মধ্যে সেই সন্দেহকে সমর্থন করে এমন লক্ষণ খুঁজতে থাকে। একটি নিরপেক্ষ ঘটনা তার কাছে পক্ষপাতদুষ্ট অর্থ পায়, একটি সাধারণ বাক্য হয়ে ওঠে গোপন সংকেত, একটি অনুপস্থিতি হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্র, একটি পরিবর্তিত স্বর হয়ে ওঠে ভালোবাসা কমে যাওয়ার প্রমাণ। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তবতার সঙ্গে নয়, নিজের ব্যাখ্যার সঙ্গে বসবাস করতে থাকে। এই অবস্থায় সম্পর্কের অন্য মানুষটি যতই সত্যবাদী হোক, যতই বিশ্বস্ত হোক, সন্দেহবাতিক মন তার সততার মধ্যেও অসততার সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে পারে। কারণ তখন সমস্যা আর বাইরের মানুষের আচরণে থাকে না, সমস্যাটি বাসা বাঁধে দেখার চোখের মধ্যে।
এখানেই মানুষের আত্মবিধ্বংসী প্রবণতার এক গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে। মানুষ অনেক সময় যা সবচেয়ে বেশি চায়, সেটিই নিজের আচরণ দিয়ে নষ্ট করে ফেলে। হারানোর ভয়ে সে এত বেশি আঁকড়ে ধরে যে, তার আঁকড়ে ধরা হয়ে ওঠে হারানোর কারণ। ভালোবাসা হারানোর ভয়ে সে এত প্রশ্ন করে যে, ভালোবাসার মানুষটি একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বিশ্বাস হারানোর ভয়ে সে এত পরীক্ষা নেয় যে, বিশ্বাসের জায়গাটিই ধ্বংস হয়ে যায়। একাকিত্বের ভয়ে সে অন্যের ব্যক্তিগত পরিসর গ্রাস করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত এমন এক নিঃসঙ্গতা অর্জন করে, যেখানে পাশে কেউ নেই, অথচ নিজের সন্দেহের প্রতিধ্বনি চারদিকে অনবরত বাজতে থাকে। এই নিঃসঙ্গতা সবচেয়ে নির্মম, কারণ এখানে মানুষ অন্যকে হারানোর আগে নিজের শান্তিকে হারিয়ে ফেলে।
অধিগ্রহণের এই প্রবণতা কেবল সম্পর্কের মধ্যে নয়, মানুষের সমগ্র জীবনবোধের মধ্যেই কাজ করে। আমরা মানুষকে চাই, সম্পদ চাই, সাফল্য চাই, সম্মান চাই, স্বীকৃতি চাই, এমনকি স্মৃতির ওপরও অধিকার চাই। আমরা চাই যা ভালো তা আমাদের হোক, যা সুন্দর তা আমাদের কাছে থাকুক, যা প্রিয় তা কখনো পরিবর্তিত না হোক। কিন্তু জীবন কোনো সংগ্রহশালা নয়। জীবন প্রবাহ। এখানে কিছু আসে, কিছু থাকে, কিছু বদলে যায়, কিছু চলে যায়। যে মানুষ পরিবর্তনকে জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না, সে প্রতিটি পরিবর্তনকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করে। অথচ পরিবর্তন মানেই বিচ্ছেদ নয়, দূরত্ব মানেই অপ্রেম নয়, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানেই পরিত্যাগ নয়। কখনো কখনো মানুষ একটু দূরে সরে গিয়েই আবার আরও গভীরভাবে কাছে আসে। শ্বাস নেওয়ার জন্যও তো বুককে প্রসারিত হতে হয়।
প্রকৃত সুখের সঙ্গে তাই অধিকারবোধের একটি সূক্ষ্ম বিরোধ আছে। সুখ যত বেশি অধিকারনির্ভর হয়, তার ভিত তত দুর্বল হয়। কারণ তখন সুখ নির্ভর করে অন্য মানুষটি আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করছে কি না, সে আমার প্রতি কতটা মনোযোগ দিচ্ছে, কতটা সময় দিচ্ছে, কতটা আমার নিয়ন্ত্রণে আছে, তার ওপর। ফলে নিজের সুখের চাবিটি মানুষ নিজের পকেট থেকে বের করে অন্যের হাতে তুলে দেয়। অন্যজন একটু দেরি করলেই অশান্তি, একটু নীরব হলেই উদ্বেগ, নিজের মতো করে একটু বাঁচলেই অভিমান। এভাবে মানুষ নিজের শান্তির মালিকানা হারিয়ে ফেলে। অথচ শান্তি কোনো মানুষের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়ার বস্তু নয়। শান্তি হলো নিজের ভেতরে এমন একটি ঘর তৈরি করা, যেখানে অন্য কেউ থাকুক বা না থাকুক, জানালার পাশে একটু আলো এসে পড়ে।
