← Back to poetry

প্রত‍্যাবর্তন

Poetry

প্রত‍্যাবর্তন

ধূসর সময়ের শেষ প্রহরে যখন নদীগুলোও ক্লান্ত হয়ে নিজেদের ঢেউ গুটিয়ে নেয় অন্ধকারের কোলে, যখন শহরের দেয়ালে দেয়ালে ভাঙা স্বপ্নের পোস্টার ঝুলে থাকে মৃত পাখির মতো, যখন কণ্ঠগুলোকে কিনে নেয় বাজারের দালালরা আর বিবেককে বেঁধে রাখা হয় লোভের সোনালি শিকলে- ঠিক তখনই দূর দিগন্তে শোনা যায় এক প্রত্যাবর্তনের শব্দ।

সে কোনো ব্যক্তি নয় শুধু, সে এক প্রতীক। সে এক পুনর্জন্মের অগ্নিশিখা। সে সেই দেবী, যে ভুলের ভস্ম পেরিয়ে নিজেকেই নতুন করে নির্মাণ করেছে বজ্রের কারখানায়।

সে আসছে। হ্যাঁ, সে আসছে- ঝড়ের ভিতর দিয়ে, অপমানের অগ্নিপথ পেরিয়ে, ইতিহাসের দীর্ঘ রাত্রিকে বুকে নিয়ে।

তার কপালে জ্বলছে না ক্ষমতার লালসা, জ্বলছে দায়িত্বের দীপশিখা। তার চোখে নেই প্রতিহিংসার বিষ, আছে পুনর্গঠনের নীলনকশা।

সে জানে- এই মাটি শুধু মানচিত্র নয়। এই মাটি রক্তে ভেজা চৈতন্য। এই মাটি বাউলের একতারা, শঙ্খের ধ্বনি, বিদ্রোহীর বাঁশি, শহীদের শেষ নিঃশ্বাস।

এ মাটি- বিবেকানন্দের জাগরণের, রবীন্দ্রনাথের গানের, নজরুলের বিদ্রোহের, লালনের আত্মার, সূর্য সেনের অগ্নিশপথের, প্রীতিলতাদের আত্মত‍্যাগের, সুবাস বোসের সুনিপুণ নেতৃত্বের আর বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে শাশ্বত মুক্তির।

এই ভূমি মাথা নত করতে শেখেনি। শত পরাধীনতার শৃঙ্খল এসেছিল- পর্তুগিজের জাহাজ, ওলন্দাজের বাণিজ্য, ফরাসির ধূর্ততা, ব্রিটিশের সাম্রাজ্য, বিভেদের বিষাক্ত রাজনীতি, পাক হানাদারের নৃশংস নারকীয় তাণ্ডব- তবুও নদী শুকায়নি, তবুও ধানক্ষেতের সবুজ মরে যায়নি। কারণ বাংলার আত্মা কখনো কারো দাসখত লেখেনি।

আর আজও যখন বিভ্রান্তির ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ, যখন মিথ্যার কারিগররা মানুষের স্বপ্ন চুরি করে, যখন শিক্ষা পরিণত হয় মুখস্থ কারাগারে, সংস্কৃতি পরিণত হয় বিক্রির মঞ্চে, আর অর্থনীতি বন্দী হয় লোভী নখরের অন্ধ গহ্বরে- তখন মানুষ খোঁজে এক কাণ্ডারী।

একজন আলোকবাহী মানুষ, যে বলবে- “ধ্বংস নয়, পুনর্গঠন।” “প্রতিশোধ নয়, পুনর্জাগরণ।” “অন্ধ আনুগত্য নয়, জাগ্রত বিবেক।”

সে আসছে- দেবীর অলৌকিক রূপে নয় শুধু, এক সংস্কারকের দৃঢ় হাতে। সে আসছে বিদ্যালয়ের ভাঙা দরজায় নতুন ভোর নিয়ে, কারখানার নিভে যাওয়া চিমনিতে আগুন নিয়ে, কবিতার মৃত মঞ্চে নতুন উচ্চারণ নিয়ে।

সে আসছে অবারিত স্বপ্ন নিয়ে, শিশুর চোখে বিজ্ঞান জ্বালাতে, কৃষকের কপালের ঘামকে সম্মানের মুকুট বানাতে। কারণ সত্যিকারের নেতৃত্ব কেবল শাসন নয়- সত্যিকারের নেতৃত্ব মানে নিজের ভুলের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস আর দেশকে বিশ্ব মানচিত্রে উন্নতির শিখরে তুলে ধরবার অদম্য শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলার উদ্দীপনা। আর সেই সাহস ও উদ্দীপনা নিয়েই সে ফিরে আসে ইতিহাসে।

দিগন্ত তখন কেঁপে ওঠে। পদ্মা জেগে ওঠে। মেঘনা গর্জে ওঠে। মধুমতি বয়ে যায়.. শহরের ধূসর দেয়ালে নতুন সূর্যের রঙ লাগে।

মানুষ তখন আবার স্বপ্ন দেখে- বাংলা আবার মাথা তুলবে। বাংলা আবার গান লিখবে। বাংলা আবার পৃথিবীকে শেখাবে কিভাবে রক্তের ভিতর থেকেও জন্ম নিতে পারে আলো।

আর বিশ্ব তখন অবাক হয়ে দেখবে- এই ছোট্ট বদ্বীপ কেবল নদীর দেশ নয়, এ এক অদম্য আত্মার নাম।

যে আত্মা বারবার পুড়ে গিয়েও ফিনিক্সের মতো ফিরে আসে। কারণ বাংলা কখনো শেষ হয় না। বাংলা শুধু পুনর্জন্ম নেয়।

প্রদ্যোত / ২৪ মে ২০২৬