← Back to writing

দায় কার, জোকার?

গণমাধ্যমের প্রভাব বরাবরই সাধারণ মানুষের উপরে ছিল, আছে এবং থাকবে। আমাদের শৈশব কৈশোর কেটেছে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সাময়িকী ও পত্রিকার বলয়ে। ভীষণভাবে আমরা প্রভাবিত হয়েছি তখনকার গণমাধ্যমগুলোর দ্বারা। ষাট থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত চমৎকার একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল বাঙালি জনগোষ্ঠীর। তৎকালীন মিডিয়ার প্রভাব ছিল সেখানে বিস্তর। টিভিতে যে নাটকগুলো প্রচারিত হতো, সেইসব নাটকের ভাষা, ম্যানারিজম, কস্টিউম, রুচিবোধ আমাদের বাস্তবিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। নাটকের চরিত্রগুলো আমাদের কাছে এক একটা আইডল ছিল। নাটকের চরিত্রগুলোর মানুষেরা বাস্তব জীবনেও ছিলেন চমৎকার রুচিবোধসম্পন্ন এক একজন স্মার্ট মানুষ। আমরা তাদের অit’s oনুসরণ করতাম। নিজেদেরকে বানাতে চাইতাম তাদের মতন। গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ হাসান ইমাম, আনিসুল হক স্যাররা আমার জীবনে কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছে তা বুঝাতে পারব না আমি ভাষায়। আমাদের গড়ে ওঠার সময়টা ওই মানুষগুলো ছিলেন আমাদের পথিকৃৎ। তাদেরকে দেখে দেখে আমরা বেড়ে উঠেছি। হঠাৎ করে নব্বই দশকের পরে যখন মিডিয়া ব্যাপক বিস্তার লাভ করে, নতুন নতুন মাধ্যম তৈরি হতে থাকে, একটা টিভি চ্যানেলের জায়গায় প্রায় অর্ধ শতাধিক টিভি চ্যানেল চলে আসে, হাতেগোনা কয়েকটি পত্রিকার জায়গায় অগণিত পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে, ভার্চুয়াল সামাজিক মাধ্যম চলে আসে মানুষের হাতের মুঠোয়, তখন ভীষণ রকমের দুর্ভিক্ষ নামে শিল্পীদের মনোজগতে। হঠাৎ করেই তারা সস্তা জনপ্রিয়তার দিকে ঝুকে পড়েন। তারা শিল্পী থেকে শিল্পে পরিণত হন! যে মানুষগুলোকে দেখে তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠবে, অনুসরণ করবে, তারা এক একজন হয়ে উঠেন ভাঁড়। আঁটসাঁট বেঁধে ভাঁড়ামির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কে কার থেকে বড় ভাঁড় হতে পারে তার পাল্লা চলে। এমন এমন চরিত্র তৈরি করা হয়, যেসব চরিত্রের সাথে বাস্তব জীবনের কোন মিল নেই। অবাস্তব বিকৃত সব চরিত্রে অভিনয় করতে থাকেন আমাদের তথাকথিত লেজেন্ডারি অভিনেতারা। হাত, পা, চোখ, মুখ বাঁকিয়ে বিকৃত ভাষায় এক একজন জোকার নিজেদেরকে মহা কৃতিত্ববান হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন। এক সময় সুন্দর ভাষা বোধের বিষয়গুলো উঠে আসতো নাটকে সিনেমায়। আর উনারা শুরু করেন ভাষাকে যতভাবে বিকৃত করা যায় তার বিস্ফোরণ ঘটানোর। একজনকে প্রশ্ন করেছিলাম, এসব করে সমাজকে নষ্ট করছেন কেন? তিনি আমাকে টাকার গন্ধ শুকিয়ে ছিলেন! তারা জানেন সস্তা বিনোদন দিতে পারলে জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত পাওয়া যায়। রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া যায়। গত ত্রিশ বছর ধরে অভিনয়ের নামে ভাঁড়ামির চূড়ান্ত এসব ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অভিনেতারা সমাজকে একটু একটু করে নষ্ট করেছেন। যে প্রজন্মটা এখন বেড়ে উঠেছে, তারা বেড়ে উঠেছে উনাদের বিকৃত রুচির বহিঃপ্রকাশে নির্মিত চরিত্রগুলোকে অনুসরণ করে। আজকে আপনারা হিরো আলমকে নিয়ে প্রশ্ন করেন? আপনারা আপনাদের অভিনীত চরিত্র গুলোর কথা একটু চিন্তা করেন তো। বাস্তব জীবনের হিরো আলমদের থেকে কত নিকৃষ্টতম বিকৃত চরিত্রগুলোতে আপনারা অভিনয় করেছেন! নিজের পার্সোনালিটিকে নামাতে আপনাদের লজ্জা করেনি? নিজে বলদ সেজে সমাজকে বলদ বানিয়ে প্রজন্মকে ঠেলে দিয়েছেন বলদামির ভাগাড়ে। হিরো আলমরা যখন দেখেছে তাদের থেকেও নিম্নস্তরের চরিত্র চিত্রায়ন হচ্ছে, তাদের সাহস বেড়ে গেছে নিজেকে হিরো বানানোর জন্য। আপনাদের নাম উচ্চারণ করতে চাই না। সংখ্যাটা শতাধিক। সবাই চেনে আপনাদের। সমাজটাকে বদলে দিতে পারতেন আপনারা। নাটক সিনেমা গানে ফালতু বিনোদনের দিকে না ঝুঁকে সৃজনশীলতার দিকে মানুষকে ঠেলে দিতে পারতেন। পারতেন মানুষের মানবিক বোধগুলোকে জাগিয়ে তুলতে। আপনাদের দেখে দেখে প্রজন্ম বেড়ে উঠতো দারুন স্মার্ট হয়ে। আপনারা নিজেরা স্মার্ট থেকে আনস্মার্ট এর ভূমিকায় অভিনয় করে কী দিয়েছেন সমাজকে? আপনাদের কতগুলো কাজে কয়টা মেসেজ ছিল? শুধু নিজেদের বিনোদন আর মানুষের সস্তা বিনোদনের কথা ভেবে ভেবে আপনারা ভাঁড় হয়ে ভারাক্রান্ত করে দিয়েছেন বাংলাদেশকে! বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ হন আপনারা! সারা জীবন হুজ্জতি করে বুড়ো বয়সে ভাম সাজার চেষ্টা করবেন না! টাকা টাকা করে দেশটার মনোজগত ফাঁকা করে দিয়েন না। আপনারা বদলান, সমাজ বদলাবে। আপনাদের চরিত্রায়নের রুচি বদলান, দেশে রুচির দুর্ভিক্ষ হবে না।

প্রদ্যোত

শিক্ষা ও সংস্কৃতি কর্মী