← Back to writing

সভ্যতার নামে অসভ্যতা

সভ্যতার নামে অসভ্যতা

ধ্বংসের আগে মানুষ প্রাণীটা প্রযুক্তিতে যতখানি এগিয়েছিল, যুক্তিতে ততখানি পিছিয়েছিল। সে মহাকাশের দূরত্ব মেপেছে, পরমাণুর গঠন ভেঙে দেখেছে, জিনের ভাষা পড়েছে, যন্ত্রকে মানুষের চিন্তার অনুকরণ করতে শিখিয়েছে; অথচ নিজের লোভ, হিংসা, দখলের আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতার ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো নৈতিক প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি। তার জ্ঞানের পরিধি ক্রমশ মহাবিশ্বের দিকে প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু আত্মজিজ্ঞাসার পরিধি একই জায়গায় পড়ে থেকেছে। ফলে মানুষের হাতে ক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহারের প্রজ্ঞা সমান হারে বাড়েনি। সভ্যতার ইতিহাসের মূল সংকট এখানেই: মানুষ প্রকৃতিকে বুঝতে শিখেছে, নিজেকে বুঝতে শেখেনি।

মানুষ সভ্যতাকে মূলত ক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। অট্টালিকা, অস্ত্র, সম্পদ, বাজার, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব হয়ে উঠেছে অগ্রগতির পরিমাপক। অথচ একটি সমাজ তার দুর্বলতম মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, ক্ষমতাহীন মানুষের অধিকার কতটা নিরাপদ, প্রকৃতির প্রতি তার দায়বদ্ধতা কতটা, এবং নিজের শক্তির ওপর সে কতটা সংযম আরোপ করতে পারে, সেসব প্রশ্নকে সভ্যতার কেন্দ্রে রাখা হয়নি। ফলে ভবনের উচ্চতা বেড়েছে, মানুষের নৈতিক উচ্চতা নয়; তথ্যের গতি বেড়েছে, বিবেকের গতি নয়; উৎপাদন বেড়েছে, সংযম নয়; ভোগ বেড়েছে, তৃপ্তি নয়।

আধুনিক অসভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সেটি আর খোলা দাঁত দেখিয়ে আসে না। সে আসে স্যুট পরে, আইন হাতে নিয়ে, পরিসংখ্যানের ভাষায়, উন্নয়নের নকশা নিয়ে, সভ্যতার বক্তৃতা দিয়ে। যে মানুষটি দুর্বল শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখে, সে হয়তো সন্ধ্যায় মানবাধিকারের পোস্ট দেয়। যে প্রতিষ্ঠান শ্রমিককে অমানবিক সময় কাজ করায়, তার দেয়ালে ঝুলতে পারে কর্মী কল্যাণের নীতিমালা। যে ব্যবসা নদী দখল করে, সে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের বিজ্ঞাপন দিতে পারে। যে রাজনীতি মানুষের ভয়কে পুঁজি করে ক্ষমতা বাড়ায়, সে গণতন্ত্রের ভাষণ দিতে পারে। যে ব্যক্তি নিজের সুবিধার জন্য অন্যের অধিকার সংকুচিত করে, সেও সামাজিক মাধ্যমে ন্যায়বিচারের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ বক্তা হতে পারে। অসভ্যতা তাই আজ মুখোশহীন নয়; বরং তার মুখোশটাই এত সুন্দর যে মুখটি আর দেখা যায় না।

শহরের একদিকে কাঁচের অট্টালিকা, অন্যদিকে ফুটপাতে রাত কাটানো মানুষ। একদিকে খাবারের অপচয়, অন্যদিকে শিশুর ক্ষুধা। একদিকে বিলাসী হাসপাতাল, অন্যদিকে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর অপেক্ষা। একদিকে কোটি টাকার বিয়ের আয়োজন, অন্যদিকে শিক্ষার খরচ জোগাতে হিমশিম খাওয়া পরিবার। একদিকে অব্যবহৃত বাড়ি ও জমির পাহাড়, অন্যদিকে মাথা গোঁজার জায়গাহীন মানুষ। এই বৈপরীত্যকে যখন সমাজ স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তখন অসভ্যতা শুধু অর্থনীতিতে থাকে না, মানুষের বিবেকের মধ্যেও বাসা বাঁধে। সভ্যতা তখন এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের মূল্য অনেক সময় তার মানবিকতার চেয়ে তার ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হয়।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও আধুনিক অসভ্যতার একটি সূক্ষ্ম রূপ দেখা যায়। শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে, বিচার করতে, ভুল স্বীকার করতে এবং সত্যের সামনে নিজের অহংকে ছোট করতে শেখানোর কথা। কিন্তু শিক্ষা যখন কেবল পরীক্ষার নম্বর, সনদ, চাকরি এবং প্রতিযোগিতার সিঁড়িতে পরিণত হয়, তখন জ্ঞান চরিত্র গঠনের বদলে বাজারে প্রবেশের পাসপোর্ট হয়ে যায়। মুখস্থ করা মানুষকে তথ্য দিতে পারে, কিন্তু বিবেক দিতে পারে না। ডিগ্রি মানুষকে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারে, কিন্তু সততার নিশ্চয়তা দেয় না। ফলে শিক্ষিত সমাজেও প্রতারণা, দুর্নীতি, কুসংস্কার, হিংসা, অসহিষ্ণুতা এবং অন্ধ অনুসরণ টিকে থাকে। মানুষ বই পড়ে, কিন্তু নিজের ভুল পড়ে না; অন্যের ত্রুটি বিশ্লেষণ করে, নিজের চরিত্রের ফাটল পরীক্ষা করে না।

