← Back to writing

পারফেক্টলি ইমপারফেক্ট : আমার আত্মতৃপ্তির ৭৩ শতাংশ এবং অপূর্ণতার ২৭

পারফেক্টলি ইমপারফেক্ট : আমার আত্মতৃপ্তির ৭৩ শতাংশ এবং অপূর্ণতার ২৭

আমার সৃজনশীলতা, কর্মদক্ষতা কিংবা পেশাগত সাফল্যের মূল্যায়নে অন্যের প্রশংসা কখনোই চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারেনি। মানুষের অভিনন্দন, স্বীকৃতি ও মুগ্ধতা আমাকে আনন্দ দেয়, কিন্তু সেই আনন্দ আমার নিজস্ব আত্মমূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে না। অন্যের চোখে কোনো কাজ অসাধারণ হয়ে উঠলেও নিজের চোখে তার অসম্পূর্ণতা ধরা পড়ে। এই দুই উপলব্ধির মধ্যবর্তী দূরত্বই আমার মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। নিজের কোনো কাজেই এখন পর্যন্ত ৭৩ শতাংশের বেশি আত্মতৃপ্তি অনুভব করতে না পারার অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার নিজের প্রত্যাশা, সৃজনশীলতা ও মানসিক প্রবণতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে।

আমার ভেতরে যেন দুটি সত্তা পাশাপাশি বসবাস করে। একটি সত্তা সৃষ্টি করে, স্বপ্ন দেখে, কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয় এবং অর্জনের আনন্দে উজ্জীবিত হয়। অন্য সত্তাটি সেই সৃষ্টির প্রতিটি স্তরকে বিশ্লেষণ করে, ত্রুটি খোঁজে, বিকল্প সম্ভাবনা আবিষ্কার করে এবং প্রায়ই সম্পন্ন কাজটির মধ্যেও নতুন সংশোধনের অবকাশ দেখতে পায়। এই দ্বিতীয় সত্তাটি কখনো আমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমালোচক, আবার কখনো আমার নিজের আনন্দের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। সৃষ্টির আনন্দ ও সৃষ্টির বিচার যখন একই মানসিক পরিসরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন সম্পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আমার প্রত্যাশার জগৎ সম্ভবত আমার বাস্তব সক্ষমতার চেয়েও বিস্তৃত। কোনো কবিতা লিখতে বসলে কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, শব্দের অন্তর্নিহিত দর্শন, অনুভূতির গভীরতা, প্রকাশের স্বকীয়তা এবং ভাষার নান্দনিক সম্ভাবনাও আমাকে ভাবায়। কোনো পরিবেশনা কিংবা পেশাগত কাজে অংশ নিলে শুধু কাজটি সম্পন্ন করাই যথেষ্ট মনে হয় না; তার প্রতিটি সূক্ষ্ম দিককে আরও পরিশীলিত করার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। বাস্তবের কাজটি শেষ হয়ে গেলেও কল্পনার ভেতরে তার আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি হতে থাকে। ফলে আমার কাছে সমাপ্তি অনেক সময় কেবল একটি সাময়িক বিরতি, চূড়ান্ত পরিতৃপ্তি নয়।

এই প্রবণতার মধ্যে নিখুঁততাবাদের মনস্তত্ত্ব কাজ করতে পারে। নিজের জন্য উচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করা আমাকে উন্নতির প্রেরণা দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে সেই মানদণ্ড যখন ক্রমাগত পরিবর্তিত ও সম্প্রসারিত হয়, তখন অর্জিত সাফল্যও নিজের কাছে অপর্যাপ্ত বলে মনে হতে পারে। আমার ২৭ শতাংশ অপূর্ণতার অনুভূতি তাই সব সময় বাস্তব ঘাটতির পরিমাপ নয়। এর কিছু অংশ হয়তো আমার কল্পিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান, কিছু অংশ আরও ভালো করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা, আবার কিছু অংশ নিজের কাজের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

