গুরুচণ্ডালী
গুরুচণ্ডালী
দেখিলাম পৃথিবী!
এক বিশাল মেলা, নাম তার সভ্যতা!
প্রবেশদ্বারে লেখা: মানবতার উৎসব
ভিতরে ঢুকে দেখি -
হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন
ইহুদি, নাসারা, শিয়া, সুন্নি, কাদিয়ানি
সবাই আছে, সবাই খুব ব্যস্ত,
কেউ কারো চেয়ে কম নয়
শুধু মানুষটাই অনুপস্থিত।
আমি এক দোকানির কাছে জিজ্ঞেস করিলাম,
“ভাই, মানুষ কোথায় বিক্রি হয়?”
সে হাসিয়া কহিল,
“মানুষ? ওইটা পুরোনো মডেল,
এখন আমরা ব্র্যান্ডেড পরিচয় বিক্রি করি-
ফ্রি সঙ্গে প্যাকেজড অহংকার,
আর চাইলে একটু অতিরিক্ত বিভেদ।”
দেখিলাম, একজন গর্বে বলিতেছে,
“আমি ব্রাহ্মণ!”
আরেকজন উত্তর দিল,
“আমি ক্ষত্রিয়!”
কেউ বলিল,
“আমি বৈশ্য, হিসাব আমার হাতে।”
শূদ্র বলিল,
“আমি কাজ করি, তোমরা নাম করো।”
সবাই পরিচয়ের মুকুট পরে আছে-
কিন্তু মাথা নেই,
কারণ মাথা থাকিলে প্রশ্ন জন্মায়।
এক গির্জার ঘণ্টা বাজিল-
ভিতরে প্রার্থনা, বাইরে প্রতিযোগিতা।
এক মসজিদের মিনারে আজান উঠিল-
ভিতরে শান্তি, বাইরে শোরগোল।
এক মন্দিরে প্রদীপ জ্বলিল-
ভিতরে আলো, বাইরে আগুন।
এক বিহারে ধ্যান বসিল-
ভিতরে নীরবতা, বাইরে তর্ক।
আমি ভাবিলাম-
এত দরজা, এত পথ,
কিন্তু কারও পথ কি মানুষের দিকে যায়?
রাস্তার মোড়ে দেখি-
হাসি বিক্রি হচ্ছে কিস্তিতে,
করুণা মজুদ আছে গুদামে,
ক্ষমা আউট অব স্টক!
একজন বলিল,
“ভাই, সত্যি নেবেন?
আজ ডিসকাউন্ট চলছে!
শুধু একটু সুবিধামতো মিথ্যা যোগ করলে
দাম অর্ধেক।”
শিশুরা খেলিতেছে-
খেলার নাম আমরা বনাম তারা।
জেতার নিয়ম সহজ:
যাকে তুমি চেনো না,
তাকে ভয় করো।
যাকে ভয় করো,
তাকে দূরে সরাও।
যাকে দূরে সরাও,
তার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেকে উঁচু ভাবো।
আমি আকাশের দিকে তাকাইলাম-
তারারা নিরপেক্ষ,
চাঁদ ধর্মহীন,
বাতাস কারও পক্ষ নেয় না।
শুধু মানুষই-
নিজেকে খণ্ড খণ্ড করে
নিজেরই বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এক জ্ঞানী বৃদ্ধের কাছে গেলাম-
তিনি বলিলেন,
“মানুষ খুঁজছ?
মানুষ কোনো পরিচয় নয়,
মানুষ এক অভ্যাস-
দেখা, শোনা, বোঝা,
আর অন্যের ব্যথাকে নিজের ভেবে
নীরবে একটু সরে দাঁড়ানো।”
আমি আবার মেলায় ফিরিলাম-
উচ্চস্বরে ঘোষণা করিলাম,
“হিন্দু দেখিলাম , মুসলমান দেখিলাম
বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জৈন দেখিলাম
ইহুদি দেখিলাম, নাসারা দেখিলাম
জাত-পাত, হিংসা, বিভেদ, হানাহানি
সবই তো নিদারুণ অস্তিত্বে বিরাজিত!
কিন্তু তোমাদের এই মানবতার উৎসবে
মানুষতো দেখিলাম না!
সে কি কোথাও আছে?”
মেলা থামিল না,
স্লোগান থামিল না,
শুধু দূরে কোথাও
একটি ছোট্ট শিশু
তার রুটি ভাঙিয়া
আরেক শিশুকে দিল।
আমি চুপচাপ দাঁড়াইলাম-
হয়তো মানুষ ঠিক এখানেই জন্ম নেয়,
নামহীন, নিরপেক্ষ, নীরব!
যেখানে পরিচয় ঘুমায়,
আর করুণা জেগে ওঠে।
প্রদ্যোত / ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