← Back to writing

গড প্রকাশনীর ক্যাটালগে ডাইনোসর নাই

গড প্রকাশনীর ক্যাটালগে ডাইনোসর নাই

সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ডাইনোসরগো গডগিরির খবর কুনো ধম্মের ভগোম্যানেরা জানে? গড প্রকাশনীর কোন বইতে কি হেই যুগের কতা আছে? তখন তো মানুষই আছিল না, মানুষ তো দূরের কতা, মানুষের দাদার দাদারও দাদা আছিল না; কিন্তু পৃথিবী আছিল, পাহাড় আছিল, সমুদ্র আছিল, জঙ্গল আছিল, কোটি কোটি রকমের জানোয়ার আছিল, আর ডাইনোসরগো রাজত্বও আছিল বেশ জমজমাট। তারা তখন দিব্যি ঘুরতেছে, খাইতেছে, দৌড়াইতেছে, মারামারি করতেছে, বংশ বাড়াইতেছে। কিন্তু আশ্চর্যের কতা হইল, হেই সময় কোনো নবী আইল না, কোনো পয়গম্বর আইল না, কোনো দেবদূত আইল না, কোনো সাধু সন্ন্যাসী আইল না, এমনকি আসমান থেইকাও কুনো বই নামল না; যেই বইতে লেখা আছিল, “হে ডাইনোসর জাতি, তোমরা এই নিয়মে চলবা, অমুক দিনে উপাসনা করবা, অমুক দিনে উপবাস রাখবা, আর অমুক দিকে মুখ কইরা প্রার্থনা করবা।” ডাইনোসরগো ভাগ্য ভালো, তখন মানুষ আছিল না; তাই অন্তত তাদের ঘাড়ে কুনো ধর্ম চাপাইয়া দেওয়ার লোকও আছিল না।

তারপর কোটি কোটি বছর পার হইল। পৃথিবী ঘুরল, মহাদেশ ভাঙল, সাগর সইরা গেল, পাহাড় উঠল, কত প্রাণী আইল আর গেল। একসময় মানুষ আইল। মানুষ আইসা প্রথমে খাওনদাওনের চিন্তা করল, তারপর বাঁচনের চিন্তা করল, তারপর আকাশের দিকে তাকাইয়া প্রশ্ন করল, “এই বিশাল কাণ্ডটা বানাইল কে?” প্রশ্নটা খারাপ আছিল না; বরং এই প্রশ্ন থেইকাই মানুষের কৌতূহল, দর্শন আর অনুসন্ধানের শুরু। কিন্তু বিপদ হইল, একসময় কিছু মানুষ উত্তর না পাইয়াও কইল, “আমি জানি!” আরেকজন কইল, “তুমি জানো না, আমি জানি!” আরেকজন কইল, “তোমরা দুইজনই ভুল, আসল কতা আমি জানি!” ব্যস, শুরু হইল মহাজাগতিক কেরামতি। ঈশ্বররে কেউ চোখে দেখে নাই, কিন্তু ঈশ্বর কী কইছেন, এই বিষয়ে সবার মুখে এমন আত্মবিশ্বাস, যেন গতকাল সন্ধ্যাতেই স্বর্গে বসে চা খাইয়া আইছে!

তারপর মানুষ একটা আরও চমৎকার বুদ্ধি বাইর করল। নিজেরা বই লিখল, তারপর কইল, “এই বই আমরা লিখি নাই, ঈশ্বর লিখছেন।” বাহ! এমন ব্যবসা আর কই আছে? নিজের কতা নিজে কইলে মানুষ প্রশ্ন করতে পারে; কিন্তু সেই একই কতা যদি ঈশ্বরের নামে চালাইয়া দেওয়া যায়, তখন প্রশ্ন করা মানে ভয়, সন্দেহ, পাপ, অপরাধ, যে যা খুশি নাম দেওয়া যায়। নিজের দোকানের মাল বিক্রি করনের জন্য যদি দোকানদার কইত, “এই সাবানটা আমি বানাইছি”, তাহলে ক্রেতা জিজ্ঞাসা করত, “ভাই, মান কেমন?” কিন্তু দোকানদার যদি কইত, “এই সাবান স্বয়ং ঈশ্বর বানাইছেন”, তখন ক্রেতা সাবান না কিনলে বরং নিজের ঈমান নিয়াই চিন্তায় পইড়া যাইত! মানুষের মার্কেটিং বুদ্ধি যে কত পুরোনো, ধর্মের বাজারে আইসা তারই প্রমাণ পাওয়া যায়।