কর্মক্ষেত্রেও একই অসভ্যতা আরও পরিশীলিত রূপে কাজ করে। যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ মূল্যবান হয়ে ওঠে, দক্ষতার চেয়ে পরিচয় শক্তিশালী হয়, সৎ কাজের চেয়ে প্রদর্শন বেশি পুরস্কৃত হয়, আত্মউন্নয়নের বদলে ক্ষমতাবানকে খুশি করার কৌশল শেখা হয়। কেউ নিজের যোগ্যতা বাড়ানোর বদলে ঊর্ধ্বতনের মন জয় করতে ব্যস্ত থাকে; কেউ কাজের মান উন্নত করার বদলে নিজের সাফল্যের প্রচার বাড়ায়। তখন প্রতিষ্ঠান দক্ষ মানুষ তৈরি করে না, সুবিধাবাদী মানুষ তৈরি করে। পদোন্নতি হয়ে ওঠে কখনো কখনো কর্মদক্ষতার পুরস্কার নয়, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার ফল। সভ্য অফিসের ভেতরেও তখন আদিম গোষ্ঠীবোধ কাজ করে: কে কার লোক, কে কার কাছের, কে কার বিরুদ্ধে, কে কার ক্ষমতার ছায়ায় নিরাপদ।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও মানুষের পুরোনো প্রবৃত্তি নতুন পোশাক পরে। ক্ষমতা অর্জনের জন্য মানুষের আবেগ, ভয়, পরিচয়, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা কিংবা বিভাজনকে ব্যবহার করা হয়। মানুষকে একত্র করার বদলে অনেক সময় মানুষকে ভাগ করাই সহজ কৌশল হয়ে ওঠে। একজনকে অন্যজনের শত্রু বানিয়ে নিজের ক্ষমতা নিরাপদ করা হয়। নাগরিকের সমস্যার সমাধানের চেয়ে নাগরিকের মন জয় করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সত্যের চেয়ে প্রচারণা শক্তিশালী হয়, নীতির চেয়ে স্লোগান দ্রুত ছড়ায়। তখন রাষ্ট্রের উন্নয়নের চিত্র যতই চকচকে হোক, মানুষের ভেতরের নিরাপত্তাহীনতা, অবিশ্বাস এবং বিভাজন থেকেই যায়। প্রাচীন শাসক বলপ্রয়োগ করত; আধুনিক শাসক অনেক সময় মানুষের চিন্তা, তথ্য এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেও একই কাজ করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধুনিক অসভ্যতার আরেকটি অদ্ভুত আয়না। মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তে কথা বলতে পারে, অথচ নিজের পাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলার ধৈর্য হারাচ্ছে। একটি খবর যাচাই করতে সময় লাগে, কিন্তু অপমান ছড়াতে লাগে কয়েক সেকেন্ড। সত্যের চেয়ে উত্তেজক মিথ্যা দ্রুত ছড়ায়, যুক্তির চেয়ে রাগ বেশি প্রতিক্রিয়া পায়, গভীর চিন্তার চেয়ে চটকদার বাক্য বেশি দৃশ্যমান হয়। মানুষ অন্যের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যকেও বিনোদনে পরিণত করতে পারে, কারও মৃত্যুতে মন্তব্যের বাজার বসাতে পারে, কারও ভুলকে সারাজীবনের পরিচয়ে পরিণত করতে পারে। প্রযুক্তি মানুষকে প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের শিক্ষা সমানভাবে দেয়নি। ফলে হাতে স্মার্টফোন, কিন্তু আচরণে অনেক সময় আদিম জনতা।

