← Back to poetry
❧

পাললিক ভূমির গীতা : পর্ব (০০১)

Poetry

পাললিক ভূমির গীতা : পর্ব (০০১)

(কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপ)

অর্জুন:
কেশব,
এই যে নদীর বুক ভাসানো দেশ,
এই যে পলিমাটির অনন্ত বিস্ময়,
এই যে শস্যের হাসি,
জলের গন্ধ,
কাদামাটির উর্বর স্পন্দন-

কেন এ ভূমির বুকে
এত দীর্ঘ কান্না?

কেন এ দেশের মানুষ
শতাব্দীর পর শতাব্দী
অন্যের স্বপ্ন গড়ে,
নিজেরা থাকে অপূর্ণ?

কৃষ্ণ:
পার্থ,
যে ভূমি উর্বর,
তার প্রতি লোভ জন্মায়।
যে নদী সোনা বয়ে আনে,
তার ঘাটে ভিড় করে বণিক।
যে মাটি প্রাণ দেয়,
তার বুকে নেমে আসে সাম্রাজ্য।
এই বাংলার ইতিহাস
শুধু মানুষের নয়,
লোভেরও ইতিহাস।

অর্জুন:
আমি দেখি,
পশ্চিমের মরুভূমি,
উত্তরের পাহাড়,
দূর সমুদ্রের তীর থেকে
কত মানুষ এসেছে।
কেউ ব্যবসার নামে,
কেউ ধর্মের নামে,
কেউ সভ্যতার নামে,
কেউ মুক্তির নামে।
কিন্তু শেষে
সবাই যেন নিয়ে গেছে
এই ভূমির কিছু না কিছু।

কৃষ্ণ:
হ্যাঁ পার্থ।
কেউ নিয়েছে মশলা,
কেউ নিয়েছে মসলিন,
কেউ নিয়েছে শ্রম,
কেউ নিয়েছে প্রতিভা।
কেউ নিয়েছে নদীর পথ,
কেউ নিয়েছে বাজার,
কেউ নিয়েছে সম্পদ।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর-
কেউ কেউ নিয়েছে
মানুষের আত্মবিশ্বাস।

অর্জুন:
কেশব,
তবে কি এ দেশের মানুষ
চিরকালই পরাজিত?

কৃষ্ণ:
না পার্থ।
যে জাতি
পদ্মা-মেঘনা-যমুনার সন্তান,
সে কখনও সম্পূর্ণ পরাজিত নয়।
তারা বারবার প্রতারিত হয়েছে,
কিন্তু বারবারই দাঁড়িয়েছে।

অর্জুন:
আমি শুনেছি,
অনেক প্রাচীনকালে
মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে
সূর্যের শক্তিকে প্রণাম করত,
নদীর জলে জীবন দেখত,
বাতাসে ঈশ্বরের নিশ্বাস শুনত।
প্রকৃতিই ছিল তাদের প্রথম শিক্ষক।

কৃষ্ণ:
মানুষের প্রথম ধর্ম
ছিল বিস্ময়।
প্রথম উপাসনা
ছিল কৃতজ্ঞতা।
প্রথম মন্দির
ছিল আকাশ।
প্রথম প্রদীপ
ছিল সূর্য।
প্রথম সঙ্গীত
ছিল নদীর ধ্বনি।
পরে মানুষ
নিজের বিশ্বাসকে
হাজার রূপ দিয়েছে।

এটাই ইতিহাসের স্বাভাবিক গতি।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয়
যখন বিশ্বাস
জ্ঞানকে বন্দী করে।

অর্জুন:
তাহলে কেশব,
এই বিভাজন কোথা থেকে এল?

কৃষ্ণ:
ভয় থেকে।
যখন মানুষ ভয় পায়,
তখন সে দেয়াল তোলে।
যখন সে অজ্ঞ থাকে,
তখন সে প্রশ্নকে শত্রু ভাবে।
আর যখন ক্ষমতালোভী মানুষ
সেই ভয়কে ব্যবহার করে,
তখন জন্ম নেয় বিভাজন।

অর্জুন:
আমি দেখি,
এই বাংলায়
কৃষক আছে,
জেলে আছে,
শ্রমিক আছে,
কবি আছে,
বিজ্ঞানী আছে,
শিল্পী আছে।
তবু তারা একসাথে
নিজেদের শক্তি বুঝতে পারে না কেন?

