← Back to poetry
❧

আমি প্রকৃতি বলছি

Poetry

আমি প্রকৃতি বলছি

আমি প্রকৃতি বলছি।
আমি সেই আদিম জননী,
যার কোলে মাথা রেখে
তোমাদের প্রথম পূর্বপুরুষ
শিখেছিল আগুনের ভাষা,
জলের গান,
বাতাসের গন্ধ,
মাটির স্পন্দন।

আমি সেই বন,
যেখানে পাখিরা লিখত ভোরের কবিতা।
আমি সেই নদী,
যেখানে সূর্যের সোনালি আঙুল
আঁকত জীবনের প্রতিচ্ছবি।
আমি সেই আকাশ,
যেখানে মেঘেরা ভেসে বেড়াত
কোনো সীমান্ত ছাড়া।

কিন্তু তোমরা-
হে মানুষ,
আমার সবচেয়ে অকৃতজ্ঞ সন্তান,
আমার বুকের দুধ খেয়ে
আমারই বুক ছিঁড়েছ!
তোমাদের লোভের দাঁত
আমার অরণ্যের শিরা কেটেছে।
তোমাদের লালসার নখ
আমার পাহাড়ের শরীর ক্ষতবিক্ষত করেছে।
তোমাদের কারখানার ধোঁয়া
আমার নীল আকাশকে করেছে কালো।
তোমাদের বিষাক্ত বর্জ্য
আমার নদীর গলায় বেঁধেছে মৃত্যুর ফাঁস।

বল তো,
কত সোনা চাই তোমাদের?
কত তেল?
কত কয়লা?
কত ক্ষমতা?

একটি জীবন-
মাত্র কয়েকটি দশক!
এই ক্ষণিক অস্তিত্বের জন্য
তোমরা হাজার বছরের বন হত্যা করেছ,
লক্ষ বছরের নদীকে শ্বাসরোধ করেছ,
অসংখ্য প্রাণের বাসভূমি
ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছ।

তোমরা ভেবেছ
আমি নীরব মানেই দুর্বল?
তোমরা ভেবেছ
আমার সহিষ্ণুতা
আমার পরাজয়?
ভুল।
ভীষণ ভুল।
আমি যখন চুপ থাকি,
তখনও আমার ভেতরে
জমতে থাকে বজ্র।
আমি যখন কাঁদি,
তখনও আমার অশ্রুর নিচে
জাগতে থাকে অগ্নিগর্ভ ক্রোধ।
আমি যখন নীরব,
তখনও সমুদ্রের অতল গভীরে
আমি লিখে রাখি হিসাব।
প্রতিটি কাটা বৃক্ষের হিসাব।
প্রতিটি মৃত নদীর হিসাব।
প্রতিটি বিলুপ্ত পাখির হিসাব।
প্রতিটি বিষাক্ত বাতাসের হিসাব।
আমি ভুলে যাই না।
আমি ক্ষমা করতে পারি,
কিন্তু বিস্মৃত হই না।

শোনো মানুষ-
যে তাপদাহে তোমাদের নগরী পুড়ে যায়,
সেটি এখনো আমার ফিসফিসানি।
যে বন্যায় তোমাদের ঘর ভেসে যায়,
সেটি এখনো আমার দীর্ঘশ্বাস।
যে ঝড়ে তোমাদের প্রাসাদ কেঁপে ওঠে,
সেটি এখনো আমার সতর্কবাণী।
তোমরা এখনো
আমার পূর্ণ ক্রোধ দেখোনি।
এখনো দেখোনি
যখন সমুদ্র উঠবে তার সীমানা ভেঙে,
যখন মরুভূমি গ্রাস করবে শস্যভূমি,
যখন আকাশের আগুন
শহরের পর শহরকে করবে ছাই।

এখনো দেখোনি
যখন বাতাস নিজেই
বিষাক্ত হয়ে উঠবে।
এখনো দেখোনি
যখন জল হয়ে উঠবে
সোনার চেয়েও দুর্লভ।