ভোগবাদ এই অসভ্যতাকে আরও স্বাভাবিক করে দিয়েছে। মানুষকে বলা হচ্ছে, তোমার যা আছে তা যথেষ্ট নয়; আরও বড় বাড়ি চাই, আরও দামি ফোন চাই, আরও নতুন পোশাক চাই, আরও দ্রুত গাড়ি চাই, আরও বিলাস চাই। বিজ্ঞাপন মানুষের প্রয়োজনের তালিকা তৈরি করে, তারপর সেই প্রয়োজনকে অপ্রতুল ঘোষণা করে নতুন আকাঙ্ক্ষা বিক্রি করে। মানুষ তখন নিজের জীবন যাপন করার বদলে নিজের জীবন প্রদর্শন করতে শেখে। যে খাবার খাচ্ছে, সেটিও ছবি; যে ভ্রমণে যাচ্ছে, সেটিও প্রদর্শন; যে দান করছে, সেটিও প্রচার; যে সুখী, তাকেও প্রমাণ করতে হয় সে সুখী। মানুষ নিজের জীবনের দর্শক হয়ে গেছে। ভোগ এখন শুধু বস্তু ব্যবহার নয়, পরিচয় নির্মাণের পদ্ধতি।

এই ভোগের পেছনে যে অদৃশ্য শ্রম, তার দিকে সভ্য চোখ খুব কমই তাকায়। সস্তা পণ্যের পেছনে থাকতে পারে কম মজুরির শ্রমিক, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ কারখানা, শোষিত কৃষক, পরিবেশের ক্ষতি এবং বিপুল বর্জ্য। ক্রেতা শুধু পণ্যের দাম দেখে; সভ্যতার হিসাব অনেক সময় তার পেছনের মানুষের ঘাম, প্রকৃতির ক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বোঝা হিসাব করে না। একটি পণ্য সস্তা হওয়া মানেই সেটি সস্তায় তৈরি হয়েছে নয়; অনেক সময় তার আসল মূল্য অন্য কেউ দিয়েছে। শ্রমিক দিয়েছে, নদী দিয়েছে, মাটি দিয়েছে, বন দিয়েছে, ভবিষ্যৎ দিয়েছে। বাজার সেই বিলটি পরে পাঠায়, আর মানুষ তখন বিস্মিত হয়ে বলে, পরিবেশ কেন নষ্ট হলো, জলবায়ু কেন বদলাল, জীবনযাত্রা কেন কঠিন হলো।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এই সভ্যতার সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনাগুলোর একটি। নদীকে নর্দমা বানিয়ে নদী রক্ষার দিবস পালন, গাছ কেটে সবুজায়নের প্রকল্প, জলাভূমি ভরাট করে উন্নয়ন, পাহাড় কেটে পর্যটন, কৃষিজমি গিলে নগর সম্প্রসারণ, তারপর জলাবদ্ধতা হলে প্রকৃতিকে দোষ দেওয়া। মানুষ নিজের তৈরি বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে অভিযুক্ত করতে এতটাই অভ্যস্ত যে নিজের অপরাধের সাক্ষীও সে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। নদী শুকিয়ে গেলে বৃষ্টি কমেছে বলে, তাপ বাড়লে আবহাওয়া খারাপ বলে, বন্যা হলে প্রকৃতির রোষ বলে। মানুষ খুব কমই বলে, এই বিপর্যয়ের ভেতরে আমাদের সিদ্ধান্তেরও একটি অংশ আছে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ও অনেক সময় পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে মানুষ অর্থ দিতে পারে, তার জন্য সেবা দ্রুত; যে পারে না, তার অপেক্ষা দীর্ঘ। অর্থাৎ সমাজের দরজা সবার জন্য খোলা বলা হলেও অনেক দরজার চাবি আসলে অর্থের হাতে। চিকিৎসা যত উন্নত হয়, চিকিৎসা পাওয়ার সামর্থ্যের বৈষম্য তত স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষা যত আধুনিক হয়, ভালো শিক্ষার সুযোগ তত বেশি ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হয়, ডিজিটাল সুবিধা ও জ্ঞানের ব্যবধান তত নতুন বৈষম্য তৈরি করতে পারে। সভ্যতার অগ্রগতি তখন সবার জীবন সমানভাবে উন্নত করে না; কারও জীবনকে দ্রুত এগিয়ে দেয়, কারও জীবনকে আরও পেছনে ফেলে।

