১৪ ডিসেম্বর: চোখ বাঁধা সূর্যদের অসমাপ্ত ভোর
১৪ ডিসেম্বর: চোখ বাঁধা সূর্যদের অসমাপ্ত ভোর
১৪ ডিসেম্বর-
একটি তারিখ নয়,
এটি রক্তে লেখা একটি স্তব্ধ বিকেল,
যেখানে সূর্য অস্ত যায় না-
বরং চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেদিন শহরের বাতাস ছিল অস্বাভাবিক ভারী,
ঢাকার আকাশে পাখিরাও উড়তে ভুল করেছিল।
অলিগলির দেয়ালে দেয়ালে
কাঁপছিল এক অদৃশ্য আতঙ্ক-
কারণ আলবদর, আলশামস, রাজাকার আর
পাক হানাদারদের বুটের শব্দ
মানুষের বুকের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল।
যাদের তুলে নেওয়া হলো-
তারা কেবল মানুষ ছিলেন না।
তারা ছিলেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাক্য,
অসমাপ্ত গবেষণা,
অধরা সুর,
অঙ্ক না-করা সমীকরণ,
এবং একটি স্বাধীন জাতির বিবেক।
চোখ বাঁধা সেই মানুষগুলো
অন্ধকারে যাচ্ছিলেন না-
তারা আলো বহন করছিলেন,
যার ভয়ে অন্ধকার অস্ত্র ধরেছিল।
কেউ ছিলেন শিক্ষক-
যার কণ্ঠে শ্রেণিকক্ষ হতো মুক্ত আকাশ,
কেউ ছিলেন চিকিৎসক-
যার হাতে ব্যথা সরে যেত নির্ভয়ে,
কেউ কবি, সাংবাদিক, দার্শনিক—
যাদের চিন্তায় জন্ম নিত আগামীর বাংলাদেশ।
তাদের অপরাধ একটাই-
তারা মাথা নত করেননি,
তারা পাকিস্তানের মানচিত্রে
বাংলার আত্মা লিখে দিতে চেয়েছিলেন।
রায়েরবাজারের ইটখানা,
মিরপুরের বধ্যভূমি-
সেদিন মানচিত্র ছিল না,
সেগুলো ছিল ইতিহাসের খোলা ক্ষত।
মাটির ভেতর থেকে উঠেছিল আর্তনাদ,
আর ইটের ফাঁকে ফাঁকে
লুকিয়ে ছিল শেষ নিঃশ্বাসের প্রশ্ন-
“আমাদের স্বপ্নগুলো কে বাঁচাবে?”
গুলি থামার পরও
নীরবতা শেষ হয়নি।
কারণ নীরবতার ভেতর পড়ে ছিল
একটি জাতির মেধাহত্যা।
মায়ের কোলে ফেরেনি ছেলে,
স্ত্রীর কপালে শুকায়নি সিঁথির সিঁদুর,
শিশুর প্রশ্নের উত্তর হয়ে রইল
একটি শূন্য চেয়ারের ছায়া।
তারা যদি বেঁচে থাকতেন-
আজ হয়তো বাংলাদেশ
আরও উঁচু হয়ে কথা বলত,
বিশ্ব মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াত
জ্ঞান, ন্যায় আর মানবিকতার পতাকা হাতে।
কিন্তু তাদের হত্যা করে
শত্রু বুঝতে পারেনি-
শরীর মরে, আদর্শ নয়।
আজও ১৪ ডিসেম্বর এলে
শহরের বাতাস ভারী হয়,
লাল-সবুজ পতাকা একটু নুয়ে পড়ে,
আর জাতির বিবেক দাঁড়িয়ে যায়
নীরব প্রহরায়।
হে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা,
আপনাদের রক্তে ভেজা এই দেশ
আজও আপনাদের ডাক শুনতে পায়।
আপনারা নেই-
তবু আপনাদের চিন্তা
আমাদের কলমে, আমাদের কণ্ঠে,
আমাদের প্রতিটি প্রতিবাদে বেঁচে থাকে।
আপনারাই আমাদের সূর্যসন্তান-
যাদের অস্তমিত করে
অন্ধকার ভেবেছিল সে জিতেছে।
কিন্তু ইতিহাস জানে-
১৪ ডিসেম্বর শেষ নয়,
এটি আলোর প্রতি চিরন্তন অঙ্গীকার।
প্রদ্যোত / ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