মহাসাগরে নিজের মাছ ছাড়ো
অন্তর্জাল এক অদৃশ্য মহাসাগর। এখানে জল নেই, অথচ ঢেউ আছে; তীর নেই, অথচ স্রোত আছে; জাল নেই, অথচ কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন মাছ ধরছে। এই মহাসাগরের প্রকৃত সম্পদ তার বিস্তারে নয়, তার বৈচিত্র্যে। যত নতুন চিন্তা, নতুন জ্ঞান, নতুন শিল্প, নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন প্রশ্ন ও নতুন সৃষ্টির মাছ এতে ছাড়া হবে, ততই তার গভীরতা বাড়বে। অথচ মানুষের এক অদ্ভুত মানসিক দুর্বলতা আছে: সে নিজের মাছ চাষ করার চেয়ে অন্যের মাছ ধরে আনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
অনুকরণ মানুষের সহজাত নিরাপত্তাবোধের আশ্রয়। নতুন কিছু সৃষ্টি করতে আত্মবিশ্বাস লাগে, ঝুঁকি লাগে, প্রত্যাখ্যান সহ্য করার শক্তি লাগে; নকল করতে লাগে শুধু সাহসের অভিনয়। একজন একটি কথা বলল, হাজারজন সেটি পুনরাবৃত্তি করল; একজন একটি ছবি বানাল, হাজারজন তার অনুকরণ করল; একজন একটি মত দাঁড় করাল, বাকিরা সেটিকে নিজেদের চিন্তা বলে চালিয়ে দিল। এভাবে মহাসাগর ভরে ওঠে শব্দে, অথচ শূন্য হয়ে যায় স্বকীয়তায়। মাছের সংখ্যা বাড়ে, প্রজাতি কমে।
মানুষের মনও এমনই। যে মন নিজে চিন্তা করে না, সে ধীরে ধীরে অন্যের চিন্তার গুদামঘর হয়ে যায়। যে চোখ শুধু দেখে, কিন্তু বিশ্লেষণ করে না, সে দর্শক; যে মস্তিষ্ক শুধু গ্রহণ করে, কিন্তু রূপান্তর করতে পারে না, সে ভাণ্ডার; আর যে মানুষ গ্রহণ করা অভিজ্ঞতাকে নিজের উপলব্ধিতে পরিণত করে নতুন কিছু ফিরিয়ে দেয়, সেখানেই সৃষ্টির জন্ম। জ্ঞান গ্রহণের শেষ নয়, রূপান্তরের শুরু।
তাই অন্তর্জালে উপস্থিত থাকার অর্থ প্রতিদিন নিজের মুখের ছবি প্রকাশ করা নয়; নিজের মনের কোনো অপ্রকাশিত জানালা খুলে দেওয়া। একটি সত্য চিন্তা একটি মাছ। একটি মৌলিক প্রশ্ন একটি মাছ। একটি কবিতা একটি মাছ। একটি সুর একটি মাছ। একটি গবেষণা একটি মাছ। একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা একটি মাছ। এমনকি নিজের ভুল স্বীকার করার সাহসও একটি বিরল মাছ। পৃথিবীকে নতুন কিছু দেওয়ার ক্ষমতাই মানুষের ডিজিটাল অস্তিত্বের আসল মূল্য।
কিন্তু সব মাছ জীবনদায়ী নয়। বিষাক্ত মাছও আছে। গুজবের মাছ, বিদ্বেষের মাছ, মিথ্যার মাছ, কৃত্রিম উত্তেজনার মাছ, অজ্ঞতার মাছ। এগুলোও দ্রুত বংশবিস্তার করে, বরং সত্যের চেয়েও দ্রুত। তাই মহাসাগর সমৃদ্ধ করার নামে যে কোনো কিছু ছুড়ে দেওয়া সৃষ্টি নয়; সেটি দূষণও হতে পারে। প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে বিবেকের দায়িত্ব না থাকলে অন্তর্জাল জ্ঞানসমুদ্র নয়, বিষসমুদ্র হয়ে ওঠে।