অন্যের প্রশংসা আমাকে আনন্দিত করলেও তা আমার অন্তর্গত বিচারকের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে না। কারণ, দর্শক কিংবা শ্রোতা আমার সৃষ্টির চূড়ান্ত রূপটি দেখেন, কিন্তু আমি জানি তার নির্মাণের পেছনে কতগুলো সম্ভাবনা, কতগুলো বর্জন, কতগুলো সংশোধন এবং কতগুলো অপ্রকাশিত ভাবনা কাজ করেছে। অন্যরা হয়তো একটি কবিতার আবেগে মুগ্ধ হন, অথচ আমার মনে থেকে যায় আরও শক্তিশালী কোনো শব্দ ব্যবহারের সম্ভাবনা। একটি পরিবেশনা শ্রোতাদের কাছে অসাধারণ মনে হলেও আমার কানে বাজতে থাকে উচ্চারণের সামান্য বিচ্যুতি কিংবা কণ্ঠের আরও কার্যকর ব্যবহারের সম্ভাবনা। আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত এই অন্তর্দৃষ্টি আমাকে নিজের কাজের এমন কিছু দিক দেখায়, যা বাইরের মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা সব সময় সম্ভব নয়।

তবে এই আত্মমূল্যায়নের মধ্যে আত্মপ্রবঞ্চনার ঝুঁকিও আমি অস্বীকার করতে পারি না। নিজের অসন্তুষ্টিকে সব সময় উৎকর্ষের প্রমাণ হিসেবে দেখার প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে। কখনো কখনো মনে হতে পারে, আমি যেহেতু নিজের কাজে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই, সেহেতু আমার প্রত্যাশা অন্যদের তুলনায় অনেক উন্নত। অথচ অসন্তুষ্টি নিজে কোনো শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়। নিজের কাজকে ক্রমাগত অপর্যাপ্ত মনে করার মধ্যেও অহংকারের একটি সূক্ষ্ম প্রকাশ থাকতে পারে, যেখানে নিজের কল্পিত মানদণ্ডকেই সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই উপলব্ধি আমাকে নিজের সমালোচনাকেও সমালোচনা করতে শেখায়।

আমার কাছে অপূর্ণতার সবচেয়ে জটিল দিক হলো, এটি একই সঙ্গে শক্তি ও দুর্বলতা। এই অপূর্ণতা আমাকে থেমে থাকতে দেয় না, নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, পরিচিত প্রকাশের বাইরে যেতে উৎসাহিত করে। আবার এই একই অনুভূতি কখনো অর্জনের আনন্দকে ম্লান করে দেয়। কোনো কাজ শেষ করার পর তার সাফল্য উপভোগ করার পরিবর্তে পরবর্তী সংস্করণের চিন্তায় ডুবে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে সৃজনশীলতার গতি বজায় থাকলেও বর্তমান অর্জনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তৃপ্তি অনুভব করার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। আমি বুঝতে পারি, প্রতিটি কাজকে আরও ভালো করার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনার পেছনে ছুটতে গিয়ে বর্তমান কাজটির নিজস্ব সৌন্দর্য অস্বীকার করাও সমীচীন নয়।

সম্ভবত আমার মানসিকতার সঙ্গে আনন্দের অভিযোজনও জড়িত। কোনো সাফল্য প্রথমে যতটা আনন্দ দেয়, সময়ের সঙ্গে তা স্বাভাবিক হয়ে আসে। তখন মন নতুন লক্ষ্য স্থির করে, নতুন চ্যালেঞ্জ খোঁজে। আমার সৃজনশীল ও পেশাগত জীবনে এই প্রবণতা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু এর একটি বিপরীত ফলও রয়েছে। অর্জনের আনন্দকে যথাযথভাবে ধারণ করার আগেই নতুন প্রত্যাশা পুরোনো সাফল্যকে ছাপিয়ে যায়। ফলে আত্মতৃপ্তির অনুভূতি স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পায় না। আমার ৭৩ শতাংশের সীমা হয়তো সেই অনবরত অগ্রসরমান মানসিকতারই একটি প্রতীকী প্রকাশ।

