সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব: ভালোবাসার সূচনা, অধিকারবোধের উত্থান এবং ভাঙনের অন্তর্লিখিত বিজ্ঞান
“সম্পর্ক শুরু হয় নিজে অপরের মতো হতে গিয়ে, শেষ হয় অপরকে নিজের মতো বানাতে গিয়ে।”- মাত্র একটি বাক্য। অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের সম্পর্ক, ভালোবাসা, ব্যক্তিত্ব, নিরাপত্তাবোধ, অহং, ভয় এবং বিচ্ছেদের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস। এই একটি বাক্যকে যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তবে বোঝা যায়-বেশিরভাগ সম্পর্কের জন্ম এবং মৃত্যুর বীজ একই মাটিতে রোপিত থাকে।
মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন খাদ্য নয়, আশ্রয়ও নয়; তার সবচেয়ে গভীর প্রয়োজন হলো মানসিক সংযুক্তি। পৃথিবীতে জন্মের পর একটি শিশু প্রথম যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা ভাষার নয়, যুক্তির নয়-সম্পর্কের। মায়ের স্পর্শ, বাবার কণ্ঠ, পরিচিত মুখের নিরাপত্তা-এসবই তার মস্তিষ্কে গড়ে তোলে সংযোগের প্রথম মানচিত্র। সেই মানচিত্রই পরবর্তী জীবনে প্রেম, বন্ধুত্ব, দাম্পত্য কিংবা যেকোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই কারণেই মানুষ যখন কারও প্রেমে পড়ে, তখন সে শুধু একজন মানুষকে ভালোবাসে না; সে তার ভেতরে একটি নতুন পৃথিবীতে প্রবেশের অনুমতি চায়।
ভালোবাসার শুরুতে মানুষের আচরণে একটি বিস্ময়কর পরিবর্তন দেখা যায়। সে নিজের অহংকে কিছুটা সরিয়ে রাখে। অপরের পছন্দের গান শুনতে শুরু করে, তার ভাষার শব্দ ধার করে, তার প্রিয় খাবারের স্বাদ নিতে শেখে, তার স্বপ্নের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎকে জুড়ে দিতে চায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি কেবল রোমান্টিক আবেগ নয়; এটি মানুষের আত্ম-সম্প্রসারণের প্রবণতা (Self-expansion)। মানুষ অনুভব করে- অপরকে জানার মাধ্যমে যেন সে নিজেকেও আরও বড় করে আবিষ্কার করছে।
এই পর্যায়ে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গ্রহণযোগ্যতার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ তখন বদলায়, কিন্তু সেই বদলে যাওয়া জোরপূর্বক নয়। সেখানে আনন্দ আছে, কৌতূহল আছে, আবিষ্কারের উল্লাস আছে। সে নিজেকে মুছে ফেলতে চায় না; বরং নিজের ভেতরে আরেকজনের জন্য একটি নতুন কক্ষ তৈরি করে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের ভেতরে আরেকটি মানসিক প্রক্রিয়া নীরবে জন্ম নিতে শুরু করে। প্রথমে যা ছিল সংযুক্তি, ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় অধিকারবোধে। আর অধিকারবোধের গভীরে থাকে একটি মৌলিক মানবিক ভয়- হারিয়ে ফেলার ভয়।
মানুষ যাকে গভীরভাবে ভালোবাসে, তাকে হারানোর আশঙ্কাও ঠিক ততটাই গভীর হয়। এই ভয় অনেক সময় সরাসরি প্রকাশ পায় না। বরং এটি ছদ্মবেশ ধারণ করে- পরামর্শ, উদ্বেগ, যত্ন কিংবা অতিরিক্ত খোঁজখবরের আকারে। ধীরে ধীরে সেই যত্নের ভাষার মধ্যেই নিয়ন্ত্রণের ব্যাকরণ ঢুকে পড়ে।
“ওভাবে পোশাক পরো না।”
“ওদের সঙ্গে মিশো না।”
“এভাবে কথা বলো না।”
“আমার মতো করে ভাবো।”
“আমার মতো করে সিদ্ধান্ত নাও।”
প্রথমে এগুলো খুব সাধারণ মনে হয়। কিন্তু একসময় দেখা যায়, মানুষটি আর নিজের সিদ্ধান্তে বাঁচছে না; সে সম্পর্কটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের ব্যক্তিত্বকে সংকুচিত করে ফেলছে।
মনোবিজ্ঞানে এটিকে ব্যক্তিসত্তার ক্ষয় (Loss of Individuality) বলা যায়। মানুষ তখন আর নিজের মতো থাকে না; সে হয়ে ওঠে অন্যের প্রত্যাশার একটি সংস্করণ।
এখানেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শুরু হয়।
যে মানুষটির স্বতন্ত্রতা, স্বাধীন চিন্তা, হাসি, অভ্যাস, স্বপ্ন কিংবা ভিন্নতায় একদিন আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিন্নতাকেই আমরা সংশোধন করতে চাই। আমরা ভুলে যাই- যাকে পরিবর্তন করতে চাইছি, একদিন তো তার এই স্বকীয়তার কারণেই তাকে ভালোবেসেছিলাম।
ভালোবাসার এই বৈপরীত্য মানুষের মনোজগতের এক বিস্ময়কর সত্য। আমরা যাকে ভালোবাসি, তাকে হারাতে চাই না। আর হারাতে না চেয়েই কখনও কখনও তাকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরি যে, তার শ্বাস নেওয়ার জায়গাটুকুও সংকুচিত হয়ে যায়। ভালোবাসা তখন আর নদীর মতো প্রবাহিত থাকে না; তা হয়ে ওঠে বাঁধে আটকে পড়া জল। বাইরে থেকে স্থির, ভেতরে ভেতরে পচনশীল।
মনোবিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অহং (Ego)। সম্পর্কের শুরুতে অহং নরম থাকে। মানুষ ক্ষমা করতে পারে, শুনতে পারে, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই ভালোবাসাকে সমতার সম্পর্ক হিসেবে নয়, মালিকানার সম্পর্ক হিসেবে দেখতে শুরু করে। তখন প্রশ্নের জায়গায় নির্দেশ আসে, আলোচনার জায়গায় সিদ্ধান্ত আসে, আর বোঝাপড়ার জায়গায় বিচার বসে যায়।
ভালোবাসা তখন আর দুটি মানুষের যৌথ যাত্রা থাকে না; একজন চালক, আরেকজন যাত্রী হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ কোনো প্রকল্প নয়, যাকে পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণ করা যায়। মানুষ কোনো কাদামাটি নয়, যাকে ইচ্ছেমতো নতুন আকার দেওয়া যায়। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিত্ব হাজারো অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, আনন্দ, ব্যর্থতা, শৈশব, সংস্কৃতি এবং অদৃশ্য ক্ষতের সমষ্টিতে গড়ে ওঠে। তাকে পরিবর্তন করতে চাওয়া মানে তার অস্তিত্বের ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
সুস্থ সম্পর্কের সৌন্দর্য এইখানেই যে, সেখানে দুটি মানুষ পাশাপাশি হাঁটে- একজন আরেকজনের ছায়া হয়ে নয়, বরং পরস্পরের আকাশ হয়ে। সেখানে মিল থাকবে, আবার অমিলও থাকবে। মতপার্থক্য থাকবে, তবু বিচ্ছেদ অনিবার্য হবে না। কারণ পরিণত ভালোবাসা কখনো অভিন্নতা চায় না; সে চায় সহাবস্থান।
যেখানে স্বাধীনতা থাকে না, সেখানে ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ স্বাধীনতাহীন সম্পর্ক নিরাপত্তা দেয় না; দেয় বন্দিত্বের অনুভূতি। আর মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন সত্তা। তাকে যত বেশি আটকে রাখা হয়, তার ভেতরের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ততই প্রবল হয়ে ওঠে।
এ কারণেই পৃথিবীর অসংখ্য সম্পর্ক ভেঙে যায় কোনো তৃতীয় ব্যক্তির কারণে নয়, বড় কোনো বিশ্বাসঘাতকতার কারণেও নয়; ভেঙে যায় ধীরে ধীরে, প্রতিদিনের ছোট ছোট নিয়ন্ত্রণ, অপূর্ণ প্রত্যাশা, অদৃশ্য চাপ এবং ব্যক্তিসত্তার অবমূল্যায়নের কারণে। সম্পর্কের মৃত্যু সাধারণত একদিনে ঘটে না; তার মৃত্যু শুরু হয় সেই দিন, যেদিন একজন অনুভব করে-“আমাকে আর আমার মতো করে ভালোবাসা হচ্ছে না; আমাকে বদলে দিয়ে ভালোবাসা হচ্ছে।”
অথচ ভালোবাসার সবচেয়ে পরিণত রূপটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরিণত ভালোবাসা বলে- “আমি তোমাকে বদলাতে চাই না। আমি তোমার বিকাশের পাশে দাঁড়াতে চাই।”
কারণ একজন ভাস্কর পাথর কেটে নিজের কল্পনার মূর্তি গড়ে তোলেন, কিন্তু একজন উদ্যানপালক কোনো ফুলকে গোলাপ বানাতে চান না, কিংবা শাপলাকে পদ্ম বানানোর চেষ্টা করেন না। তিনি জানেন, প্রতিটি ফুলের নিজস্ব রং, নিজস্ব ঋতু, নিজস্ব সৌরভ আছে। তাঁর কাজ ফুলকে বদলে দেওয়া নয়; এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে সে তার স্বভাব অনুযায়ী পূর্ণ বিকশিত হতে পারে। মানুষের সম্পর্কও ঠিক তেমনই।
ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন আরেকজনের স্বাধীন সত্তাকে সম্মান করে; যখন পরিবর্তনের দাবি নয়, বিকাশের সুযোগ দেয়; যখন অধিকার নয়, আস্থা; নিয়ন্ত্রণ নয়, সহযোগিতা; শর্ত নয়, গ্রহণযোগ্যতা- সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
অবশেষে, বহু সম্পর্ক, বহু বিচ্ছেদ, বহু পুনর্মিলন এবং মানুষের মনোজগতের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ আমাদের একটি অনিবার্য সত্যের কাছেই ফিরিয়ে আনে- সম্পর্ক শুরু হয় নিজে অপরের মতো হতে গিয়ে। কারণ তখন আমরা ভালোবাসা পেতে চাই। আর সম্পর্ক শেষ হতে শুরু করে অপরকে নিজের মতো বানাতে গিয়ে। কারণ তখন আমরা ভালোবাসার চেয়ে নিয়ন্ত্রণকে বেশি মূল্য দিতে শুরু করি।
যে ভালোবাসা মানুষকে তার স্বরূপে বেঁচে থাকার সাহস দেয়, সেই ভালোবাসাই পরিণত। আর যে ভালোবাসা মানুষকে নিজের ছাঁচে ঢালতে চায়, সে ভালোবাসা আসলে ভালোবাসার মুখোশে লুকিয়ে থাকা ভয়, অনিরাপত্তা এবং অহংকারের আরেকটি নাম।
প্রদ্যোত / ২৪ জুলাই ২০২৬