কৃষ্ণ:
কারণ তাদের শেখানো হয়েছে
নিজেদের পার্থক্য দেখতে।
একজনকে বলা হয়েছে-
তুমি আলাদা।
অন্যজনকে বলা হয়েছে-
তুমি আরও আলাদা।
এভাবে শত ভাগে ভেঙে
মানুষকে দুর্বল করা সহজ।

অর্জুন:
আর আজ?
আজও তো দেখি
অনেক মেধাবী সন্তান
দেশ ছেড়ে চলে যায়।

কৃষ্ণ:
কারণ প্রতিভা
আলো খোঁজে।
যেখানে গবেষণার মাঠ নেই,
সেখানে বীজ অঙ্কুরিত হয় না।
যেখানে স্বাধীন চিন্তার স্থান নেই,
সেখানে মেধা দীর্ঘদিন থাকে না।
তাই অনেকেই
অন্য আকাশে উড়ে যায়।

অর্জুন:
তাহলে কী হবে কেশব?
এই বাংলার মুক্তির পথ কোথায়?

কৃষ্ণ:
মুক্তি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, পার্থ।
মুক্তি শুরু হয়
একটি প্রশ্ন থেকে।
একটি বিদ্যালয় থেকে।
একটি গবেষণাগার থেকে
একটি বই থেকে।
একটি সত্য উচ্চারণ থেকে।

অর্জুন:
তাহলে কি অস্ত্র নয়?

কৃষ্ণ:
অস্ত্রের চেয়ে বড়
জ্ঞান।
সাম্রাজ্যের চেয়ে বড়
সৃজনশীলতা।
শক্তির চেয়ে বড়
মানবিকতা।

অর্জুন:
তবে আমাদের সংকল্প কী হবে?

কৃষ্ণ:
সংকল্প হবে-
শিশুকে মুখস্থ নয়,
চিন্তা শেখানো।
ধর্মকে ঘৃণার নয়,
মানবতার ভাষায় বোঝা।
বিজ্ঞানকে ভয় নয়,
বন্ধু করা।
প্রকৃতিকে সম্পদ নয়,
অভিভাবক ভাবা।
নারী ও পুরুষকে
প্রতিদ্বন্দ্বী নয়,
সহযাত্রী ভাবা।
বাংলা ভাষাকে
শুধু আবেগ নয়,
জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ভাষা করা।

অর্জুন:
আর পৃথিবীর প্রতি?

কৃষ্ণ:
বাংলা যদি সত্যিই জাগে,
তবে সে কেবল নিজের জন্য জাগবে না।
নদীর মতো
সে প্রবাহিত হবে।
আলোর মতো
সে ছড়িয়ে পড়বে।
মানুষকে মানুষ ভাবার
যে শিক্ষা,
সে শিক্ষা বহন করবে
পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে।

অর্জুন:
কেশব,
তবে আমি দেখি-
একদিন
এই পাললিক ভূমির সন্তানরা
আবার দাঁড়াবে।

কৃষ্ণ:
হ্যাঁ পার্থ।
যেদিন তারা
নিজেদের ভয়কে জয় করবে,
অজ্ঞতার কুয়াশা সরাবে,
পরস্পরের হাত ধরবে-
সেদিন বাংলার নদীগুলো
শুধু জল নয়,
জ্ঞানও বহন করবে।
সেদিন বাংলার মাটি
শুধু ধান নয়,
নতুন সভ্যতার বীজ ফলাবে।

সেদিন বাংলার মানুষ বলবে-
আমরা কারও শত্রু নই।
আমরা আলোর যাত্রী।
আমরা নদীর সন্তান।
আমরা মানুষের পক্ষে।
আমরা পৃথিবীর পক্ষে।

আর তখন-
পদ্মার ঢেউ,
মেঘনার স্রোত,
যমুনার কলতান,
সুন্দরবনের বাতাস,
ধানক্ষেতের সবুজ সমুদ্র-
একসাথে গেয়ে উঠবে
“জাগো মানুষ,
জাগো জ্ঞানে,
জাগো প্রেমে,
জাগো আলোয়।”

প্রদ্যোত / ০৫ জুন ২০২৬

✦