মানুষ আবার একই সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলে এবং অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। নিজের মত প্রকাশের অধিকারকে সে পবিত্র মনে করে, কিন্তু অন্যের মত সহ্য করতে পারে না। নিজের বিশ্বাসের স্বাধীনতা চায়, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করতে দ্বিধা করে না। নিজের সম্মান চায়, কিন্তু অন্যকে অপমান করাকে বিনোদন মনে করে। নিজের ভুলের জন্য পরিস্থিতিকে দোষ দেয়, অন্যের ভুলের জন্য চরিত্রের বিচার করে। এই দ্বিমুখী নৈতিকতাই আধুনিক অসভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত চেহারা। মানুষ নীতিকে সার্বজনীন সত্য হিসেবে নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছে।

এখানেই প্রযুক্তি ও আধুনিক অসভ্যতার বিপজ্জনক সংযোগ। আগে একজন মানুষের রাগ সীমিত পরিসরে ক্ষতি করতে পারত; এখন একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তে লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। আগে একজনের নজরদারি করতে একজন মানুষ লাগত; এখন একটি প্রযুক্তি অসংখ্য মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আগে একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত; এখন অ্যালগরিদম উত্তেজনাকে মুহূর্তে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রযুক্তি তাই মানুষের পুরোনো প্রবৃত্তিকে নতুন গতি দিয়েছে। মানুষের হিংসা পুরোনো, কিন্তু তার বিস্তারের গতি নতুন; মানুষের লোভ পুরোনো, কিন্তু তার বাজার এখন বৈশ্বিক; মানুষের দখলদারিত্ব পুরোনো, কিন্তু তার হাতিয়ার এখন ডিজিটাল।

এই কারণেই আধুনিক অসভ্যতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো তার স্বাভাবিকীকরণ। মানুষ প্রতিদিন এমন সব দৃশ্য দেখে যার কোনোটি একসময় অস্বাভাবিক বলে মনে হতো, এখন আর তাতে চমকে ওঠে না। দুর্নীতি দেখে বলে, এটাই নিয়ম। মিথ্যা দেখে বলে, সবাই তো বলে। অন্যায় দেখে বলে, কিছু করার নেই। যোগ্যতার বদলে তোষামোদ দেখে বলে, জীবন এমনই। পরিবেশ ধ্বংস দেখে বলে, উন্নয়নের মূল্য আছে। মানুষের দুঃখ দেখে কয়েক সেকেন্ডের সহানুভূতি দেখিয়ে পরের মুহূর্তে নিজের বিনোদনে ফিরে যায়। অসভ্যতার সবচেয়ে বড় বিজয় তখনই, যখন মানুষ অসভ্যতাকে আর অসভ্যতা বলে মনে করে না।

মানুষের যুক্তিও সেই প্রবৃত্তিরই দক্ষ আইনজীবী। সিদ্ধান্ত আগে, যুক্তি পরে; স্বার্থ আগে, নীতি পরে; দখল আগে, আইন পরে। মানুষ আগে নিজের সুবিধা নির্ধারণ করে, তারপর সেই সুবিধাকে ন্যায় প্রমাণ করার জন্য যুক্তির দলিল বানায়। যুক্তি তখন সত্যের অনুসন্ধান নয়, আত্মপ্রবঞ্চনার পালিশ। একটি সভ্যতা তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন তার শিক্ষিত মানুষ অন্যায়কে শুধু করতে নয়, সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতেও সক্ষম হয়।

মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় ভুল তাই প্রযুক্তিগত নয়, মূল্যবোধগত। মানুষ জানে কীভাবে বেশি উৎপাদন করতে হয়, কিন্তু কতটা যথেষ্ট তা জানে না। জানে কীভাবে শক্তিশালী হতে হয়, কিন্তু কখন শক্তি ব্যবহার না করতে হয় তা শেখেনি। জানে কীভাবে মানুষের আচরণ প্রভাবিত করতে হয়, কিন্তু নিজের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেনি। জানে কীভাবে পৃথিবীকে বদলে দিতে হয়, কিন্তু কোন পরিবর্তনের পরে পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না, সেই সীমারেখা মানতে চায় না।

তাই সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা মহাকাশ জয় নয়, আত্মসংযম। একটি সমাজ কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সে কোথায় থামতে পারে। কত শক্তিশালী অস্ত্র বানাতে পারে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কখন অস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কত সম্পদ জমাতে পারে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কতটা ন্যায়সঙ্গতভাবে তা বণ্টন করতে পারে। কত প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত নয় সেই নৈতিক বোধ তার আছে কি না। সভ্যতার সর্বোচ্চ রূপ ক্ষমতার বিস্তার নয়, ক্ষমতার ওপর স্বেচ্ছায় সীমা আরোপ করার সক্ষমতা।

