← Back to poetry
❧

সুকান্ত - এক অসমাপ্ত সূর্যোদয়

Poetry

সুকান্ত - এক অসমাপ্ত সূর্যোদয়

সুকান্ত মরে না।
মৃত্যুর ক্যালেন্ডারে তারিখ বদলায়,
কিন্তু আগুনের বয়স বাড়ে না কখনো।
যে কিশোর এক হাতে ধরেছিল ক্ষুধার কঙ্কাল,
অন্য হাতে তুলে নিয়েছিল বিপ্লবের লাল মশাল-
তাঁর মৃত্যু কেবল শরীরের ছিল, স্বপ্নের নয়।

বাংলার প্রান্তরে তাকালে মনে হয়,
কোথাও এক অপুষ্ট কিশোর,
ফুসফুসে জমে থাকা যক্ষ্মার রক্তমাখা শব্দ নিয়ে
লিখে যাচ্ছে পৃথিবীর বিরুদ্ধে চার্জশিট।

তিনি এসেছিল ক্ষণিকের পথযাত্রী হয়ে-
মাটিতে শিশির পড়ার মতো সংক্ষিপ্ত,
কিন্তু বজ্রপাতের মতো তীব্র।
একুশ- যে বয়সে অধিকাংশ মানুষ
স্বপ্ন দেখতে শেখে, সে বয়সেই তাঁর চোখ
ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে সভ্যতার থুথু দেখতে শিখেছিল।
তাঁর লেখায় ফুলের চেয়ে রুটি বড় হয়ে উঠেছিল,
রোমান্টিক চাঁদের চেয়ে
জ্বলন্ত চুল্লি বেশি সত্য হয়ে উঠেছিল।

তিনি লিখেছিলেন- ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।
এই একটি পঙ্‌ক্তিই যেন
সমস্ত বাঙালির বিবেকের আয়না।
সুকান্ত জানতেন,
ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে
কবিতা মানে কেবল অলংকার নয়,
কবিতা মানে প্রতিবাদ,
কবিতা মানে অধিকার আদায়ের অস্ত্র,
কবিতা মানে অন্ধকারের গলায় হাত রেখে বলা-
“মানুষ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বাঁচে!”

তাঁর কবিতায় কারখানার ধোঁয়া ছিল,
মজুরের ঘাম ছিল,
ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না ছিল,
পথশিশুর শীতার্ত করুণ মুখ ছিল,
আর ছিল এমন এক ভবিষ্যতের ডাক
যেখানে মানুষ মানুষকে আর গ্রাস করবে না।
তাঁর শব্দগুলো কেবল সাহিত্য নয়,
মিছিলের স্লোগান,
বিপ্লবের গোপন চিঠি,
পরাজিত মানুষের বুকে জমে থাকা
লাভার বিস্ফোরণ।

সুকান্তর শব্দ চয়নে
বাংলা ভাষা যেন হঠাৎ
শ্রমিকের পোশাক পরে নিয়েছে।
তাঁর কলমে বাংলা আর জমিদারবাড়ির অলস বারান্দায় বসে থাকেনি,
নেমে গেছে রেললাইনের পাশে,
কলকারখানার ধুলোমাখা উঠোনে,
ক্ষুধার্ত মানুষের ভাঙা ঘরে।
এইখানেই তার মহত্ত্ব।
তিনি কবিতাকে রাজদরবার থেকে নামিয়ে
মানুষের ভাতের থালার পাশে বসিয়েছিল।

কিন্তু কী আশ্চর্যের বিষয়-
এত বিপ্লব, এত ক্রোধ, এত ক্ষুধার মধ্যেও
তিনি মানুষকে ঘৃণা করেননি,
ঘৃণা করেছিলেন সেই সমাজকে
যে সমাজ মানুষকে ক্ষুধার কাছে বিক্রি করে দেয়।
তিনি শিশুর মুখে ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন,
কৃষকের ঘামে সভ্যতার জন্ম দেখেছিলেন,
আর শ্রমিকের হাতেই দেখেছিলেন
আগামী পৃথিবীর নকশা।

তিনি কেবল কবি নন,
তিনি বাঙালি সত্তার এক জ্বলন্ত পরিচয়।
যখন বাঙালি মাথা নত করতে শেখে,
সুকান্ত তখন কানে কানে বলে-
বিদ্রোহ করো।
যখন বাঙালি ভুলে যায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে,
সুকান্ত স্মরণ করিয়ে দেয়-
মানুষের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।
যখন চারদিকে মিথ্যার আলোকসজ্জা,
তখন তাঁর কবিতা
একটি ক্ষুধার্ত শিশুর চোখ হয়ে
সভ্যতাকে প্রশ্ন করে।

তাঁর মহাপ্রয়াণের দিনে
আমরা শুধু একজন কবিকে স্মরণ করি না,
আমরা স্মরণ করি এক অসমাপ্ত বিপ্লবকে।
কারণ কালজয়ীর মৃত্যু হয় না-
হয় আমাদের বিবেকের।
যতদিন পৃথিবীতে
ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস থাকবে,
যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ থাকবে,
যতদিন বাংলার কোনো তরুণ
রাত জেগে স্বপ্ন দেখবে নতুন পৃথিবীর-
ততদিন সুকান্ত বেঁচে থাকবেন।

সুকান্ত বেঁচে থাকবেন
দেয়ালে লেখা প্রতিবাদের শব্দে,
মিছিলে উড়তে থাকা লাল পতাকায়,
কৃষকের কর্কশ হাতে,
শ্রমিকের ক্লান্ত চোখে,
এবং প্রতিটি বাঙালির অন্তর্গত সেই আগুনে
যে আগুন এখনো
অন্যায়ের সামনে মাথা নত করতে শেখেনি।

আজ তাই তাঁর জন্য শোক নয়-
একটি অগ্নিময় প্রতিজ্ঞা উচ্চারণ করা প্রয়োজন।
আমরা যেন তাঁর আলোকিত শব্দমালাকে
শুধু আবৃত্তির মঞ্চে বন্দি না রাখি,
বরং তাঁর মানবতাকে ধারণ করি,
তাঁর বিপ্লবকে বুকে রাখি,
তাঁর ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে
আমাদের সমাজের নতুন সংবিধান বানাই।

কারণ সুকান্ত মানে-
একটি অসমাপ্ত সূর্যোদয়।
একটি ক্ষুধার্ত পৃথিবীর বিরুদ্ধে
মানুষের শেষ জেগে ওঠা চিৎকার।

১৩ মে ২০২৬
সুকান্ত ভট্টাচার্যের মহাপ্রয়াণ দিবসে
প্রদ্যোত

✦