সম্পর্কের গভীরতম সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই যে, সেখানে দুইজন মানুষ একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে পেয়ে গিয়েও সম্পূর্ণভাবে অধিকার করতে পারে না। কারণ কোনো মানুষই সম্পূর্ণভাবে অন্যের নয়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটি অজানা অঞ্চল থাকে, যেখানে সে নিজেই নিজের কাছে রহস্য। সেই রহস্যকে সম্মান করাও ভালোবাসার অংশ। কাউকে ভালোবাসা মানে তার সমস্ত দরজা ভেঙে তার ভেতরে ঢুকে পড়া নয়, বরং কিছু দরজা বন্ধ থাকলেও বাইরে বসে অপেক্ষা করার মতো পরিণত বিশ্বাস অর্জন করা। যে সম্পর্কের মধ্যে এই অবকাশ থাকে, সেখানে সন্দেহের জন্ম কম হয়, কারণ সেখানে মানুষ জানে, সবকিছু জানতে হয় না, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না, সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পেতে হয় না। কিছু নীরবতা নীরবতাই থাকতে পারে, তার পেছনে অপরাধের গল্প খুঁজে বের করার প্রয়োজন নেই।
মানুষের পরিণত বোধ শুরু হয় তখনই, যখন সে বুঝতে শেখে, প্রাপ্তি মানেই মালিকানা নয়। কেউ আমাকে ভালোবাসে বলে সে আমার সম্পত্তি হয়ে যায় না। কেউ আমার পাশে থাকে বলে তার সমগ্র জীবন আমার অনুমতিনির্ভর হয়ে যায় না। বরং সে তার স্বাধীন সত্তা নিয়ে আমার পাশে থেকেছে বলেই তার থাকা মূল্যবান। ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মল রূপ হলো সেই থাকা, যেখানে কেউ বাধ্য হয়ে থাকে না, ভয়ে থাকে না, নজরদারির কারণে থাকে না, বরং স্বাধীন হয়েও থাকতে চায়। সেখানে বিশ্বাস কোনো কাগজে স্বাক্ষর নয়, কোনো শপথের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং প্রতিদিনের স্বাভাবিক আচরণে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক নীরব নিশ্চয়তা।
সন্দেহবাতিকতা মানুষকে অন্যের সত্য যাচাই করতে করতে নিজের সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সে ক্রমাগত জানতে চায়, “ও আমাকে সত্যিই ভালোবাসে তো?” কিন্তু খুব কমই নিজেকে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি আমার ভালোবাসাকে এমন নিরাপদ রেখেছি, যেখানে অন্য মানুষটি স্বাধীনভাবে ভালোবাসতে পারে?” সে জানতে চায়, “ও আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?” অথচ প্রশ্ন করা দরকার, “আমি কি এমনভাবে তাকে ভালোবাসছি, যাতে সে আমার পাশে থাকতে চায়?” এই প্রশ্নের পরিবর্তনই মানুষের ভেতরে বিপুল পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় পাহারা নয়, এমন এক মানবিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে পালিয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন থাকে না।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে শিখতে হয়, ভালোবাসা ধরে রাখতে হয় না, ভালোবাসার উপযুক্ত হতে হয়। বিশ্বাস আদায় করতে হয় না, বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। সম্পর্ককে বেঁধে রাখতে হয় না, সম্পর্কের মধ্যে এমন উষ্ণতা সৃষ্টি করতে হয় যাতে বন্ধন নিজেই টিকে থাকতে চায়। আর সুখকে পাহারা দিতে হয় না, তাকে অনুভব করতে হয়। যে মানুষ প্রতিটি প্রাপ্তির ভেতর সম্ভাব্য হারানোর আতঙ্ক খুঁজে বেড়ায়, সে হাতে ফুল নিয়েও কাঁটার ভয়ে ফুলের গন্ধ নিতে পারে না। যে মানুষ ভালোবাসার প্রতিটি মুহূর্তকে পরীক্ষার টেবিলে তোলে, সে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার জীবন্ত শরীরটিকেই মৃতদেহে পরিণত করে। কারণ অতিরিক্ত পরীক্ষা সত্যকে প্রকাশ করে না সবসময়, কখনো কখনো সত্যের অস্তিত্বই ক্ষয় করে।