আরেকটা মজার কাণ্ড হইল, একজন কইল, “আমার বই ঈশ্বরের।” আরেকজন কইল, “না, আমার বই ঈশ্বরের।” তৃতীয়জন কইল, “তোমাগো দুইজনের বইই ভুল।” চতুর্থজন কইল, “ভুল শুদ্ধ বুঝতে হইলে আমার ব্যাখ্যা পড়ো।” পঞ্চমজন আবার সেই ব্যাখ্যারও ব্যাখ্যা লইয়া হাজির। তারপর শুরু হইল ব্যাখ্যার ব্যাখ্যার ব্যাখ্যা। ঈশ্বর কয়জন, এই হিসাব কেউ জানে না; কিন্তু ঈশ্বরের প্রতিনিধি কয়জন, সেই হিসাব করতে গেলে ক্যালকুলেটর গরম হইয়া যায়। ঈশ্বর একজন হইলেও তাঁর নামে দোভাষী হাজারজন, ব্যাখ্যাকারী লাখজন, আর কে আসল প্রতিনিধি, এইটা নিয়া ঝগড়াকারী কোটি কোটি!

সবচাইতে হাসির কতা হইল, মানুষ ঈশ্বররে সর্বশক্তিমান কয়; কিন্তু সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কতা বুঝাইতে আবার মানুষ লাগে! ঈশ্বর সর্বজ্ঞ, কিন্তু তাঁর কতা বুঝতে ব্যাখ্যাকার লাগে। ঈশ্বর সর্বব্যাপী, কিন্তু তাঁরে খুঁজতে নির্দিষ্ট জায়গা লাগে। ঈশ্বর নাকি মানুষের ভাষার ঊর্ধ্বে, কিন্তু তাঁর কোন শব্দের মানে কী, এইটা নিয়া মানুষ মানুষের লগে যুদ্ধ করে। ঈশ্বর নাকি চিরন্তন, কিন্তু তাঁর নামে বানানো নিয়মের সংস্করণ মানুষই বদলায়। ঈশ্বর নাকি সব জানেন, কিন্তু তাঁর ইচ্ছা কোনটা, এইটা নিয়া মানুষের ঝগড়া থামে না। এমন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের এত অসহায় অবস্থা যে, মনে হয় ঈশ্বর নিজে কিছু কইলেই মানুষ কইব, “চুপ! আগে আমার অনুমোদিত ব্যাখ্যাটা পড়ো, তারপর বুঝবা ঈশ্বর কী কইছেন!”

ডাইনোসরগোর কথাই ধরেন। বেচারারা কোটি কোটি বছর পৃথিবীতে আছিল। তারা কুনো ধর্মগ্রন্থ পাইল না, কুনো পবিত্র ক্যালেন্ডার পাইল না, কুনো উপাসনালয় বানাইল না, কুনো ধর্মীয় সভায় গিয়া বক্তৃতা দিল না। তারা জানতও না, শুক্রবার পবিত্র, শনিবার পবিত্র, রবিবার পবিত্র, অমুক দিনে উপবাস, তমুক দিনে উৎসব। তারা শুধু বাঁচছে। ক্ষুধা লাগলে খাইছে, বিপদ আইলে দৌড়াইছে, বংশ বাড়াইছে, প্রকৃতির নিয়মে চলছে। তারপর একদিন ভয়াবহ মহাজাগতিক বিপর্যয় আইল। প্রায় ছয় কোটি ষাট লাখ বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত করল, আর তার পরের বিপর্যয়ে অধিকাংশ অ এভিয়ান ডাইনোসর বিলুপ্ত হইয়া গেল। তখন কোনো ধর্মীয় সভা বসে নাই, কোনো পুরোহিত ডাইনোসরগো কানে কানে কই নাই, “ভাইসব, তোমাগো পাপের শাস্তি শুরু হইছে।” কুনো ধর্মগ্রন্থে তাদের জন্য শেষ অধ্যায়ও লেখা আছিল না। প্রকৃতি নিজের নিয়মে চলল, আর মানুষ বহু পরে আইসা জীবাশ্ম খুঁইড়া সেই পুরোনো কতা পড়তে শিখল।

