← Back to writing

সঙতন্ত্রের উত্থান ও সংস্কৃতির শবযাত্রা

সঙতন্ত্রের উত্থান ও সংস্কৃতির শবযাত্রা

“সঙদের দ্বারা কিঞ্চিৎ চটুল বিনোদন প্রাপ্তি হইতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতির তাহারা গাঁড় মাড়িয়া দেয়।”- এই একটিমাত্র বাক্যের মধ্যে আমাদের সময়ের এক বিশাল সাংস্কৃতিক ট্র্যাজেডি লুকায়িত রহিয়াছে। সঙের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। সভ্যতার ইতিহাসে ভাঁড়, বিদূষক, রঙ্গকুশলী, প্রহসনকার- সকলেই কোনো না কোনো সময়ে রাজসভা, জনসভা কিংবা গ্রাম্য মেলায় মানুষের ক্লান্তি দূর করিয়াছে। মানুষ হাসিয়াছে, মন হালকা করিয়াছে, ক্ষমতাবানকে কটাক্ষ করিয়াছে। তাহাদের কাজ ছিল বিনোদন; তাহারা কখনো সংস্কৃতির স্থপতি বলিয়া নিজেদের ঘোষণা করে নাই।

কিন্তু বর্তমান যুগে এক আশ্চর্য বিবর্তন ঘটিয়াছে। বিদূষক এখন নিজেকে বিদ্বান ভাবিতে আরম্ভ করিয়াছে। যে ব্যক্তি গতকাল পর্যন্ত মুখে রং মাখিয়া কলার খোসায় পিছলাইয়া দর্শককে হাসাইত, আজ সে সংস্কৃতির সংজ্ঞা লিখিতেছে। যে লোকের একমাত্র যোগ্যতা উচ্চস্বরে চিৎকার করা, সে আজ নীরবতার দর্শন ব্যাখ্যা করে। যে ব্যক্তি দুই মিনিট অন্তর কৌতুক না করিলে দম বন্ধ হইয়া আসে, সে আজ শিল্পের মহাগুরু।

এ এক অভিনব যুগ। এখানে করতালির পরিমাণই প্রতিভার পরিমাপক; শব্দের উচ্চতাই প্রজ্ঞার গভীরতা; আর অশালীনতার মাত্রাই আধুনিকতার সার্টিফিকেট।

একদা শিল্পী সাধনা করিতেন- এখন তিনি ‘সেন্সেশন’ সৃষ্টি করেন। একদা কবি ভাষা নির্মাণ করিতেন- এখন তিনি অ্যালগরিদমের মনোরঞ্জন করেন। একদা গায়ক সুরের কাছে আত্মসমর্পণ করিতেন- এখন তিনি মাইক্রোফোনের ভলিউমের নিকট আত্মবিসর্জন দেন। সঙেরা ইহা দেখিয়া উল্লসিত। কারণ, যেখানে বাজার সংস্কৃতির বিচারক হয়, সেখানে কোলাহল সর্বদাই রাগ ভৈরবীর উপর বিজয়ী হইয়া থাকে।

সংস্কৃতি একটি অশ্বত্থবৃক্ষ। তাহার শিকড় মাটির বহু গভীরে প্রবেশ করে; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সে আলো, বায়ু, বৃষ্টি ও মানুষের অভিজ্ঞতা শোষণ করিয়া মহীরুহে পরিণত হয়।

সঙের জনপ্রিয়তা একটি সাবানের বুদ্‌বুদ। রৌদ্রের আলোয় ঝলমল করে, শিশুরা হাততালি দেয়, কয়েক মুহূর্ত পরে ‘পট্’ করিয়া ফাটিয়া যায়। তাহার স্মৃতিচিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে না। দুঃখের বিষয়, আজকাল বুদ্‌বুদকেই মহীরুহ বলিয়া প্রতিষ্ঠা করিবার এক প্রবল সামাজিক আন্দোলন চলিতেছে।

যে যত কম পড়িয়াছে, সে তত বেশি ভাষণ দেয়। যে যত কম জানে, সে তত বেশি বিশেষজ্ঞ। যে যত কম সৃষ্টি করে, সে তত বেশি সমালোচক। আর যে যত বেশি সঙ, সে তত বেশি সংস্কৃতির অভিভাবক!

