← Back to poetry
❧

রক্তাক্ত ভোরের অমর সূর্য (পনেরো আগস্টের শোকগাথা)

Poetry

রক্তাক্ত ভোরের অমর সূর্য
(পনেরো আগস্টের শোকগাথা)

রাত তখনও ভোরের কাছে
তার শেষ অন্ধকারটি সমর্পণ করেনি,
আকাশের কপালে তখনও
ঝুলছিল কালো মেঘের শোকচিহ্ন;
ঢাকার ঘুমন্ত রাস্তাগুলো জানত না
আর কয়েক মুহূর্ত পরেই
ইতিহাস তার সবচেয়ে নির্মম পৃষ্ঠা খুলে বসবে।

ঘরে ঘরে তখন নিদ্রা ছিল শিশিরের মতো,
মায়ের বুকের কাছে শিশুরা ছিল
নিশ্চিন্ত পাখির ছানার মতো,
কোনো জানালায় ভোরের প্রতীক্ষা,
কোনো উঠোনে দিনের প্রথম আলোয়
জেগে ওঠার প্রস্তুতি।

কেউ জানত না, ভোর আসছে না, আসছে মৃত্যু।
কেউ জানত না, সূর্যের আগে
বারুদের আগুন উঠবে।
কেউ জানত না, বাংলাদেশের ইতিহাসের কপালে
সেদিন সূর্যের আলো নয়,
লেখা হবে রক্তের অক্ষর।

পদ্মা তখনও বয়ে যাচ্ছিল তার চিরন্তন স্রোতে;
মেঘনা তখনও চাঁদের শেষ আলো
বুকের মধ্যে ধরে ছিল;
যমুনা তখনও অন্ধকারের সঙ্গে
ধীরে ধীরে কথা বলছিল।
তারা কেউ জানত না, আজ তাদের জলে
মিশবে এক জাতির অশ্রু।
ধানের শীষ জানত না, তার সবুজ শরীরে
আজ শোকের ছায়া নামবে।
বাংলার মাটি জানত না,
যে মাটিকে ভালোবেসে একটি মানুষ
একটি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল,
সেই মাটিই আজ তাঁর রক্ত ধারণ করবে।

শুধু অন্ধকার জানত, রাত জানত, মৃত্যু জানত-
ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের দিকে
হায়েনার কালো পদধ্বনি
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর একটি বাড়ি নয়,
একটি জাতির হৃদয়ের ঠিকানা।
একটি দরজা নয়, সাত কোটি মানুষের
স্বপ্নের তোরণ।
একটি সিঁড়ি নয়, পরাধীনতার অন্ধকার থেকে
স্বাধীনতার দিকে উঠে যাওয়া মানুষের
অসংখ্য পদচিহ্ন।
এই বাড়ির দেয়ালে কথা বলত ইতিহাস।
এই বারান্দায় স্বাধীনতার স্বপ্ন বসত।
এই ঘরগুলোর বাতাসে
একটি জাতির ভবিষ্যৎ শ্বাস নিত।

কিন্তু সেই ভোরে দরজায় কড়া নাড়েনি প্রভাত,
কড়া নেড়েছিল মৃত্যু।
ভোরের পাখি ডাকেনি, ডেকেছিল বন্দুক।
আকাশে সূর্য ওঠেনি, উঠেছিল বারুদের ধোঁয়া।
আর একটি বাড়ির নিস্তব্ধতা
হঠাৎ হয়ে উঠেছিল একটি জাতির আজীবন কান্না।

পনেরো আগস্ট তারিখটি শুধু ক্যালেন্ডারের
একটি কালো ঘর নয়, এ বাংলার কপালে
জমাট হয়ে থাকা রক্তের দাগ।
এ একটি জাতির বুকের মধ্যে
চিরদিন আটকে থাকা একটি অসমাপ্ত কান্না।
এ এমন একটি রাতের নাম
যার ভোর এসেছিল, কিন্তু আলো নিয়ে আসেনি।
এমন একটি সকাল যেখানে সূর্য উঠেছিল,
কিন্তু বাংলার হৃদয়ে আলো পৌঁছায়নি।

সেদিন পাখিদের গানের জায়গায়
বন্দুক কথা বলেছিল।
সেদিন মায়ের লোরির জায়গায়
বারুদের শব্দ উঠেছিল।
সেদিন শিশুর হাসির জায়গায়
ইতিহাস শুনেছিল মৃত্যুর কর্কশ পদধ্বনি।
সেদিন বাংলার বাতাস শুধু ধোঁয়ায় ভরে যায়নি,
ভরে গিয়েছিল এক অজ্ঞেয় শূন্যতায়।