এইখানেই আসল হাসির জায়গা। পৃথিবী মানুষের বই পড়ার জন্য বসে আছিল না। সূর্য মানুষের ধর্মীয় ক্যালেন্ডার দেইখা উঠত না। বৃষ্টি নামার আগে কুনো পুরোহিতের অনুমতি নিত না। গাছ অক্সিজেন ছাড়ার আগে কুনো ধর্মীয় পরিচয়পত্র দেখাইত না। নদী বইবার সময় কুনো সম্প্রদায়ের সদস্যপদ লইত না। প্রকৃতি নিজের নিয়মে চলতেছিল। মানুষ পরে আইসা সেই প্রকৃতির দিকে তাকাইয়া প্রশ্ন করল, অনুসন্ধান করল, বিজ্ঞান বানাইল; এইটা মানুষের মহৎ কাণ্ড। কিন্তু তারপরই আরেক দল মানুষ কইল, “না না, প্রকৃতির আগে আমার বই পড়ো; বইতে যা লেখা আছে, তার বাইরে আর কুনো প্রশ্ন নাই।” পৃথিবী তখন হয়তো মনে মনে কইছে, “বাপু, আমি তোমাগো বইয়ের আগেও আছিলাম, তোমাগো বইয়ের পরেও থাকমু; তোমরা আগে নিজেরা একটু সামলাইয়া নাও!”

মানুষের আরেকটা অসাধারণ কেরামতি হইল, নিজের লেখা কতা নিজের নামে না চালাইয়া ঈশ্বরের নামে চালানো। ধরেন, আমি একটা কতা লিখলাম। আপনি জিগাইলেন, “এই কতা কে লিখছে?” আমি কইলাম, “আমি।” তখন আপনি কইতে পারেন, “কেন লিখছেন? প্রমাণ কী? যুক্তি কী?” কিন্তু আমি যদি কই, “আমি লিখি নাই; ঈশ্বর লিখছেন”, তখন আপনার প্রশ্ন করার ধরনই বদলাইয়া যায়। কারণ এখন আর আমার সঙ্গে তর্ক না; আপনার ভয় হইতেছে ঈশ্বরের সঙ্গে তর্ক করতেছেন। কী চমৎকার কৌশল! নিজের কথার দায় নিজের ঘাড় থেইকা নামাইয়া সরাসরি মহাবিশ্বের মালিকের ঘাড়ে চাপাইয়া দেওয়া! ব্যবসার ভাষায় এইটারে হয়তো বলা যায়, “দায়মুক্ত ব্র্যান্ডিং।”

তারপর বই পবিত্র হইল, বইয়ের ব্যাখ্যা পবিত্র হইল, ব্যাখ্যাকারী পবিত্র হইল, ব্যাখ্যার দোকান পবিত্র হইল। কেউ কইল, “এই লাইনটা আক্ষরিক।” অন্যজন কইল, “না, রূপক।” তৃতীয়জন কইল, “না, এইটার আসল মানে শুধু আমারাই জানি।” চতুর্থজন কইল, “আমাগো ব্যাখ্যা না মানলে তুমি পথভ্রষ্ট।” পঞ্চমজন আবার কইল, “তুমি পথভ্রষ্ট না, তুমি আরও বড় পথভ্রষ্ট!” এইভাবে মানুষ ঈশ্বরের কতা বুঝতে গিয়া একে অপররে বুঝাইতে লাগল যে অন্যজন ঈশ্বররে বুঝে নাই। ঈশ্বর তখন চুপ। আর তাঁর নামে মানুষ চেঁচাইতে চেঁচাইতে গলার স্বর বসাইয়া ফেলল।

সবচাইতে মজার বিষয়, ধর্মের নামে মানুষ যত বই লিখছে, তার মধ্যে কোনো বইতেই ডাইনোসরগো পুরো ইতিহাস নাই। পৃথিবীর কোটি কোটি বছরের ইতিহাসের কত সামান্য অংশই বা মানুষের ধর্মগ্রন্থে আছে? ডাইনোসর কেমন আছিল, কোন প্রজাতি কখন আইল, কোনটা কই গিয়া হারাইল, এই কতা জানতে মানুষকে শেষ পর্যন্ত ধর্মগ্রন্থের পাতা না, জীবাশ্মের কাছে যাইতে হইল। মাটির নিচে চাপা হাড় তখন কোনো ধর্মের নাম জানে না; সে শুধু প্রমাণ। পাথরের স্তর কোনো মতবাদ মানে না; সে শুধু ইতিহাসের সাক্ষী। বিজ্ঞান সেই সাক্ষ্য পড়ল। মানুষ বুঝল, পৃথিবীর ইতিহাস মানুষের ধর্মীয় কল্পনার চেয়েও বহু বহু পুরোনো।

