অভিযাত্রী
অভিযাত্রী
তোমরা যেসব দরজায়
লাল কালি দিয়ে লিখে দাও-
“প্রবেশ নিষেধ”,
আমি সেখানেই শুনতে পাই
অদৃশ্য কোনো নক্ষত্রের আহ্বান।
কারণ মানুষ জন্মগতভাবেই
একটি অনুসন্ধিৎসু কণা-
তার মস্তিষ্কে জ্বলতে থাকে
কোয়ার্কের ভিতরে আটকে থাকা
প্রাচীন আলোর বিদ্রোহ।
তোমরা যখন আকাশের বুকে
এরিয়া ফিফটি ওয়ানের চারপাশে
লোহার বেড়া তুলে দাও,
আমি বুঝে যাই-
ওখানে হয়তো লুকিয়ে আছে
মানবসভ্যতার অপূর্ণ সমীকরণ,
যেখানে সময় নিজেই নিজের ছায়াকে
পরীক্ষাগারে রেখে গেছে।
তোমরা যখন কৈলাসের দিকে
আঙুল তুলে বলো-
“ওপথ দেবতাদের”,
আমি তখন হিমবাহের স্তরে স্তরে
শুনি কার্বন-ডেটিংয়েরও পুরোনো কোনো ভাষা।
হয়তো পৃথিবীর প্রথম প্রার্থনা
সেখানে এখনো বরফ হয়ে ঘুমিয়ে আছে।
তোমরা যখন গভীর সমুদ্রের
নীল অন্ধকার ঢেকে রাখো,
আমি জানি-
সেখানে হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের পাশে
জন্ম নিয়েছিল প্রথম প্রাণের কোষ,
যেখানে সালফারের ধোঁয়া আর উত্তপ্ত খনিজ
মিলে তৈরি করেছিল
RNA-এর প্রথম কাঁপন।
বার্মুডা ট্রায়াঙ্গেলের ভেতরে
যদি হারিয়েও যায় জাহাজ,
আমি তবু সেখানে খুঁজতে চাই
চৌম্বকীয় বিভ্রমের ভাষা,
কারণ রহস্য মানেই অলৌকিক নয়-
অনেক সময় রহস্য মানে
এখনো আবিষ্কৃত হয়নি এমন বিজ্ঞান।
তোমরা যাকে বলো “অভয়ারণ্য”,
আমি তাকে বলি-
চেতনার গোপন গবেষণাগার।
কারণ প্রকৃতির প্রতিটি নিষিদ্ধ বনভূমিতে
লুকিয়ে থাকে বিবর্তনের অমীমাংসিত অধ্যায়।
আর শরীর-
হ্যাঁ, এই মানবশরীর!
এ কোনো সাধারণ মাংসের স্থাপত্য নয়।
তোমার নিউরনের ভেতর
যে বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে,
তা অনেকটা মিল্কিওয়ের
স্পাইরাল বাহুর মতোই বিস্তৃত।
তোমার DNA চারটি বর্ণের এক মহাকাব্য,
A, T, G, C যেন সৃষ্টিকর্তার প্রথম লিখিত সংগীত।
তোমার মস্তিষ্কের সিন্যাপ্সগুলো
প্রতিদিন যে পরিমাণ সংকেত আদানপ্রদান করে,
তা কোনো কোনো গ্যালাক্সির
তারার সংখ্যাকেও হার মানায়।
তোমার শরীরের প্রতিটি কোষে
লুকিয়ে আছে বিগ ব্যাং-এর ধূলিকণা,
কারণ ক্যালসিয়াম, আয়রন, কার্বন-
সবই জন্ম নিয়েছিল
কোনো মৃত নক্ষত্রের বিস্ফোরণে।
আমি যখন তোমার চোখের দিকে তাকাই,
আমি শুধু একজন মানুষকে দেখি না-
আমি দেখি-
১৩.৮ বিলিয়ন বছরের বিবর্তিত মহাবিশ্ব
নিজেকেই পর্যবেক্ষণ করছে।
তোমরা যতই নিষেধাজ্ঞা দাও,
আমি ততই বুঝি-
জ্ঞান কখনো নিরাপদ অঞ্চলে জন্মায় না।
জ্ঞান জন্মায়-
নিষিদ্ধ গুহার দেয়ালে আঁকা প্রথম চিত্রে,
নিষিদ্ধ আপেলের স্বাদে,
অজানা সমুদ্র পাড়ি দেওয়া নাবিকের দুঃসাহসে,
আর সেই প্রশ্নে-
যে প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পায় সভ্যতা।
আমি সেখানে যাবই।
হিমালয়ের বরফে,
মহাসাগরের খাদে,
মস্তিষ্কের নিউরনে,
ডার্ক ম্যাটারের নীরবতায়-
যেখানেই লুকিয়ে থাকুক সৃষ্টির সূত্র।
কারণ আমি জানি,
মানুষের প্রকৃত ধর্ম
ভয় নয়-
অনুসন্ধান।
প্রদ্যোত / ১২ মে ২০২৬