ইহা এমন এক যুগ, যেখানে বাঁশির সুর অপেক্ষা বাঁশির রঙ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বই অপেক্ষা বইয়ের প্রচ্ছদ অধিক মূল্যবান। কণ্ঠ অপেক্ষা মাইক্রোফোন, চিন্তা অপেক্ষা চটক, শিল্প অপেক্ষা শর্টকাট, আর সাধনা অপেক্ষা সাজসজ্জা অধিক সমাদৃত। সংস্কৃতি কাঁদে। কিন্তু তাহার কান্নার শব্দ মাইকের ফিডব্যাকে ঢাকা পড়িয়া যায়।

সঙের আর-একটি বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। সে নিজেকে কখনো হাসির পাত্র মনে করে না; বরং অন্য সকলকেই হাস্যকর ভাবিতে শুরু করে। ফলত, আত্মসমালোচনা বিলুপ্ত হয়, আত্মপ্রচারই ধর্মে পরিণত হয়। তখন সমাজে এমন এক সাংস্কৃতিক জলবায়ু সৃষ্টি হয়, যেখানে গভীরতা লজ্জার বিষয়, প্রজ্ঞা সেকেলে, শালীনতা বিরক্তিকর, আর ভাঁড়ামিই উদ্ভাবন।

ইহা কেবল রুচির অবক্ষয় নহে; ইহা স্মৃতিরও অবক্ষয়। কারণ যে জাতি বিদূষককে ঋষির আসনে বসায়, সে জাতি একদিন ঋষিকেও বিদূষক বলিয়া উপহাস করে। অতএব, সঙের প্রতি বিদ্বেষ নাই; তাহার সীমা লঙ্ঘনের প্রতি আপত্তি আছে। মিষ্টান্ন সুস্বাদু, কিন্তু সারাদিন কেবল মিষ্টান্ন ভক্ষণে শরীর অসুস্থ হয়। আতশবাজি মনোরম, কিন্তু সূর্যের পরিবর্তে আতশবাজি উদিত হইলে পৃথিবী অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। তদ্রূপ, কিঞ্চিৎ সঙ সংস্কৃতিকে প্রাণবন্ত করে; কিন্তু সর্বত্র সঙের প্রাধান্য সংস্কৃতিকে প্রহসনে পরিণত করে। অতএব, সঙকে সঙের আসনেই বসিতে দেওয়া উত্তম। কারণ, বিদূষকের হাতে রাজদণ্ড শোভা পায় না; যেমন শল্যচিকিৎসকের হাতে ঢোল কিংবা ঢাকির হাতে অস্ত্রোপচারের ছুরি নিরাপদ নহে।

সভ্যতার ইতিহাসে সংস্কৃতি কখনো উচ্চকণ্ঠের উত্তরাধিকার বহন করে নাই; সে বহন করিয়াছে গভীরতার। করতালি ক্ষণস্থায়ী। কোলাহলও ক্ষণস্থায়ী। সঙও ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু সংস্কৃতি- সে শতাব্দী অতিক্রম করিয়া মানুষের আত্মায় আশ্রয় গ্রহণ করে।

এইজন্যই বলা যায়- সঙদের দ্বারা কিঞ্চিৎ চটুল বিনোদন প্রাপ্তি হইতে পারে; কিন্তু সংস্কৃতির তাহারা কেবল গাঁড়ই মাড়ায় না- অনেক সময় তাহার মেরুদণ্ডও ভাঙিয়া দেয়।

প্রদ্যোত / ২৯ জুলাই ২০২৬