তাই প্রশ্নটা আসলে ডাইনোসর নিয়া না; প্রশ্নটা মানুষ নিয়া। যদি ঈশ্বর সত্যিই কোনো ধর্ম সৃষ্টি কইরা থাকেন, তাহলে পৃথিবীর এত দীর্ঘ ইতিহাসে সেই ধর্মের সরাসরি, স্পষ্ট, যাচাইযোগ্য চিহ্ন কই? যদি ঈশ্বর নিজে বই লিখে থাকেন, তাহলে সেই বইয়ের আসল পান্ডুলিপি কই? যদি ঈশ্বর নিজে ধর্মের নিয়ম বানাইয়া থাকেন, তাহলে কোন নিয়মটা তাঁর, আর কোনটা মানুষের, এই পার্থক্যের নির্ভুল প্রমাণ কই? মানুষ যে বই লিখছে, মানুষই যে ভাষা বানাইছে, মানুষই যে ব্যাখ্যা করছে, এই বাস্তবতাটা বাদ দিয়া শুধু “ঈশ্বর কইছেন” বললেই কি মানুষের লেখা কতা সত্যিই ঈশ্বরের কতা হইয়া যায়?

মানুষ প্রথমে ঈশ্বরের সন্ধান করছিল, এইটা ছিল অনুসন্ধান। তারপর মানুষ ঈশ্বরের নামে প্রতিষ্ঠান বানাইল, এইটা হইল সংগঠন। তারপর প্রতিষ্ঠান নিজের ক্ষমতা বাঁচাইতে নিয়ম বানাইল, এইটা হইল কর্তৃত্ব। তারপর কর্তৃত্ব নিজেরে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলল, এইটা হইল বিপদ। কারণ যেই মুহূর্তে মানুষ কইল, “এই প্রশ্ন কইরো না; এই কতা নিয়া সন্দেহ কইরো না; এই বইয়ের বাইরে ভাববা না”, সেই মুহূর্তে ঈশ্বরের সন্ধান থামল, মানুষের ক্ষমতার খেলা শুরু হইল।

আর সেইখানেই ব্যঙ্গটা আসলেই ধারালো হইয়া ওঠে। ঈশ্বর যদি সত্যিই থাকেন, তাঁরে মানুষের পাহারাদার লাগার কথা না। ঈশ্বর যদি সত্যিই সর্বশক্তিমান হন, তাঁর সম্মান রক্ষার জন্য মানুষের হাতে লাঠি লাগার কথা না। ঈশ্বর যদি সত্যিই সত্যের ঈশ্বর হন, তাহলে প্রশ্নে তাঁর ভয় পাওয়ার কথা না। কারণ সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হইল, তারে প্রশ্ন করলে সে আরও পরিষ্কার হয়। কিন্তু মানুষের বানানো ক্ষমতা প্রশ্নরে ভয় পায়। তাই অনেক সময় ঈশ্বরের নামে যে ভয় দেখানো হয়, সেই ভয়টা আসলে ঈশ্বরের না, মানুষের।

আর গড প্রকাশনীর ক্যাটালগের সবচেয়ে রহস্যময় পাতাটা তাই আজও খালি। পাতার শিরোনাম হইতে পারত, “ডাইনোসরগো জন্য বিশেষ ধর্মীয় নির্দেশনা।” কিন্তু সেই পাতায় কিছু লেখা নাই। কোনো স্বর্গীয় স্বাক্ষর নাই। কোনো ঐশী সিল নাই। কোনো নির্দেশ নাই। ডাইনোসরগো পৃথিবীতে আসার সময় কোনো ধর্মগ্রন্থ তাদের হাতে ধরাইয়া দেওয়া হয় নাই। তারা মানুষের ধর্মের আগেই আইছিল, মানুষের ধর্মের বহু আগেই বাঁচছিল, আর মানুষের ধর্মের বহু আগেই হারাইয়া গেছে। পরে মানুষ আইসা তাদের হাড় খুঁইড়া ইতিহাস পড়ছে।

এই জন্যই কতা হইল, ঈশ্বর আছেন কি নাই, সেই প্রশ্ন বিশ্বাসের; কিন্তু ধর্মগ্রন্থ মানুষ লিখছে কি না, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মানুষ বানাইছে কি না, আর ঈশ্বরের নামে মানুষ নিজের কতা চালাইতেছে কি না, এই প্রশ্নগুলা মানুষের ইতিহাসের। আর ইতিহাসের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, মানুষ শুধু ঘরবাড়ি, রাজ্য সাম্রাজ্য, আইন কানুনই বানায় নাই; মানুষ ঈশ্বরের নামে বইও বানাইছে, ধর্মও বানাইছে, ব্যাখ্যাও বানাইছে, আর সেইসবের ওপর পবিত্রতার সিল মাইরা অন্য মানুষরে কইছে, “এইবার আর প্রশ্ন কইরো না।”

