বিধ্বস্ত ভোরে জন্ম নেওয়া দিগন্ত
বিধ্বস্ত ভোরে জন্ম নেওয়া দিগন্ত
ঝড়ে দুলে ওঠা বাংলার বুকের ভেতর,
যখন রক্তের ঢেউ ছাপিয়ে উঠেছিল আকাশ,
যখন বাতাসের প্রতিটি শ্বাস ছিল
বারুদের গন্ধে ভরা
সেই উত্তাল বছরের সাঁঝে
মাত্র এক কিশোরী কণ্ঠ,
কাঁপা দুই চোখ,
দু’হাত ভরে আগলে রেখেছিল
৩২ নম্বরের আলোর ঘরটি।
কেউ জানেনি, ইতিহাস তখনই
তার কাঁধে ধীরে ধীরে সাজিয়ে দিচ্ছিল
এক মহাকাব্যের ভার।
তারপর আসে নারকীয় ১৫ আগস্ট
কালো সূর্যের মতো এক সকাল,
যে সকাল পৃথিবীর হৃদয়ে
খোদাই করে দিয়েছিল
বাংলার সবচেয়ে অন্ধকার ক্ষত।
চারদিকে লেলিহান আগুন, তীব্র গুলি,
ক্ষত-বিক্ষত দেয়ালের কোণায়
প্রতিটি মুহূর্তই মৃত্যু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল…
কিন্তু সে বেঁচে গেল
হয়তো মুক্তির দেবতার অদৃশ্য আঙুল
তার মাথার ওপর ছায়া ধরে রেখেছিল,
হয়তো বাংলার ভবিতব্য
তার ভেতরেই খুঁজে পেয়েছিল
ভবিষ্যতের আলো।
আবারও একদিন
২১ আগস্টের রক্তাক্ত বিকেলে
বাঙালির মাটিতে নেমে আসে
অমানবিক বর্বরতার আরেক মহাপর্ব।
দু’দিকে মানুষ ছিটকে পড়ছে,
ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে রোদ,
চিৎকার থেমে যাচ্ছে থমকে থাকা বাতাসে
আর সেই মৃত্যু-নাচের মধ্যেও
সে দাঁড়িয়ে থাকে অবিচল, অক্ষত,
মহাকাব্যের মতোই নাটকীয়ভাবে
জীবন আবার তাকে ফিরিয়ে আনে
বাংলার অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির দিকে।
যে মেয়েটা
মৃত্যুর তিন তিনটি পর্বত পেরিয়ে
জীবনের সুর তুলে ধরেছে
বুকের গভীর থেকে
সে রক্তের দামে শিখেছে
দেশ মানে শুধু মানচিত্র নয়,
দেশ মানে মানুষের স্বপ্ন,
মানুষের চোখে আলোর বিশ্বাস,
মানুষের কণ্ঠে নিজের ঘরে ফিরবার অধিকার।
তাকে মারবে তোমরা!
যে মৃত্যুকে তিনবার পরাজিত করেছে,
যে দাঁড়িয়েছে ঝড়ের সামনে
একলা সৈনিকের মতো?
যে বারবার ফিরে এসেছে
এই দেশের মাটি ডেকে বলেছে বলে,
“এগিয়ে চল, বাঙালি,
অন্ধকার যতই ঘন হোক,
আলো তোমারই জন্মসূত্র।”
বোধের তালা খুলে দেখো
সে শুধু এক নেত্রী নয়,
সে বাংলার ফিরে পাওয়া আত্মা,
রক্তশোধিত ইতিহাসের ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো
নতুন প্রজন্মের আলো।
বাংলার মাঠঘাট, নদী, গ্রাম, শহর
সবখানে তার পদচিহ্নে
জেগে ওঠে মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর।
সে কান্ডারী
যে ডোবার মুখে দাঁড়ানো দেশকে
আবারও তরঙ্গের ওপর তুলে আনে,
হাজারো প্রতিকূলতার বিপরীতে
যে মানুষকে দেখায় আগামীর দিগন্ত।
বাংলার প্রতিটি মায়ের চোখে
তাকে দেখা যায় ছায়ার মতো অবিচল,
প্রতিটি যুবকের স্বপ্নে
তার কণ্ঠের দৃঢ়তা
ঝড়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি হয়ে ওঠে।
পথে পথে যত আঁধার,
যত অমানবিক হাত
বিলীন করতে চেয়েছে তার আলো
সবই ভেঙে পড়েছে
তার সাহসিকতার উপরে ঝুলে থাকা
অদম্য নক্ষত্রের সামনে।
আজ বাংলাদেশের বাতাসে
এক মহাকাব্যিক সত্য ভেসে থাকে
ইতিহাসের যে ধারাবাহিক লেলিহান আগুন
তার চারপাশে প্রাচীর তুলেছিল,
সেই আগুনই
তাকে গড়ে তুলেছে
অবিসংবাদিত, অপরাজেয়,
মানুষের মুক্তির সমুদ্রচালক রূপে।
যতদিন বাংলার নদীগুলো
সৈনিকের মতো স্রোত বওয়াবে,
যতদিন এই মাটিতে
স্বাধীনতা নামে কোনো শব্দ বেঁচে থাকবে
ততদিন তার পদযাত্রা
মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হবে
অগ্নিদীপ্ত এক উপাখ্যানের মতো।
সে শুধু রাজনীতির নাম নয়
সে বাঁচার প্রত্যয়,
সে নতুন ভোরের প্রতিজ্ঞা,
সে বাঙালির সংগ্রামের ধ্রুবতারা।
তাকে মারবে তোমরা?
ইতিহাস হেসে ওঠে
যে আলোকে বারবার নিভিয়ে দিতে চায়
অন্ধকারের নিষ্ঠুর হাত,
সেই আলোকই
সময়কে শেখায়
প্রকৃত নেতৃত্ব কীভাবে জন্ম নেয়
ঘাতের ভেতর থেকে,
জীবন কীভাবে জেগে ওঠে
বাংলার মুক্তির ডাক হয়ে।
আর সে
সেই ডাকেরই দীপ্ত উত্তর।
প্রদ্যোত / ১৭ নভেম্বর ২০২৫