গুলি ছুটেছিল শুধু বন্দুকের নল থেকে নয়,
ছুটেছিল মানবতার বুকের ভেতর থেকে।
বারুদের আগুন জ্বলেছিল
শুধু একটি বাড়ির দেয়ালে নয়,
জ্বলেছিল একটি জাতির বিবেকের গায়ে।
একটি পরিবারকে নিঃশেষ করার সেই উন্মত্ততা
আসলে আঘাত করেছিল
একটি সদ্যোজাত রাষ্ট্রের আত্মায়।
যেন কেউ বাংলাদেশের হৃদপিণ্ডে
এক মুঠো আগুন ঢেলে দিয়েছিল।
যেন কেউ পদ্মার স্রোত থামিয়ে
তার জায়গায় অশ্রুর নদী বইয়ে দিয়েছিল।
যেন কেউ বাংলার আকাশ থেকে
সূর্য খুলে নিয়ে কালো শোকের চাঁদর
জড়িয়ে দিয়েছিল সমগ্র দেশকে।

বঙ্গবন্ধু কি কেবল একটি নাম?
না। নাম হলে তাঁকে মুছে ফেলা যেত।
তিনি তো একটি উচ্চারণ।
একটি জাতির নিজেকে আবিষ্কারের উচ্চারণ।
তিনি তো নদীর মতো- যার জন্ম আছে,
কিন্তু যার কোনো শেষ তীর নেই।
তিনি তো বজ্রের মতো- যাকে বন্দুকের শব্দ
ঢেকে রাখতে পারে, কিন্তু নিঃশেষ করতে পারে না।
তিনি তো বটবৃক্ষের মতো-
যার একটি কাণ্ড কেটে ফেললেও
শেকড় থেকে অসংখ্য নতুন বৃক্ষ জন্ম নেয়।

বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটির গভীরে
প্রোথিত সেই শেকড়, যার রস উঠে এসেছিল
একটি স্বাধীন দেশের পতাকায়।
তিনি ক্ষুধার্ত মানুষের এক মুঠো ভাতের স্বপ্ন,
নির্যাতিত মানুষের বুকের ভেতর
জমে থাকা অদম্য সাহস,
শৃঙ্খলিত মানুষের হাতে স্বাধীনতার চাবি,
আর পরাধীনতার অন্ধকারে
জ্বলে ওঠা একটি মহাসূর্য।

তাঁর কণ্ঠে যেদিন উচ্চারিত হয়েছিল-
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”
সেদিন শুধু একটি জনসভা শোনেনি।
শুনেছিল ধানের শীষ, নদীর ঢেউ
শুনেছিল মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা
হাজার বছরের বঞ্চনা।
শুনেছিল কৃষকের কাস্তে, শ্রমিকের হাতুড়ি।
শুনেছিল মায়ের বুকের ভেতর
সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য লুকিয়ে রাখা প্রার্থনা।

শুনেছিল একটি জাতি- যে জাতি তখনও
নিজের নামের পাশে স্বাধীনতার পূর্ণ পরিচয়টি
লিখে উঠতে পারেনি।
তাঁর কণ্ঠ তাদের সেই নামটি
দিয়ে দিয়েছিল- বাংলাদেশ।
তাই হত্যাকারীরা
যখন তাঁর দিকে বন্দুক তুলেছিল,
তারা ভেবেছিল একজন মানুষকে হত্যা করবে।
তারা বুঝতে পারেনি, তাঁর শরীরের ভেতর
একজন মানুষ একা ছিল না;
সেখানে বাস করছিল একটি জাতির স্বপ্ন।
তারা ভেবেছিল বুকের ভেতর গুলি ঢুকিয়ে
বজ্রকণ্ঠ থামিয়ে দেবে।

তারা জানত না, বজ্রকণ্ঠ একবার
আকাশে উঠলে তার প্রতিধ্বনি
পাহাড়ের গায়ে, নদীর বুকে,
মানুষের রক্তে, প্রজন্মের স্মৃতিতে
বহু যুগ ধরে বেঁচে থাকে।
তারা ভেবেছিল রক্ত ঝরালে স্বপ্নের মৃত্যু হয়।
তারা জানত না, কিছু রক্ত
মাটিতে পড়ে বীজ হয়ে যায়।
কিছু মৃত্যু ইতিহাসের কাছে পরাজয় নয়,
অমরত্বের সবচেয়ে নির্মম দরজা।

প্রদ্যোত / ১৫ আগস্ট ২০২৬

✦