কী আশ্চর্য জাতি মানুষ! আগে প্রশ্ন করে, “ঈশ্বর কোথায়?” তারপর নিজেরাই উত্তর বানায়, “এইখানে!” তারপর বই বানায়, “এইটা ঈশ্বরের কতা!” তারপর প্রতিষ্ঠান বানায়, “এইটা ঈশ্বরের ঘর!” তারপর প্রতিনিধি বানায়, “এই লোক ঈশ্বরের প্রতিনিধি!” তারপর নিয়ম বানায়, “এইটা ঈশ্বরের বিধান!” তারপর অন্য মানুষরে ধইরা কইে, “তুমি এইটা মানো!” আর কেউ যদি জিগায়, “প্রমাণ কই?” তখন উত্তর, “বিশ্বাস করো!”

অর্থাৎ প্রথমে মানুষ ঈশ্বররে খুঁজছিল; পরে মানুষ ঈশ্বরের নামে নিজেরেই খুঁজে পেল। নিজের ভয়, নিজের নৈতিকতা, নিজের রাজনীতি, নিজের সমাজব্যবস্থা, নিজের ক্ষমতা, সবকিছুর ওপর ঈশ্বরের সিল মাইরা দিল। নিজের কতা ঈশ্বরের কতা হইয়া গেল। নিজের বিধান ঐশী বিধান হইয়া গেল। নিজের প্রতিষ্ঠান পবিত্র হইয়া গেল। আর নিজের মতের বিরোধিতা করা মানে ঈশ্বরের বিরোধিতা, এই একখান অসাধারণ শর্টকাট আবিষ্কার করল মানুষ।

সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ডাইনোসরগো কোনো ধর্মগ্রন্থ আছিল না, তবু পৃথিবী চলছিল। মানুষ আসার বহু আগেই সূর্য উঠছিল, বৃষ্টি নামছিল, নদী বইছিল, গাছ জন্মাইছিল, প্রাণী বাঁচছিল, প্রাণী মরছিল। পৃথিবী কোনো ধর্মের সদস্য আছিল না, তবু পৃথিবী পৃথিবীই আছিল। তারপর মানুষ আইল, আকাশের দিকে তাকাইল, বিস্মিত হইল, প্রশ্ন করল, এইটাই মানুষের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই প্রশ্নের জায়গায় যখন মানুষ নিজের বানানো উত্তর বসাইয়া কইল, “এইটাই শেষ কথা, আর প্রশ্ন নাই”, সেইখানেই সৌন্দর্যটা ক্ষমতার খেলায় পরিণত হইল।

তাই গড প্রকাশনীর ক্যাটালগে ডাইনোসর নাই, এইটা আসলে হাসির কতা হইলেও প্রশ্নটা কিন্তু গভীর। যে পৃথিবী কোটি কোটি বছর মানুষের আগেই চলছিল, সেই পৃথিবীর সব রহস্যের মালিকানা মানুষ কীভাবে কয়েকটা বইয়ের পাতায় পইড়া দাবি করে? বই মানুষ লিখতে পারে, বিশ্বাস মানুষ করতে পারে, ধর্ম মানুষ বানাইতে পারে, ঈশ্বরের কল্পনা মানুষ করতে পারে, কিন্তু মহাবিশ্বকে নিজের প্রকাশনীর কপিরাইট বানাইয়া ফেলার ক্ষমতা মানুষের নাই।

শেষ কতা তাই এই, ঈশ্বর থাকলে তিনি মানুষের লেখা বইয়ের চেয়েও বড়; আর ঈশ্বর না থাকলে মানুষের লেখা বইকে ঈশ্বরের লেখা বানাইয়া দেওয়ার কৌশলটা আরও বড় রম্যরচনা। কারণ দুই ক্ষেত্রেই একটা কতা পরিষ্কার: বইটা মানুষের, ভাষাটা মানুষের, ব্যাখ্যাটা মানুষের, ধর্মের প্রতিষ্ঠানও মানুষের; তারপর বইয়ের মলাটে ঈশ্বরের নাম লিখে মানুষই মানুষরে কইছে, “এইবার বিশ্বাস করো, কারণ লেখক নাকি আমি না!”

আর ডাইনোসরগো হাড় মাটির নিচ থেইকা যেন আজও মুচকি হাইসা কইতেছে, “তোমরা মানুষ আইসা অনেক কতা শিখছো; কিন্তু একটা কতা এখনো শিখলা না, পৃথিবী তোমাগো বই পড়ার আগেও আছিল!”

প্রদ্যোত