মানুষ যদি নিজের ভেতরের আদিম প্রাণীটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না শেখে, তবে তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই উন্নত হোক, তা শেষ পর্যন্ত অপরিণত চৈতন্যের হাতে থাকা অতিশক্তিশালী খেলনা। একটি লোভী সমাজকে শক্তিশালী প্রযুক্তি দিলে প্রযুক্তি লোভকেই শক্তিশালী করবে; একটি বিভক্ত সমাজকে দ্রুত যোগাযোগ দিলে বিভাজনই দ্রুত ছড়াবে; একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে সর্বব্যাপী নজরদারি দিলে নিয়ন্ত্রণই আরও নিখুঁত হবে। যন্ত্র মানুষের চরিত্র তৈরি করে না; মানুষের চরিত্রকে বড় করে তোলে।

হয়তো কোনো একদিন মানুষের শহর থাকবে না, কারখানার শব্দ থাকবে না, ডেটা সেন্টারের আলো থাকবে না, সামরিক ঘাঁটির পতাকা থাকবে না। কংক্রিটের ফাটল ভেদ করে ঘাস উঠবে, নদী তার পুরোনো পথ ফিরে পাবে, বন ধীরে ধীরে মানুষের দখল করা ভূমি পুনরুদ্ধার করবে। পৃথিবী মানুষের অনুপস্থিতিতে থেমে যাবে না। প্রকৃতি মানুষের সভ্যতার সার্টিফিকেটের অপেক্ষা করবে না। তখন ইতিহাস মানুষের মহাকাশযানের উচ্চতা দিয়ে তার মহত্ত্ব মাপবে না, অট্টালিকার সংখ্যা দিয়ে তার সভ্যতা বিচার করবে না, অস্ত্রের পরিমাণ দিয়ে তার নিরাপত্তার প্রশংসা করবে না। একটিই প্রশ্ন যথেষ্ট হবে: এত জ্ঞান, এত প্রযুক্তি, এত শক্তি, এত যুক্তি পাওয়ার পরও মানুষ নিজেকে জয় করতে পারল না কেন?

সেই প্রশ্নের উত্তরই হবে মানবসভ্যতার সবচেয়ে কঠিন আত্মজীবনী। মানুষ পৃথিবীর রহস্য উন্মোচন করেছিল, কিন্তু নিজের প্রবৃত্তির রহস্যের কাছে পরাজিত হয়েছিল। সে পরমাণু ভেঙেছিল, কিন্তু অহং ভাঙেনি। সে মহাকাশে পৌঁছেছিল, কিন্তু মানবিকতার গভীরে পৌঁছাতে পারেনি। সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছিল, কিন্তু নিজের বিবেককে বুদ্ধিমান করে তুলতে পারেনি। সে পৃথিবীকে জয় করার স্বপ্ন দেখেছিল, অথচ পৃথিবীর ওপর তার অস্তিত্ব কতটা নির্ভরশীল, সেই সরল সত্যটি মানতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কোনো যুদ্ধ, কোনো অস্ত্র, কোনো প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা কিংবা কোনো সভ্যতার পতন নয়। তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, মানুষ হওয়ার সমস্ত জ্ঞান ও উপকরণ হাতে পেয়েও মানুষ হয়ে উঠতে না পারা। সভ্যতার নামে সে অসভ্যতাকে পরিশীলিত করেছে, যুক্তির নামে স্বার্থকে বৈধতা দিয়েছে, উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ক্ষত করেছে, নিরাপত্তার নামে ভয়কে স্থায়ী করেছে এবং স্বাধীনতার নামে অন্যের স্বাধীনতাই কেড়ে নিয়েছে। তার হাতে ছিল পৃথিবী বদলে দেওয়ার ক্ষমতা; দুর্ভাগ্য এই যে, সেই ক্ষমতা পাওয়ার আগে সে নিজেকে বদলে নেওয়ার শিক্ষা পায়নি।

মানুষ প্রযুক্তিতে অতিমানব হতে চেয়েছিল। প্রজ্ঞায় মানুষ হওয়ার কাজটি অসম্পূর্ণ রেখেই সে এগিয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসের নির্মম ব্যঙ্গ সম্ভবত এখানেই: পৃথিবীকে জয় করার মতো শক্তি তার ছিল, কিন্তু নিজের লোভকে জয় করার মতো সভ্যতা তার ছিল না।

প্রদ‍্যোত / ০৮ অক্টোবর ২০২৬