জীবন তাই আমাদের এক গভীর সংযমের শিক্ষা দেয়। যা পেয়েছ, তাকে অবহেলা করো না; কিন্তু আঁকড়ে ধরেও রেখো না। যাকে ভালোবাসো, তাকে আগলে রেখো; কিন্তু তার আকাশ কেড়ে নিও না। প্রশ্ন করো, কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নকে সন্দেহের আদালতে দাঁড় করিও না। যত্ন নাও, কিন্তু যত্নকে পাহারায় পরিণত করো না। কাছে থাকো, কিন্তু এমনভাবে নয় যাতে অন্যজন নিজের ভেতরে শ্বাস নেওয়ার জায়গা হারিয়ে ফেলে। কারণ ভালোবাসা হলো দুজন মানুষের পাশাপাশি হাঁটা, একজনের ছায়ায় আরেকজনকে মুছে দেওয়া নয়।
সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এই যে, আমরা সবকিছু পেয়ে গেলেও সবকিছুর ওপর অধিকার দাবি করতে পারি না। মানুষকে পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষকে মালিকানা করা যায় না। ভালোবাসা পাওয়া যায়, কিন্তু ভালোবাসাকে বন্দী করা যায় না। সুখ আসে, কিন্তু তাকে মুঠোবন্দী করা যায় না। শান্তি আসে, কিন্তু তাকে পাহারা দিলে সে পালিয়ে যায়। আর বিশ্বাস, সে তো এমন এক পাখি, যে হাতের তালুতে বসে থাকে কেবল তখনই, যখন হাতটি মুঠো হয়ে ওঠে না।
তাই সন্দেহের পোকাগুলোকে প্রতিদিন খাওয়ানোর আগে একবার নিজের ভেতরে তাকানো দরকার। যে মানুষটির সততা যাচাই করতে করতে তুমি ক্লান্ত, তার চেয়ে বেশি কি তোমার নিজের ভয়ের সত্যতা যাচাই করা দরকার নয়? যে সম্পর্কটিকে হারানোর আতঙ্কে তুমি প্রতিদিন টেনে ধরছ, সেটি কি তোমার হাতের টানে ধীরে ধীরে ছিঁড়ে যাচ্ছে না? যে মানুষটিকে নিজের পৃথিবীর সম্পূর্ণ কেন্দ্র বানাতে গিয়ে তার আকাশ সংকুচিত করে ফেলেছ, সে কি শেষ পর্যন্ত তোমার পৃথিবী থেকেই বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজবে না?
মানুষের সুখ অনেক সময় তার পাওয়ার পরিমাণে নয়, পাওয়া জিনিসের প্রতি তার বোধের গভীরতায় নিহিত থাকে। অল্পের মধ্যে যে বিস্ময় খুঁজে পায়, সে ধনী। প্রাচুর্যের মধ্যেও যে কৃতজ্ঞ থাকতে পারে, সে শান্ত। ভালোবাসার মানুষটিকে স্বাধীন রেখে যে তার পাশে থাকতে পারে, সে পরিণত। আর যে হারানোর সম্ভাবনাকে মেনে নিয়েও ভালোবাসতে পারে, সে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে জানে। কারণ ভালোবাসার চূড়ান্ত রূপ অধিকার নয়, আস্থা; আঁকড়ে ধরা নয়, অবকাশ; সন্দেহ নয়, স্বচ্ছতা; আর ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকা নয়, অনিশ্চয়তার মধ্যেও হৃদয় খুলে দেওয়ার সাহস।
জীবন শেষ পর্যন্ত আমাদের যা শেখায়, তা খুব সরল অথচ গভীর। সব পাওয়া জিনিস ধরে রাখতে হয় না, কিছু জিনিসকে শুধু ভালোবাসতে হয়। সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হয় না, কিছু প্রশ্নকে সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হয়। সব সম্পর্ককে পাহারা দিতে হয় না, কিছু সম্পর্ককে শুধু নিঃশ্বাস নেওয়ার অবকাশ দিতে হয়। কারণ যে ভালোবাসা সত্য, তাকে শিকল দিয়ে রক্ষা করতে হয় না; আর যে ভালোবাসা সত্য নয়, পৃথিবীর কোনো শিকলই তাকে চিরকাল ধরে রাখতে পারে না। অতএব সন্দেহের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে প্রাপ্তির সত্যতা খুঁজে মরার চেয়ে, একবার চোখ তুলে দেখা ভালো, হয়তো যে আলোকে তুমি নকল ভেবেছিলে, সেটিই ছিল তোমার জীবনের সবচেয়ে নির্মল ভোর।
প্রদ্যোত
(শিক্ষা ও সংস্কৃতি কর্মী)