আজকের মানুষের আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক সংকট হলো স্বীকৃতির ক্ষুধা। সে সৃষ্টি করতে চায় না, প্রশংসিত হতে চায়; অবদান রাখতে চায় না, দৃশ্যমান হতে চায়; নিজের ভিতর আলো জ্বালাতে চায় না, অন্যের চোখে আলোকিত দেখাতে চায়। ফলে সৃষ্টি ধীরে ধীরে প্রদর্শনীতে পরিণত হয়। মানুষ তখন মাছ ছাড়ে না, মাছের ছবি ছাড়ে। তার ভেতরে সমুদ্র নেই, অথচ বাইরে সমুদ্রের অভিনয় আছে।
এই অভিনয় থেকে মুক্তির প্রথম শর্ত স্বকীয়তা। সবাই যা বলছে, সেটিই সত্য নয়; সবাই যা করছে, সেটিই অনুসরণযোগ্য নয়; সবাই যে পথে যাচ্ছে, সেই পথেই যেতে হবে এমন কোনো মহাজাগতিক আইন নেই। কখনো কখনো নিজের পথ তৈরি করাই জীবনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টিশীলতা। অন্যের পদচিহ্ন অনুসরণ করে দূরে যাওয়া যায়, কিন্তু নিজের ভূগোল তৈরি করা যায় না।
অন্তর্জালের মহাসাগর তাই আসলে মানুষের সম্মিলিত মানসিকতার আয়না। এখানে যে যত বেশি মৌলিক, মহাসাগর তত বৈচিত্র্যময়; যে যত বেশি নকল, মহাসাগর তত একরঙা। হাজার মানুষের কণ্ঠ যদি একই কথা বলে, সেখানে ভিড় আছে; কিন্তু একটি মানুষ যদি এমন একটি কথা বলে, যা হাজার মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, সেখানে সভ্যতার অঙ্কুর আছে।
তোমার কাছে পৃথিবী কী পাবে, সেটিই শেষ প্রশ্ন। তুমি কতজনকে অনুসরণ করেছ, তা ইতিহাসের কাছে তুচ্ছ; তুমি কতজনকে অনুসরণযোগ্য কিছু দিয়ে গেছ, সেটিই অর্থপূর্ণ। তোমার পোস্ট কতজন দেখেছে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তোমার কোনো একটি বাক্য কি কারও চিন্তার ভিত নাড়িয়েছে? তোমার কোনো কবিতা কি কারও অন্ধকারে একটি জানালা খুলেছে? তোমার কোনো প্রশ্ন কি কারও নিশ্চিত বিশ্বাসে একটি ফাটল ধরিয়েছে? তোমার কোনো অভিজ্ঞতা কি অন্য কাউকে নিজের জীবন নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে তুমি শুধু অন্তর্জাল ব্যবহার করনি; তুমি তার প্রাণবৈচিত্র্যে একটি নতুন প্রজাতি যোগ করেছ। মহাসাগর থেকে শুধু মাছ ধরো না। প্রতিদিন নিজের একটি মাছ ছেড়ে যাও। অন্যের শব্দ ধার করে নয়, নিজের নীরবতা ভেঙে। অন্যের আলো কপি করে নয়, নিজের অন্ধকারের ভিতর আগুন জ্বেলে। এমন কিছু রেখে যাও, যা তোমার অনুপস্থিতিতেও সাঁতার কাটবে মানুষের মনে।
মানুষ একদিন চলে যায়, তার অ্যাকাউন্ট নিস্তব্ধ হয়, তার ছবি পুরোনো হয়ে যায়, তার নামও হয়তো বিস্মৃতির জলে ডুবে যায়। কিন্তু একটি সত্য চিন্তা, একটি নির্মল কবিতা, একটি সাহসী প্রশ্ন, একটি মৌলিক সৃষ্টি মানুষের চেতনায় সাঁতার কাটতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
অন্তর্জালে তাই শুধু উপস্থিত থেকো না, অবদান রাখো। শুধু শব্দ ছড়িয়ো না, অর্থ ছড়াও। শুধু দর্শক হয়ো না, স্রষ্টা হও। মহাসাগর তোমার কাছ থেকে আরেকটি প্রতিলিপি চায় না; সে অপেক্ষা করছে তোমার নিজের মাছটির জন্য।
প্রদ্যোত / ০৭ অক্টোবর ২০২৬