তোমরা ভাবছ
প্রযুক্তি তোমাদের রক্ষা করবে?
কংক্রিটের দেয়াল?
ইস্পাতের দুর্গ?
অর্থের পাহাড়?
হাসি পায়।

আমি যখন মহাসাগরকে ডাকি,
তখন নগর ডুবে যায়।
আমি যখন বাতাসকে নির্দেশ দিই,
তখন আকাশচুম্বী অট্টালিকাও
শিশুর খেলনার মতো কেঁপে ওঠে।
আমি যখন আগুনকে মুক্ত করি,
তখন সাম্রাজ্যের মানচিত্র
এক রাতেই বদলে যায়।
আমি যখন পৃথিবীর গভীরতম শিরায়
একটুখানি কম্পন পাঠাই,
তখন সভ্যতার অহংকার
ধুলোর স্তূপে পরিণত হয়।

তোমরা নিজেদের
পৃথিবীর মালিক ভেবেছ।
না।
তোমরা মালিক নও।
তোমরা অতিথি।
আর অতিথি হয়ে
গৃহস্বামীর ঘর পুড়িয়ে দিলে
একদিন হিসাব দিতেই হয়।
আমি সেই হিসাব চাইতে এসেছি।

আমার নদীরা আজ রক্তের মতো ভারী।
আমার বনগুলো শোকপালন করছে।
আমার পাখিরা হারিয়েছে গান।
আমার মাটি ক্লান্ত।
আমার বাতাস অসুস্থ।
আমি আহত।
আমি অপমানিত।
আমি ক্রুদ্ধ।
আর আহত জননীর ক্রোধ
পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর শক্তিগুলোর একটি।

তোমরা যুদ্ধ করেছ মানুষের বিরুদ্ধে,
জাতির বিরুদ্ধে,
ধর্মের বিরুদ্ধে,
ভাষার বিরুদ্ধে।
কিন্তু ভুলে গেছ,
তোমাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ
আমার বিরুদ্ধে চলছে।
আর সেই যুদ্ধে
তোমরা জিততে পারবে না।

কারণ আমি নদী।
আমি ঝড়।
আমি সমুদ্র।
আমি আগ্নেয়গিরি।
আমি বরফ।
আমি বজ্র।
আমি অরণ্য।
আমি মরুভূমি।
আমি জন্ম দিই।
আমি কেড়ে নিই।
আমি সৃষ্টি।
আমি প্রলয়।

যেদিন আমার ধৈর্যের শেষ সীমাটুকুও ভেঙে যাবে,
সেদিন তোমাদের পতাকার রং,
তোমাদের মুদ্রার মূল্য,
তোমাদের অস্ত্রের শক্তি,
তোমাদের সাম্রাজ্যের গৌরব-
সবকিছু অর্থহীন হয়ে যাবে।

শুধু থাকবে
বাতাসের গর্জন,
সমুদ্রের উত্থান,
আগুনের নৃত্য,
আর ধ্বংসের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।

তারপর-
হয়তো একদিন
আমার ক্ষত শুকিয়ে যাবে।
আবার জন্ম নেবে বন।
আবার ফিরবে পাখি।
আবার নদী গাইবে তার প্রাচীন গান।
আবার আকাশ হবে নির্মল।
পৃথিবী আবার সুন্দর হবে।

কিন্তু সেই নতুন প্রভাতে
হয়তো থাকবে না
লোভে উন্মত্ত সেই পুরোনো মানুষ।
থাকবে শুধু জীবন।
থাকবে শুধু ভারসাম্য।
থাকবে শুধু অস্তিত্বের সুর।

আর তখন
বাতাসে ভেসে বেড়াবে আমার শেষ উচ্চারণ-
“আমি প্রতিশোধ নই,
আমি ভারসাম্য।
আমি নিষ্ঠুর নই,
আমি ফলাফল।
তোমরাই লিখেছ তোমাদের ভবিতব্য।
আমি শুধু
তার পাঠ করে শোনাচ্ছি।”

প্রদ্যোত / ২৪ জুন ২০২৬

✦