নীল গ্রহের আর্তনাদ
নীল গ্রহের আর্তনাদ
এই যুদ্ধ কি থামবে কোনোদিন?
মানুষ কি শুনবে কখনো
নিজের হৃদয়ের ভেতরকার ভাঙা শঙ্খধ্বনি?
দেখো, দিগন্তের ওপারে আরেকটি দেশ
আরেকটি পতাকার দিকে দাঁত কিড়মিড় করে,
অস্ত্রের আগুনে লিখতে চায়
নিজেদের অহংকারের ইতিহাস।
শহর উঠে যায় আকাশ ছুঁয়ে,
কংক্রিটের দেয়াল গিলে খায় নদীর গান,
বাণিজ্যের রথ গড়িয়ে চলে
স্বপ্নের হাড়ের ওপর দিয়ে।
কিসের এই প্রতিযোগিতা?
কিসের এই উন্মাদনা?
এক মুঠো শ্বাস, একটি শরীর,
একটি ক্ষণিক জীবন-
এইটুকুর জন্যই তো জন্ম মানুষের!
তবু সে চায় দখল করতে পর্বত, সমুদ্র, মহাদেশ,
এমনকি আকাশেরও সীমান্ত।
লোভের আগুনে তার চোখ জ্বলে,
লালসার স্রোতে ভেসে যায় বিবেক,
হিংসা তার শিরায় শিরায়
ধাতব নদীর মতো প্রবাহিত।
পরনিন্দার কালো ধোঁয়া
ঢেকে দেয় তার আত্মার আকাশ,
বিদ্বেষের কাঁটা তার নিজেরই হৃদয়ে গেঁথে থাকে।
আর এইসবের মাঝখানে
নিঃশব্দে কাঁদে পৃথিবী।
বনের বুক চিরে
উঠে যায় ইটের অরণ্য,
নদীর কণ্ঠে জমে ওঠে
যাবতীয় নাগরিক বর্জ্যের পাহাড়।
বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে
অদৃশ্য বিষ-
কার্বনের কালো মেঘ
ঢেকে ফেলে নীল গ্রহের হাসি।
পাখিরা হারায় পথ,
সমুদ্রের মাছেরা গিলে ফেলে মানুষের বর্জ্যের মৃত্যু।
হিমবাহের বুক থেকে
গলতে থাকে হাজার বছরের নীরবতা।
এই কি তবে সভ্যতা?
যে প্রাণীটির নাম মানুষ-হোমো স্যাপিয়েন্স,
জ্ঞানী বলেই যার পরিচয়,
সে-ই কি সবচেয়ে অন্ধ নয়?
নিজের শরীরের ওপরই যার নেই অধিকার,
ক্ষুধা, রোগ আর মৃত্যুর কাছে
যে প্রতিদিন পরাজিত-
সে-ই আবার স্বপ্ন দেখে
সারা পৃথিবী গ্রাস করার।
হে মানুষ, তোর শরীরটুকুই তো তোর নয়-
মাটি থেকে ধার করা হাড়,
নদী থেকে ধার করা রক্ত,
আকাশ থেকে ধার করা শ্বাস।
যাবি কোথায় বল?
শেষে তো ফিরতেই হবে এই মাটির বুকে,
যে মাটি আজ তোর লোভের বুটে ক্ষতবিক্ষত।
হে প্রকৃতি, হে পৃথিবী-মাতা,
তুমি তো অসীম ধৈর্যের নদী-
সহ্য করে গেছো যুগের পর যুগ
মানুষের অহংকারের আগুন।
তবু আজ তোমার নিঃশ্বাসে শুনি ঝড়ের ডাক,
তোমার আকাশে জমে ওঠে
বজ্রের অন্ধকার ভাষা।
যদি কখনো জেগে ওঠো তুমি-
সমুদ্রের ঢেউয়ে, ঝড়ের ডানায়, অগ্নির গর্জনে-
তবে মুহূর্তেই ধুয়ে যাবে
এই কংক্রিটের অহংকার।
কারণ, পৃথিবী মানুষের নয়,
মানুষই পৃথিবীর ক্ষণিক অতিথি।
তবু এই অন্ধকারের ভেতরেও
একটি ক্ষীণ আলোর বিশ্বাস রয়ে যায়।
কোথাও কোনো শিশু
গাছের চারা রোপণ করছে,
কোথাও কোনো কবি
যুদ্ধের বিরুদ্ধে লিখছে প্রেমের গান,
কোথাও কোনো মানুষ
অপর মানুষকে জড়িয়ে ধরছে
ধর্ম আর সীমান্ত ভুলে।
সেই মুহূর্তেই
পৃথিবী একটু শ্বাস নেয়।
হে মানুষ,
ধ্বংসের দেবতা হয়ো না-
হয়ে ওঠো সৃষ্টির সহযাত্রী।
কারণ, যদি তুমি শিখে ফেলো মাটির ভাষা,
নদীর ধৈর্য, বনের মমতা-
তবে এই নীল গ্রহ আবারও জ্বলে উঠবে
নক্ষত্রের মতো সুন্দর।
আর তখন পৃথিবী বলবে, “মানুষ, অবশেষে
তুমি মানুষ হয়েছো।”
প্রদ্যোত / ১৩ মার্চ ২০২৬