আমাকে হাঁটা শেখাবে?!
আমাকে হাঁটা শেখাবে?!
আমি এসেছি অ্যামিবার ভেজা শরীর ভেদ করে- এককোষী নিঃসঙ্গতার আদিম জঠর থেকে, যেখানে প্রথম জেগেছিল কার্বনের ক্ষুদ্র স্বপ্ন, হাইড্রোজেনের ভিতরে গোপন আগুন, আর অক্সিজেনের নিঃশব্দ ষড়যন্ত্র।
আমাকে হাঁটা শেখাবে?
আমি তো হাঁটছি সেই মহাবিস্ফোরণের পর থেকেই- যখন সময় ছিল সদ্যোজাত, স্থান ছিল উষ্ণ অন্ধকারের ভ্রূণ, আর আলো নিজের ভাষা খুঁজে পায়নি এখনো।
আমি হাঁটছি- কোয়ার্কের কাঁপন থেকে নিউট্রনের স্থিরতা, নক্ষত্রের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পোড়ার দীর্ঘ উপাখ্যান, সুপারনোভার মৃত্যুচিৎকার ভেদ করে লোহা, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস হয়ে একদিন মানুষের হাড়ে এসে দাঁড়িয়েছি।
তোমরা তখনও ছিলে না।
আমি ছিলাম- ধূলিকণার ভিতরে ঘূর্ণায়মান সম্ভাবনা, মহাকর্ষের ধৈর্যশীল হাত ধরে গ্যালাক্সির সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এক ভবঘুরে পরমাণু।
আমাকে হাঁটা শেখাবে?
আমি তো সমুদ্রের ভিতরে প্রথম সাঁতার কেটেছি, সেই প্রাচীন প্রোটোপ্লাজমিক অন্ধকারে যেখানে জীবন প্রথম নিজের নাম লিখেছিল আরএনএর কম্পমান অক্ষরে।
আমি ডাইনোসরের চোখে সূর্যাস্ত দেখেছি, বরফযুগের নিঃশ্বাসে জমে গেছি, গুহামানবের হাতে প্রথম আগুনের বিস্ময় দেখেছি, তারপর ভাষা জন্মাতে দেখেছি- মুখের ভিতরে বজ্রপাতের মতো।
আমি হেঁটেছি সভ্যতার উপর দিয়ে- সুমেরীয় মাটির ফলক, মিশরের পিরামিড, নালন্দার পুড়ে যাওয়া গ্রন্থাগার, আর হিরোশিমার ছাইয়ের ভিতরে মানুষ নামক প্রাণীর আত্মবিধ্বংসী প্রতিভা।
তবু তোমরা আমাকে হাঁটা শেখাও!
কী আশ্চর্য- যে মানুষ নিজেই নক্ষত্রের মৃতদেহ বহন করে বেড়ায়, সে-ই আবার অহংকারে ভাবে সে-ই শেষ জ্ঞানী প্রাণী।
শোনো- আমার রক্তে এখনো ঘুরে বেড়ায় আদি সমুদ্রের লবণ। আমার হাড়ে ঘুমিয়ে আছে মৃত নক্ষত্রের ক্যালসিয়াম। আমার মস্তিষ্কে যে বৈদ্যুতিক ঝড় ওঠে, তা কোনো অলৌকিকতা নয়- তা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ধৈর্যশীল গণিত।
আমি জানি, মানুষ আসলে কোনো চূড়ান্ত সৃষ্টি নয়- সে এক চলমান খসড়া মাত্র, প্রকৃতির পরীক্ষাগারের অর্ধসমাপ্ত সমীকরণ।
তাই যখন তোমরা সভ্যতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমাকে শিখাও কেমন করে বাঁচতে হয়, আমি নিঃশব্দে হেসে ফেলি।
কারণ আমি দেখেছি- সাম্রাজ্য জন্মায়, ধর্ম নিজেদের ঈশ্বর বদলায়, বিপ্লব নিজের সন্তানকে হত্যা করে, আর সত্যকে বারবার মুদ্রার মতো নতুন ছাপ দেওয়া হয়।
আমি সময়ের ছাত্র নই, সময় নিজেই আমার শরীরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত।
আমি সেই অভিযাত্রী যে ব্ল্যাকহোলের নীরবতা থেকেও ফিরে এসে মানুষের ক্ষুদ্র অহংকার দেখে বিস্মিত হয়।
আমি এসেছি নক্ষত্রের মৃত্যু থেকে, এসেছি অণুজীবের ক্ষুদ্র কাঁপন থেকে- ক্রমাগত পরিবর্তনের দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে নিজেকে সংযত, কঠিন, টেকসই করে।
আর যখন মহাবিশ্বের শেষ আলোটিও নিভে যাবে, তখনও হয়তো কোনো অনামা কণার ভিতরে আমার যাত্রার স্মৃতি বেঁচে থাকবে।
তখন আমি আবার ফিরে এসে সময়ের ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে দেখব- মানুষ এখনো কাউকে হাঁটা শেখাচ্ছে।
প্রদ্যোত / ১৩ মে ২০২৬