তবু আমি অপূর্ণতাকে কেবল সংশোধনের বিষয় হিসেবে দেখতে চাই না। আমার সৃষ্টির মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যা নিখুঁততার প্রচলিত সংজ্ঞায় ত্রুটি হলেও আমার নিজস্ব প্রকাশভঙ্গির অংশ। সব অসম্পূর্ণতা দূর করে ফেললে হয়তো সৃষ্টির স্বাভাবিকতা, আবেগ কিংবা স্বতঃস্ফূর্ততার কিছু অংশ হারিয়ে যেতে পারে। তাই নিজের কাজের দুর্বলতা শনাক্ত করার পাশাপাশি তার স্বকীয়তাকেও চিনতে শেখা জরুরি। কোনটি প্রকৃত ত্রুটি, কোনটি আমার অতিরিক্ত প্রত্যাশার ফল এবং কোনটি সৃষ্টির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, এই পার্থক্য অনুধাবন করাই আমার আত্মমূল্যায়নকে আরও পরিণত করতে পারে।

আমার কাছে আত্মতৃপ্তি মানে সব সম্ভাবনার সমাপ্তি নয়। বরং নিজের শ্রম, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টির একটি পর্যায়কে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারা। আমি জানি, কোনো কাজই আমার সমস্ত কল্পনাকে ধারণ করতে পারবে না। আমার চিন্তা পরিবর্তিত হবে, রুচি পরিণত হবে, অভিজ্ঞতা নতুন উপলব্ধির জন্ম দেবে। আজ যে কাজকে সর্বোচ্চ অর্জন বলে মনে হচ্ছে, আগামীকাল হয়তো তার মধ্যেই নতুন সীমাবদ্ধতা খুঁজে পাব। এই পরিবর্তনকে আমি ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে চাই না। বরং এটিই আমার মানসিক ও সৃজনশীল বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

আমার ২৭ শতাংশ অপূর্ণতা তাই কোনো চূড়ান্ত হিসাব নয়। এটি আমার অদেখা সম্ভাবনা, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা, আত্মসমালোচনা এবং কখনো কখনো নিজের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত চাপের এক সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। এই অংশটুকু আমাকে যেমন সামনে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি নিজের মানসিক ভারসাম্য রক্ষার কথাও মনে করিয়ে দেয়। কারণ, নিজেকে অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা আর নিজেকে কখনোই গ্রহণ করতে না পারা এক বিষয় নয়।

আমি হয়তো পারফেক্ট হতে চাই, কিন্তু আমার অস্তিত্বের সত্যটি ইমপারফেক্ট। আমার সৃষ্টির প্রতিটি অসমাপ্ত সম্ভাবনা আমাকে নতুন করে ভাবায়, প্রতিটি অর্জনের পর অবশিষ্ট ঘাটতি আমাকে নতুন পথে আহ্বান করে। তবু আমি চাই না, পূর্ণতার পেছনে ছুটতে ছুটতে প্রাপ্তির আনন্দটুকুও হারিয়ে ফেলি। আমার ৭৩ শতাংশ আত্মতৃপ্তি কোনো পরাজয়ের সীমারেখা নয়, আবার ২৭ শতাংশ অপূর্ণতাও কোনো শ্রেষ্ঠত্বের পদক নয়। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বেই আমার সৃষ্টিশীল সত্তার চলমান জীবন, আমার আত্মজিজ্ঞাসার অন্তহীন যাত্রা এবং আমার পারফেক্টলি ইমপারফেক্ট হয়ে ওঠার নিজস্ব দর্শন।

প্রদ্যোত / ০৩ অক্টোবর ২০২৬